রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
আজও উপেক্ষিত আফজাল আলীর পরিবার
×
মশিউর রহমান
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২০ | ১৪:৪৮
২০০১ সালে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি-জামায়াত নিজামী-মুজাহিদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা তুলে দেয়। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হাওয়া ভবন, স্বজনপ্রীতি, জঙ্গি উত্থান, গণতন্ত্র হত্যাসহ সবকিছুই করেছে জোট সরকার। শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট জনসভায় গ্রেনেড হামলাসহ সমাজে যত অপকর্ম আছে কোনোটিই করতে বাদ রাখেনি। অবশেষে সৃষ্টি হয় ওয়ান ইলেভেন।
২০০৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বাদ পড়েনি মুক্তি আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে মৌন মিছিল হয়। টানটান উত্তেজনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ও বাইরে। ২২ আগস্ট ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট ডাকে। বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে এই ধর্মঘটকে সমর্থন করেন এবং যে যার মতো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এতে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে আমরা প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছি। এমন সময় খবর এলো, পুলিশের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মারা গেছেন। অনেক ছাত্রলীগ কর্মী, সাংবাদিক, সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মীরা এই খবরে আহত হয়েছিলেন। একটু পর কেউ কেউ বলছিলেন একজন ছাত্রকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। আন্দোলন যেন গণআন্দোলনে রূপ নিল। অবস্থা বেগতিক দেখে বিকেলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ এবং সব হল খালি করে দেওয়ার ঘোষণা এলো।
পরে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক লায়লা আরজুমান মানু ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেনের কাছ থেকে জানতে পারি নিহত ব্যক্তি একজন রিকশাচালক। তার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলায়। ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে খোঁজ নেওয়ারও কোনো উপায় ছিল না। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলাম। সেখানে ময়নাতদন্ত চলছিল। মেডিকেলে একজন নারীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি জানালেন লোকটা মারা গেছে, তার নাম আফজাল আলী। তিনি নীলফামারী থেকে ২১ আগস্ট রাজশাহীতে এসেছিলেন রিকশা চালাতে। আর ২২ তারিখেই নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আফজাল আলীকে গুলি করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের সামনে। পরিতাপের বিষয়, আফজাল আলীর রিকশায় ছিল একজন আহত শিক্ষার্থী। সেই আহত শিক্ষার্থীকে হয়তো হাসপাতালে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন আফজাল আলী। কী ভাগ্য! নিজেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
সে সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় শরণার্থীর মতো হেঁটে-ভ্যানে-রিকশায় করে নাটোরে এসে ট্রেন ধরে নীলফামারীতে পৌঁছলাম। লাশটি পৌঁছার খবর শুনে দেখতে গিয়েছিলাম। গুলি বাম চোখ ভেদ করে বের হয়েছিল। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রিকশাচালক আফজালের পরিবারের দুর্বিষহ জীবনের খোঁজ আমরা কেউই রাখিনি। কেমন আছেন তার স্বজনরা- এই বোধ থেকেই গত বছর তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তার সেই বাড়িটি আর নেই। সন্তান-স্ত্রীরাও অভাবের কারণে একেকজন একেক জায়গায় থাকছে। শুধু কি তাই? সেই আফজালের কবরটাও চিহ্নিত করতে পারছেন না কেউ। ধারদেনা করে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন আফজালের স্ত্রী। দেনা পরিশোধ করতে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছেন। বাবা মারা যাওয়ার সময় ১০ মাসের সন্তান পারুলকে পাওয়া গেল নানির বাড়িতে। মামার বাসায় কাজ করে। বাবার নাম বাদে কিছু মনে করতে পারে না। আর নানিও এগুলো মনে রেখে কষ্ট দিতে চান না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, মৃত্যুর পর একবার কেউ কিছু চাল-ডাল পাঠিয়েছিল, পরে আর কেউ খোঁজ নেয়নি। আফজালের দুঃখিনী মা শুধু কাঁদছিলেন ছেলের কথা মনে করে।
সেদিনের সেই আফজাল আলীকে আমরা স্মরণ করতে চাই। আফজাল আলীর অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া কনিষ্ঠ কন্যা পারুলের আকুতি, প্রধানমন্ত্রী যেন তাকে পড়াশোনা ও চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এ ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বও কম নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত আফজাল আলীর রক্তের ঋণ পরিশোধ করা। আফজালের জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ওয়ান ইলেভেনের সরকার বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিল এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছিল। তার কাছে আমরা সবাই ঋণী। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে বিনীত অনুরোধ, এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।
সাধারণ সম্পাদক; বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
২০০৭ সালের ২০ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খেলার মাঠে একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। বাদ পড়েনি মুক্তি আন্দোলনের সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাবি শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের উদ্যোগে মৌন মিছিল হয়। টানটান উত্তেজনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতর ও বাইরে। ২২ আগস্ট ছাত্রলীগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মঘট ডাকে। বিচ্ছিন্নভাবে শিক্ষার্থীরা স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে এই ধর্মঘটকে সমর্থন করেন এবং যে যার মতো প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। এতে শুরু হয় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া। ১১টা থেকে সাড়ে ১১টার দিকে আমরা প্রশাসন ভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছি। এমন সময় খবর এলো, পুলিশের গুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষক মারা গেছেন। অনেক ছাত্রলীগ কর্মী, সাংবাদিক, সাধারণ শিক্ষার্থী ও অন্যান্য প্রগতিশীল সংগঠনের কর্মীরা এই খবরে আহত হয়েছিলেন। একটু পর কেউ কেউ বলছিলেন একজন ছাত্রকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। আন্দোলন যেন গণআন্দোলনে রূপ নিল। অবস্থা বেগতিক দেখে বিকেলের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ এবং সব হল খালি করে দেওয়ার ঘোষণা এলো।
পরে রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক লায়লা আরজুমান মানু ও অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ইলিয়াস হোসেনের কাছ থেকে জানতে পারি নিহত ব্যক্তি একজন রিকশাচালক। তার গ্রামের বাড়ি নীলফামারী জেলায়। ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে খোঁজ নেওয়ারও কোনো উপায় ছিল না। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলাম। সেখানে ময়নাতদন্ত চলছিল। মেডিকেলে একজন নারীর সঙ্গে দেখা হলো। তিনি জানালেন লোকটা মারা গেছে, তার নাম আফজাল আলী। তিনি নীলফামারী থেকে ২১ আগস্ট রাজশাহীতে এসেছিলেন রিকশা চালাতে। আর ২২ তারিখেই নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। আফজাল আলীকে গুলি করা হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেলের সামনে। পরিতাপের বিষয়, আফজাল আলীর রিকশায় ছিল একজন আহত শিক্ষার্থী। সেই আহত শিক্ষার্থীকে হয়তো হাসপাতালে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন আফজাল আলী। কী ভাগ্য! নিজেই পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
সে সময় যান চলাচল বন্ধ থাকায় শরণার্থীর মতো হেঁটে-ভ্যানে-রিকশায় করে নাটোরে এসে ট্রেন ধরে নীলফামারীতে পৌঁছলাম। লাশটি পৌঁছার খবর শুনে দেখতে গিয়েছিলাম। গুলি বাম চোখ ভেদ করে বের হয়েছিল। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তিত হয়েছে ঠিকই, কিন্তু রিকশাচালক আফজালের পরিবারের দুর্বিষহ জীবনের খোঁজ আমরা কেউই রাখিনি। কেমন আছেন তার স্বজনরা- এই বোধ থেকেই গত বছর তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। তার সেই বাড়িটি আর নেই। সন্তান-স্ত্রীরাও অভাবের কারণে একেকজন একেক জায়গায় থাকছে। শুধু কি তাই? সেই আফজালের কবরটাও চিহ্নিত করতে পারছেন না কেউ। ধারদেনা করে দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন আফজালের স্ত্রী। দেনা পরিশোধ করতে দালালের মাধ্যমে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছেন। বাবা মারা যাওয়ার সময় ১০ মাসের সন্তান পারুলকে পাওয়া গেল নানির বাড়িতে। মামার বাসায় কাজ করে। বাবার নাম বাদে কিছু মনে করতে পারে না। আর নানিও এগুলো মনে রেখে কষ্ট দিতে চান না। সবচেয়ে দুঃখজনক হলো, মৃত্যুর পর একবার কেউ কিছু চাল-ডাল পাঠিয়েছিল, পরে আর কেউ খোঁজ নেয়নি। আফজালের দুঃখিনী মা শুধু কাঁদছিলেন ছেলের কথা মনে করে।
সেদিনের সেই আফজাল আলীকে আমরা স্মরণ করতে চাই। আফজাল আলীর অষ্টম শ্রেণি পড়ূয়া কনিষ্ঠ কন্যা পারুলের আকুতি, প্রধানমন্ত্রী যেন তাকে পড়াশোনা ও চাকরির ব্যবস্থা করে দেন। এ ক্ষেত্রে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বও কম নয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত আফজাল আলীর রক্তের ঋণ পরিশোধ করা। আফজালের জীবন বিসর্জনের মধ্য দিয়ে ওয়ান ইলেভেনের সরকার বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিল এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষা পেয়েছিল। তার কাছে আমরা সবাই ঋণী। প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার কাছে বিনীত অনুরোধ, এই পরিবারটির পাশে দাঁড়ান।
সাধারণ সম্পাদক; বঙ্গবন্ধু পরিষদ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
- বিষয় :
- রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
- মশিউর রহমান
