সমকালীন প্রসঙ্গ
বিদায়ের বিষণ্ণতা ও আগামীর প্রত্যাশিত প্রসন্নতা
আনিস আহমেদ
প্রকাশ: ০২ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২১ | ১৬:২২
এ তো আজকের কথা নয়। বলতে পারেন আজি হ'তে শতবর্ষ আগে (প্রকৃতপক্ষে ১০২ বছর আগে) বিশ্বজুড়ে এসেছিল কথিত স্প্যানিশ ফ্লু। আমাদের মা-বাবার জন্মেরও আগে। ১৯১৮-১৯২০ সালে এই মহামারি মানুষের জীবন বিপন্ন করেছিল মারাত্মকভাবে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে এই মহামারিতে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল, যা বিশ্বব্যাপী তখনকার জনসংখ্যার অনুপাতে অনেক বেশি। কেবলমাত্র ভারতবর্ষেই এই ইনফ্লুয়েঞ্জায় এক কোটি কুড়ি লাখ মানুষ মারা গেছে। আধুনিক ইতিহাসে এত মারাত্মক মহামারির ঘটনা আর ঘটেনি। মূলত তরুণ এবং সুস্বাস্থ্যের অধিকারীরা এই রোগে সংক্রমিত হয়ে তখন প্রাণ হারান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই জীবাণুর উৎপত্তি খুব সম্ভবত স্পেনে নয়; কিন্তু মহাযুদ্ধের সময় স্পেন যেহেতু অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ অবস্থানে ছিল, সেহেতু তারাই সর্বপ্রথম ওই সংক্রমণের সংবাদ দেয়। অন্য রাষ্ট্রগুলো যারা যুদ্ধে যুক্ত ছিল, তারা জনগণ ও সৈন্যদের মনোবল বজায় রাখতে প্রথমে এই জীবাণু সংক্রমণের খবর দেয়নি।
ভারত এবং অন্যান্য দেশেও এ সংক্রমণের দাপট চলতে থাকে ১৯২০ সাল অবধি। ১৯১৮ সালের মে মাসে যুদ্ধের সৈন্যদের নিয়ে একটি জাহাজ মুম্বাইয়ে নোঙর করার পর এই স্প্যানিশ ফ্লু ভারতবাসীকেও সংক্রমিত করে। মহাত্মা গান্ধী ওই ইনফ্লুয়েঞ্জায় সংক্রমিত হন। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আশ্রমেও ওই ফ্লু দেখা দেয়। রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে পঞ্চতিক্ত পঞ্চন আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করেন এবং তার আশ্রমের প্রায় শ'দুয়েক ছাত্র ওই আয়ুর্বেদিক ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে ওঠেন। এ সম্পর্কে তিনি আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুকেও এক চিঠিতে লেখেন। অতএব মহামারি বিশ্বে নতুন কিছু নয়। এটি জয় করতে জানতে হবে। রবীন্দ্রনাথ নিরাশ হননি, গান্ধীও মারা যাননি এবং অবশেষে এই ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রতিরোধক টিকা আবিস্কৃত হয় সীমিতভাবে ১৯৪০-এর দশকে।
সদ্য বিদায়ী বছর ২০২০ সালে করোনাভাইরাসে প্রায় সাড়ে সতেরো লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে, সংক্রমিত হয়েছে প্রায় আট কোটি। ১৯১৮ সালের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বের জনসংখ্যা অনেক বেড়েছে, তা সত্ত্বেও এবারের এই মহামারিতে মৃতের সংখ্যা তখনকার সংখ্যার চেয়ে অনেক কম, কারণ বোধ করি, সংক্রমণ থেকে মুক্ত থাকার বিষয়ে এখনকার লোকজনের সতর্কতা আর এর সঙ্গে রয়েছে নানাবিধ প্রচার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সদর্থক ভূমিকা। তবে কোনো রকম তুলনা ছাড়াই বলা যেতে পারে, ২০২০ সালের করোনাভাইরাস আমাদের জীবনকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এবং এই ২০২১ সালের সূচনালগ্নেও, টিকার টেকসই আশ্বাস পাওয়ার পরও এখনও আমাদের শঙ্কা কাটেনি। মানুষ অমর নয়, এই বৈশ্বিক সত্যটি জানার পরও আমরা সকলেই বাঁচতে চাই।
রবীন্দ্রনাথ যতই বলুন না কেন, 'মরণরে তুহুঁ মম শ্যাম সমান' কিংবা তিনি যখন বলেন, 'তুহুঁ মম তাপ ঘুচাও, মরণ তু আও রে আও', তখন তার ভানু সিংহের পদাবলির প্রেম পর্যায়ের গানে ওই রকম অল্প বয়সে মরণের প্রতি ভালোবাসা ছিল নাকি ছিল স্বপ্নবিলাস অথবা মরণ কি এখানে কেবলই প্রতীক মাত্র- তা নিয়ে গবেষণা করাই যেতে পারে; কিন্তু সাধারণ অর্থে একমাত্র জীবনবিমুখ আত্মহননকারীই মরণকে বরণ করার এ রকম দুঃসাহস দেখাতে পারে নির্বিঘ্নেই। আসলে মৃত্যু যদি চোরের মতো সিঁধ কেটে আমাদের জীবন চুরি করে নিয়ে যেত তা হলে আর যাই হোক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হওয়ার কোনো সুযোগই থাকত না। কিন্তু মৃত্যু যখন পুলিশের মতো জোরে জোরে কড়া নেড়ে জানান দেয় তার আসার কথা কিংবা আদালতের সমন পাঠায় হাজিরা দেওয়ার, তখন আমরা বিচলিত হয়ে পড়ি ভীষণভাবে। সেই রকম এক বিচলনের সময় পার করছি আমরা ইদানীং। স্প্যানিশ ফ্লুর মতো এই মহামারি কি কয়েক বছর আমাদের শঙ্কায় ফেলে রাখবে নাকি এই নববর্ষেই এর পরিসমাপ্তি ঘটবে- সেই ভাবনা আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার দোলাচলে নিবদ্ধ রেখেছে।
এই ২০২১ সাল বাঙালির ইতিহাসের এক মোহন-মুহূর্ত- যখন আমরা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ৫০তম বছরে পদার্পণ করলাম। গত বছর আমরা বিষণ্ণতার মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন করেছি। এ বছর বিজয় দিবস পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনের সিদ্ধান্ত আমাদের আশ্বস্ত করেছে যে, বাঙালির ইতিহাসের এই শীর্ষতম ব্যক্তিকে সম্মান জানাতে আমরা কার্পণ্য করিনি। তার সঙ্গে এ বছর যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০তম বার্ষিকীও। আমাদের বিপুল প্রত্যাশা- এই বছরটিতে আমরা আবার অনুভব করব মুক্তিযুদ্ধের প্রতিটি দিন, সংগ্রাম ও সংঘাতের সেই মুহূর্তগুলোকে, যা ক্রমশই এনে দিয়েছে আমাদের মূল্যবান মুক্তি। মুক্তিযুদ্ধের নতুন করে কোনো মূল্যায়ন, কোনো অপব্যাখ্যা নয়, সেই আদি ও অকৃত্রিম চেতনা বহন করে তোলার বছর ২০২১ সাল। ২০২১ সাল হোক আমাদের তরুণ প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ও নিরপেক্ষ ইতিহাস অবহিত করার বছর। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ও নির্দলীয় ইতিহাস তুলে ধরতে আমরা প্রায়ই ব্যর্থ হই। দলীয়ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ব্যাখ্যা করা হয় বারবার। ১৯৭৫-১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই দীর্ঘ একুশ বছর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে পরিকল্পিতভাবে নির্বাসিত রাখা হয়েছিল, নির্বাসিত রাখা হয়েছিল বিশেষত তাজউদ্দীন আহমদের মতো আওয়ামী লীগের সেইসব নেতাকেও, যারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পুরোধায়, সম্মুখ সারিতে নিয়ে আসা হয়েছিল যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল তাদের।
২০০১ সালের পর আমরা আবার লক্ষ্য করলাম রাজাকার ও যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়ছে এবং তারা তখন বাহ্যত ধোয়া তুলসী পাতা হয়ে গেল, একেকজন কৃত্রিম দেশপ্রেমী যেন-বা। মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে এই নির্মম পরিহাস বাংলাদেশের মানুষ নিরুপায় হয়ে দেখেছে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সঠিক স্থানে স্থাপন করার চেষ্টা করা হলো। আমরা আনন্দিত হলাম যে, বঙ্গবন্ধুসহ সবাই সেই ইতিহাসের মূল ধারায় ফিরে এলেন। একটানা প্রায় এগারো বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছে, এই সময়টাতে ইতিহাসের অনেক বিভ্রান্তিকে শুদ্ধ করা হয়েছে, আমাদের নতুন প্রজন্ম জানতে পারছে না-জানা অনেক কথা। কিন্তু এসবের পর এখনও সঠিক ইতিহাস আসছে না। কৃতিত্বের ইতিহাসকে কেবল নিজের দলের মধ্যে আবদ্ধ রাখা আমাদের সকলেরই ব্যর্থতা। এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ভূমিকা ছিল শীর্ষে এবং পরে যারা ভিন্ন দলে গেছেন, তারাও সে সময় আওয়ামী লীগে ছিলেন। বঙ্গবন্ধু তো মুক্তিযুদ্ধের পর পরিস্কারভাবে বলেছিলেন, আমি কেবল আওয়ামী লীগের নেতা নই, আমি সকল বাঙালির নেতা। আজকের আওয়ামী লীগ যদি বঙ্গবন্ধুর এই উদার বক্তব্য বিস্মৃত হয় তারা ক্ষমতায় আছে বলে, তাহলে কি আমরা দোষারোপ করতে পারব অন্যদল ক্ষমতায় এসে যদি বঙ্গবন্ধুকে ভুলিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চালায়?
একটু ভাবার বিষয় বটে। আমরা তো চাই এই হাজার বছরের শ্রেষ্ঠতম বাঙালি সবারই শ্রদ্ধার পাত্র হোন, এক অভিন্ন ইতিহাসে। আমরা কি পেরেছি মেজর জলিলের মতো মুক্তিযোদ্ধাকে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে। সত্য বটে তিনি দিক পরিবর্তন করেছিলেন; কিন্তু তিনি তো ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। বঙ্গবন্ধুর প্রতি বিশ্বস্ত মুক্তিযুদ্ধের সময়কার প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে কি আমরা সম্মান দিতে পারছি যথার্থভাবে? তার দূরদর্শী নেতৃত্ব কুটিল মোশতাকের ষড়যন্ত্র থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে রক্ষা করেছে। যিনি মুজিব ভাই মুজিব ভাই বলে প্রাণটাই দিলেন, মোশতাকের মন্ত্রিসভায় তার অন্য তিন সহকর্মীসহ যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, সেই তাজউদ্দীন আহমদকে আজকের ইতিহাস কতটুকু জানে, কতটুকু মূল্যায়ন করে? তিনিও যে বঙ্গবন্ধুর মতো মোশতাকের গভীর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছিলেন, মোশতাক এক ঢিলে দুই পাখি মেরে যে ক্ষণিক তৃপ্তি পেয়েছিল, সে কথাটা তুলে ধরার সময় এসেছে। তাই ২০২১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমাদের পূর্ণ প্রসন্নতা আসুক কেবল কভিড-১৯ বিতাড়িত করে নয়, ইতিহাসকে সব রকমের প্রাক-বিচারিক ক্ষুদ্রতা থেকে মুক্ত করে। ব্যাধিমুক্ত নবতর বিশ্বে আমরা দেখতে চাই সেই রকম এক বাংলাদেশ, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত থাকবে নির্ভেজাল সত্যে।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী লেখক ও সাংবাদিক
- বিষয় :
- সমকালীন প্রসঙ্গ
- আনিস আহমেদ
