ঢাকা সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

নাগরিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব

নাগরিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব
×

বাবা প্রকৌশলী খাইরুজ্জামান ও তার ছেলে আবুল বাশার পান্না

ড. মোহাম্মদ ফজলুর রহমান খান

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ জানুয়ারি ২০২১ | ১৫:০২

আমাদের যাপিত জীবনে মূল্য ধারণার ব্যবহার বহুমাত্রিক। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি কিংবা নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় সাম্প্রতিক সময়ে মানবজাতির বৈশ্বিক দীর্ঘশ্বাসের সাধারণ উপকরণ। তা ছাড়া অর্থশাস্ত্র, মনোবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান এমনকি দর্শনশাস্ত্রেও মূল্য ধারণা সমান উপযোগিতায় বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। সামষ্টিক ভালো-মন্দ, উচিত, অনুচিত উপলব্ধির ক্ষেত্রে চেতনে বা অবচেতনে অনুসৃত নীতিমালাকেই সমাজবিজ্ঞানীরা চিহ্নিত করেছেন সামাজিক মূল্যবোধ হিসেবে।

দর্শন শাস্ত্রে মূল্য ধারণার অবতারণা হয় পাশ্চাত্য ভাববাদী দর্শনের জনক প্লেটোর হাত ধরে। তবে মূল্যবোধকে সুস্পষ্ট দার্শনিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন নৈতিক দর্শন ঘরানার ভাববাদী দার্শনিক ইমানুয়েল কান্ট। ভাববাদী দার্শনিকদের মতে, মহাবিশ্বের যে কোনো বস্তু বা ঘটনা সম্পর্কে ব্যক্তি বা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গিই সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি বা সমাজের কাছে ওই ঘটনার ভাবগত মূল্যায়নকে নির্দেশ করে। আর যে নৈতিক মানদণ্ডের ভিত্তিতে ব্যক্তি বা সমাজ কোনো বস্তু বা ঘটনার বাঞ্ছিত-অবাঞ্ছিত আদর্শিক অবস্থান সম্পর্কিত সিদ্ধান্তে উপনীত হয় তাকেই দার্শনিক দৃষ্টিতে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তি বা সমাজের মূল্যবোধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেই অর্থে মূল্যবোধ ব্যক্তি বা সমাজের কর্মের উৎকর্ষতার নির্ণায়ক।

সত্য, কল্যাণ ও সুন্দর ছাড়াও এমন কিছু মানসিক মূল্য আছে, যেগুলো স্বতঃমূল্যগুলো অর্জনকে সহজতর করে। যেমন দৈহিক ও অর্থনৈতিক মূল্য, যাদের বলা হয় পরতঃমূল্য। মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রামে আর্থিক ও দৈহিক মূল্যের গুরুত্ব অপরিসীম। আবার সুস্থ দেহ ও সচ্ছল জীবনে সত্য ও কল্যাণের স্বরূপ যথাযথভাবে উপলব্ধি করা এবং সুন্দরভাবে কল্যাণকর কার্য সম্পাদন করা সহজতর হয়। সত্য, কল্যাণ ও সুন্দরের মূল্যকে অটুট রেখে অর্থনৈতিক ও দৈহিক স্বাবলম্বিতার দিকে অগ্রসর হলে বিকশিত হয় মানবিক সংস্কৃতির। কোনো সমাজের মূল্যবোধে স্বতঃমূল্য অর্থাৎ সত্য, কল্যাণ ও সুন্দরের যত বেশি প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়, সে সমাজ তত বেশি ন্যায়ানুগ ও শুদ্ধ বলে পরিগণিত হয় এবং উন্নীত হয় ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, ধনী, দরিদ্র নির্বিশেষে সবার জন্য বাসযোগ্য সর্বজনীন মানবসমাজে। নাগরিকদের যথার্থ মূল্যবোধ গঠন উপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার নিশ্চয়তা বহুলাংশেই নির্ভর করে রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার উৎকর্ষতার ওপর। তা ছাড়া ধর্ম বা সামাজিক রীতিনীতি মানব সংস্কৃতির বহুবিধ উপাদানের সঙ্গে যেমন নিবিড়ভাবে সংশ্নিষ্ট, তেমনি মূল্যবোধ গঠনেও ক্রিয়াশীল। কারণ অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বহুলাংশেই ধর্মীয় বিধিনিষেধ ও সামাজিক রীতিনীতিনির্ভর। তথাপি জনগোষ্ঠীর যাপিত জীবনে এসব উপাদানের কার্যকর প্রভাব রাষ্ট্রাচার তথা সংশ্নিষ্ট রাষ্ট্রের আইন, বিচার ও শাসন বিভাগের কর্মপরিকল্পনা, কর্মসম্পাদন প্রক্রিয়া এবং জবাবদিহিতার সুযোগ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।

কারণ শিক্ষাব্যবস্থা ও ধর্মীয় অনুশাসনের বদৌলতে নাগরিকরা উপযুক্ত মূল্যবোধের পাঠ গ্রহণের পরও নেতিবাচক রাষ্ট্রাচারের প্রভাবে তা নেহাতই পুঁথিগত বিদ্যায় পরিণত হতে পারে। যেমন মিথ্যা বলা বা ঘুষ গ্রহণ অপরাধ- এ জাতীয় নৈতিক শিক্ষা গ্রহণের পর যদি কোনো নাগরিক, রাষ্ট্রের ব্যবস্থাপকদের মধ্যে মিথ্যাচারের বৈশিষ্ট্য প্রত্যক্ষ করেন বা ঘুষের বিরুদ্ধে কঠোর রাষ্ট্রীয় অবস্থানের পরিবর্তে প্রত্যক্ষ করেন শৈথিল্য, সে ক্ষেত্রে সংশ্নিষ্ট ব্যক্তির কাছে প্রাতিষ্ঠানিক বা অপ্রাতিষ্ঠানিক নৈতিক শিক্ষার মনস্তাত্ত্বিক মূল্য হ্রাস পায়। কারণ রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতিতে যখন সততা, দক্ষতা ও নিষ্ঠার চেয়ে তোষামোদ, পেশিশক্তি এবং ব্যক্তি বা গোত্রীয় আনুগত্য সফলতার মানদণ্ডে পরিণত হয়, তখন ন্যায়নিষ্ঠ নাগরিকদের পক্ষে কেবল সততা ও কর্মদক্ষতার বলে প্রতিষ্ঠা লাভ দুস্কর হয়ে ওঠে। ফলে এই শ্রেণির মানুষ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে কোণঠাসা হয়ে পড়েন। এ ক্ষেত্রে নাগরিকরা ব্যক্তিগত নিরাপত্তাহীনতা কাটাতে যে কোনো উপায়ে অর্থনৈতিক সফলতা ও সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠা পাওয়াকেই মূল্যবান মনে করেন। ফলে স্বতঃমূল্যের পরিপূর্ণ পাঠ নেওয়ার পরও একজন নাগরিক পুরোদস্তুর মিথ্যাবাদী, ঘুষখোর, চাটুকার বা তোষামোদকারীতে পরিণত হতে পারেন। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় সুশাসন যেমন সুনাগরিক তথা যথাযথ মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ গঠনে সহায়ক, তেমনি নেতিবাচক রাষ্ট্রাচার নাগরিকদের মূল্যবোধকে নেতিবাচকভাবেই প্রভাবিত করে। তাই আধুনিককালে রাষ্ট্রব্যবস্থাকেই মূল্যবোধ বিবর্তনের অন্যতম প্রভাবক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সহকারী অধ্যাপক, ময়মনসিংহ সরকারি কলেজ, ময়মনসিংহ
[email protected]

আরও পড়ুন

×