৭ মার্চ
ভাষিক বিচক্ষণতার বিশ্নেষণ
আনিস আহমেদ
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২১ | ১৫:০৪
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের সেই বজ্রকণ্ঠ উচ্চারণের রাজনৈতিক তাৎপর্য বহুল আলোচিত। বস্তুত আজও যারা স্বাধীনতার ঘোষক সম্পর্কে কূটতর্কে লিপ্ত হন, তাদের জন্য বোধ করি ৭ মার্চের ভাষণই যথেষ্ট, যেখানে বঙ্গবন্ধু গোটা দেশ কাঁপিয়ে সেই চূড়ান্ত ঘোষণাটি দিয়েছিলেন, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। কবি নির্মলেন্দু গুণ যথার্থই বলেছেন, 'স্বাধীনতা শব্দটি আমাদের হলো'। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ সম্পর্কে যে কোনো ভাষাতাত্ত্বিক আলোচনায় সেই প্রেক্ষাপটকে আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে, যে প্রেক্ষাপটে এই বচন উচ্চারিত, ভাষণের কাঠামো বিশ্নেষণের আগে এটা বোধ হয় মনে রাখা প্রয়োজন, ১ মার্চ পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান একতরফাভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্যে মুলতবি করে দেওয়ার প্রতিবাদে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, বাঙালি জাতীয়তাবোধের উন্মেষের সমান্তরালে, এর পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণ ছিল তার নিজের জন্যই এক বড় চ্যালেঞ্জ।
বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুরু হয়, তার সেই বিখ্যাত সম্বোধন, 'ভাইয়েরা আমার' দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর ওই সম্বোধনের মধ্যে যেমন ছিল এক ধরনের সামূহিকতা, তেমনি ছিল আন্তরিকতাও। যেন অপার এক স্নেহ নিয়ে এই বিশাল হৃদয়ের মানুষটি, গোটা বাঙালি জাতিকে ভাইয়েরা আমার বলে সম্বোধন করেন। একধরনের নিবিড় আত্মীয়তার অধিকার নিয়েই তিনি সম্পর্কবাচক শব্দটিকে সামনে এনেছেন এবং সর্বনাম ব্যবহার করেছেন শেষে। এই যুগান্তকারী সম্বোধনের পর, তিনি কোন পরিপ্রেক্ষিতে এই ভাষণ দিচ্ছেন তার একটি যৌক্তিক বিশ্নেষণ তুলে ধরছেন। প্রথম দিকে তিনি সমসাময়িক সংকটের কথা উল্লেখ করেন এবং কিছু পরে সেই ঐতিহাসিক পটভূমিও তুলে ধরেন, যার কারণে বাংলাদেশের মানুষ মুক্তি চাইছে। এই পর্যায়ে বঙ্গবন্ধু ছয় বার বাংলা শব্দটি ব্যবহার করেন দেশ অর্থে (যেমন বাংলার মানুষ), আর একবার ব্যবহার করেছেন বাংলাদেশ শব্দটি। আসলে সে সময়ে বাংলা ও বাংলাদেশ শব্দ দুটি অভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হতো বলে বঙ্গবন্ধু ভাষার সাবলীলতা ও ছন্দ রক্ষা করার জন্যই বাংলা কথাটি বহুবার ব্যবহার করেছেন।
তার ভাষণের একটি উলেল্গখযোগ্য বাক্য হচ্ছে, 'আমি শুধু বাংলার নয়, পাকিস্তানের মেজরিটি পার্টির নেতা হিসেবে তাকে (ইয়াহিয়া খানকে) অনুরোধ করলাম ১৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে আপনি জাতীয় পরিষদের অধিবেশন দেন। তিনি আমার কথা রাখলেন না, তিনি রাখলেন ভুট্টো সাহেবের কথা।' ভাষণের এই অংশে তিনি তার দুঃখ ও ক্ষোভের কথা হৃদয়স্পর্শীভাবে বলেছেন সেটি আমরা শ্রোতা হিসেবে সকলেই জানি। খানিকটা ব্যঙ্গাত্মকভাবে তিনি যখন বলেন, 'তিনি আমার কথা রাখলেন না, (বিরতি) ... তিনি রাখলেন (বিরতি) ... ভুট্টো সাহেবের কথা'- তখন সেই বিরতিতে এক ধরনের অনবদ্য নাটকীয় সাসপেন্স সৃষ্টি হয়েছিল। এ ধরনের সাসপেন্স সৃষ্টিতে দক্ষ ছিলেন তিনি। শ্রোতাদের প্রত্যাশা সৃষ্টি করে, তিনি সেই প্রত্যাশিত বাক্যটি তূণের শেষ তীর হিসেবে ছুড়তেন, যেন সপ্তদশ শতকের ইংরেজ কবি জন ডান-এর বহুল আলোচিত মেটাফিজিক্যাল উইট-এর মতোই তিনি প্রস্তুত করে নিতেন, তার শ্রোতাদের, সেই কাঙ্ক্ষিত বাক্যটি বলার জন্য, যা শুনতে প্রতীক্ষিত ছিল তার লাখ লাখ শ্রোতা। একই ধরনের ঝোঁকের সঙ্গে অল্প পরে আরেকটি বাক্যও বলেছিলেন, 'ইয়াহিয়া খান, প্রেসিডেন্ট হিসেবে অ্যাসেমব্লি ডেকেছিলেন। আমি বললাম, আমি যাবো। ভুট্টো সাহেব বললেন, তিনি যাবেন না।' লক্ষ্য করার বিষয় যে বঙ্গবন্ধু এই বাক্যে এবং এর আগে যে বাক্যটি উল্লেখ করেছিলাম সেই বাক্যেও বৈপরীত্য ও বিরোধিতাকে তীব্র করে তুলেছেন খুব ছোট ছোট বাক্য প্রয়োগ করে। তার ভাষণ-বর্ণনা লাখ লাখ শ্রোতাকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করাচ্ছিল, তার অবস্থান বোঝার দিকে। কয়েক মিনিট পরই তিনি তার নিরাপস সংগ্রামের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, '২৫ তারিখে অ্যাসেমব্লি কল করেছে। রক্তের দাগ শুকায়নি। ওই শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে পাড়া দিয়ে মুজিবর রহমান আর টিসিতে যোগদান করতে পারে না।' লক্ষ্য করুন এই বাক্যেও না শব্দটির ওপর বিশেষ ঝোঁক, বঙ্গবন্ধুর নিরাপস অবস্থান তুলে ধরে।
বঙ্গবন্ধু তখনও দক্ষ রাজনীতিকের মতো কৌশলগত কারণে আলোচনায় যোগ দেওয়ার বিষয়টি প্রত্যাখ্যান করেননি। সেই দরজা খোলা রেখে তিনি কতকগুলো শর্ত দিচ্ছেন পাকিস্তান সরকারকে। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে যে, এই সব কঠোর শর্তারোপের পর, তিনি যখন বলেন, 'তারপর বিবেচনা করে দেখব, আমরা অ্যাসেমব্লিতে বসতে পারব কি পারব না। এর পূর্বে অ্যাসেমব্লিতে বসতে আমরা পারি না।' ৭ মার্চের ভাষণের এটি একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রত্যাখ্যান এবং আপসের ক্ষীণ একটা সম্ভাবনার মধ্যে একজন বিচক্ষণ রাজনীতিকের মতো বঙ্গবন্ধু একটা ভারসাম্য রক্ষা করেছেন। একদিকে তিনি নিরাপস থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অন্যদিকে আপসের মুলাটা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু নিরাপস থাকার ব্যাপারে তার প্রত্যয় দৃঢ়, আপস আলোচনার ব্যাপারে তার কোনো প্রতিশ্রুতি নেই, এক্ষেত্রে শর্তসাপেক্ষ প্রতিশ্রুতিও নেই। সর্বাত্মক অসহযোগ ঘোষণার সময় বঙ্গবন্ধু বাস্তব বুদ্ধির পরিচয় দিয়ে ছোট ছোট শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন, বিশেষ বিশেষ শব্দের ওপর জোর দিয়েছেন। যেমন 'রিকশা, ঘোড়াগাড়ি চলবে, রেল চলবে, লঞ্চ চলবে ... শুধু সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিম কোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি-গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না।' এ ধরনের বাক্য ও শব্দ ব্যবহারে জনগণ হর্ষধ্বনির মাধ্যমে তাকে সমর্থন জানানোর অবকাশও পেয়েছে। তিনি আন্দোলনের ডাক দেওয়ার পরই হিন্দু-মুসলমান, বাঙালি-অবাঙালির মধ্যে যাতে কোনো বিভেদ না ঘটানো হয় সে ব্যাপারেও সতর্ক করে দেন।
তার চূড়ান্ত বাক্য নিয়ে আলোচনার আগে, আরেকটি কথা উল্লেখ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছি। ভাষাগত বিশুদ্ধতা রক্ষা করার কোনো আরোপিত চেষ্টা এই ভাষণে ছিল না। একদিকে বঙ্গবন্ধু যেমন আসুন বসুন, বিচার করুন জাতীয় প্রমিত ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন, তেমনি নির্দি্বধায় বলেছেন 'দাবায়ে রাখতে পারবা না, মনে রাখবা ...' ভাষার মধ্যে এই প্রমিত বাংলার প্রয়োগ এবং আঞ্চলিক শব্দের প্রয়োগ, তার ভাষণকে দিয়েছে এক ধরনের স্বতঃস্ম্ফূর্ততা এবং গতিশীলতা। সেদিন ওই মাঠে যে লাখো লোকের ঢল নেমেছিল তার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক থেকে শুরু করে সর্বস্তরের লোক ছিলেন।
৭ মার্চের ভাষণের এক পর্যায়ে আসে বঙ্গবন্ধুর সেই চূড়ান্ত ঘোষণা, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। মুক্তি ও স্বাধীনতা শব্দ দুটিকে নিয়ে বঙ্গবন্ধু আবার বিচক্ষণতার সঙ্গে এক ধরনের রাজনৈতিক কৌশল প্রয়োগ করেছেন। দুটি শব্দ পরস্পরের কাছাকাছি হলেও, বাঙালির মননে এ দুটি শব্দের কেবল মাত্রাগত নয়, প্রকৃতিগত পার্থক্যও রয়েছে। বাংলায় মুক্তি শব্দের প্রায়োগিক মূল্যমান স্বাধীনতা শব্দের মূল্যমানের চেয়ে সামান্য লঘু। একটি অভিন্ন রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে থেকেও মানুষ মুক্তি চাইতে পারে। এই মুক্তির একটি রূপরেখা বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের প্রথম দিকেই উল্লেখ করেন- অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির কথা। আরও একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তখনকার বিশ্বে যে সমাজতান্ত্রিক প্রভাব ছিল, এর প্রেক্ষাপটে মুক্তি শব্দের প্রয়োগ ছিল, স্বাধীনতা শব্দের প্রয়োগের চেয়ে কিছুটা লঘু। বঙ্গবন্ধু তাই তার ভাষণের বহু জায়গায় এই মুক্তি শব্দটি ব্যবহার করেছেন নানাবিধ অর্থে, মূলত বাঙালির গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্নে কিন্তু স্বাধীনতা শব্দটি ব্যবহার করেছেন কেবল একবার। কিন্তু শেষের লাইন, ওই আবার কবি জন ডান-এর মতোই বঙ্গবন্ধু একটি মেটাফিজিক্যাল কনসিটের আশ্রয় নিলেন। তিনি মুক্তি ও স্বাধীনতার মধ্যে একটি সমীকরণ সাধন করে, স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের প্রতীকীভাবে বুঝিয়ে দিলেন যে, তিনি আসলে পুরো ভাষণেই স্বাধীনতার কথাই বলেছেন অথচ তার প্রতিপক্ষের কাছে এর সহজ ব্যাখ্যা হতে পারত যে, যখন তিনি স্বাধীনতা বলছেন, তখন তিনি কেবল মুক্তির কথাই বলছেন, সেখানে রাষ্ট্রিক সার্বভৌমত্বের ওপর কোনো আঘাত হানা হচ্ছে না।
বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়েছেন, তার এই শেষের বাক্যে। কবিতার মতোই বলা যায় তিনি এই শব্দের ব্যাখ্যা ছেড়ে দিয়েছেন তার শ্রোতাদের হাতে, জনগণের হাতে। শ্রোতারাও বুঝতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি যে, বঙ্গবন্ধু পরোক্ষভাবে প্রকারান্তরে স্বাধীনতাই ঘোষণা করেছেন। এই শেষ বাক্যে আবারও তার বাচনভঙ্গির একটি দিকের পুনরাবৃত্তি লক্ষ্য করি। তিনি আবার, 'এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম' এটুকু বলে একটি ছোট্ট বিরতি দেন। ওই বিরতিটিই ছিল একটি আশান্বিত সাসপেন্স। মাথার ওপর তখন উড়ছে টিক্কা খানের সামরিক হেলিকপ্টার, তেমনি উত্তেজনাময় মুহূর্তে আবার তিনি তার তূণ থেকে ছুড়লেন শেষ বাক্যবাণ, 'এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম'। এই অসাধারণ উচ্চারণ কোনো আবেগ আপ্লুত তাৎক্ষণিক উক্তি নয়। এই বাক্যটি শোনার জন্য জনসাধারণের যেমন প্রতীক্ষা ছিল দীর্ঘ, ভাষণ যিনি দিচ্ছিলেন সেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবেরও প্রস্তুতি ছিল পরিকল্পিত। বিশ্বের নেতৃবৃন্দের প্রদত্ত বিখ্যাত ভাষণগুলোর মধ্যে এই ৭ মার্চের ভাষণটি আপন মহিমায় স্থান লাভ করেছে। এত সংক্ষেপে, স্বল্প সময়ে এত সব গুরুত্বপূর্ণ কথা, আবেগ ও যুক্তির সমপরিমাণ প্রয়োগ কেবল তার মতো বড় মাপের স্বাধীনতাকামী নেতার পক্ষেই সম্ভব ছিল। আসলে ৭ মার্চের ভাষণ যেন এক গদ্য কবিতা।
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক
- বিষয় :
- ৭ মার্চ
- আনিস আহমেদ
