ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

শ্রদ্ধাঞ্জলি

নিভে গেল নক্ষত্র

নিভে গেল নক্ষত্র
×

হাসান শাহরিয়ার: ১৯৪৪-২০২১

ফরিদ হোসেন

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ১০ এপ্রিল ২০২১ | ১৪:৫২

এখন তো শুধুই হারিয়ে যাওয়ার সময়। প্রিয়জনের আলিঙ্গনমুক্ত হয়ে, আপনজনের কাকুতি-মিনতি প্রত্যাখ্যান করে, জীবনের অঙ্গনে যত ভালো যত মন্দ, হাসি-কান্না, রাগ-বিরাগ- সবকিছু পেছনে ফেলে চিরকালের জন্য হারিয়ে যাওয়া। এটাই হলো অতিমারি করোনাকালের বাস্তবতা। আর এই নিষ্ঠুর বাস্তবতার পথ ধরেই চিরকালের জন্য হারিয়ে গেলেন হাসান শাহরিয়ার, আমাদের অতি প্রিয় শাহরিয়ার ভাই; ৭৭ বছর বয়সে।

২০১৮ সালের ২৫ এপ্রিল (তার জন্মদিন), 'হাসান শাহরিয়ার, সাংবাদিকতায় জীবন্ত কিংবদন্তি' শিরোনামে একটি পুস্তক প্রকাশিত হয়েছিল বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. মীজানুর রহমান শেলীর সম্পাদনায়। সেই শিরোনাম থেকে 'জীবন্ত' শব্দটি আজ ঝরে পড়ল। শনিবার তিনি করোনা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেলেন রাজধানীর একটি হাসপাতালে। করোনাজনিত মৃত্যুর তালিকায় যুক্ত হলো আরেকটি নাম, যিনি একজন সুদক্ষ সাংবাদিক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন; দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। তার সম্পর্কে আজ খুন মনে পড়ছে পরলোকগত লেখক, গবেষক ও শিক্ষানুরাগী আনিসুজ্জামান স্যারের কথা। তিনি লিখেছিলেন, 'বাংলাদেশের সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে হাসান শাহরিয়ার এক উজ্জ্বল নক্ষত্রস্বরূপ।'

হাসান শাহরিয়ার সেই স্বাক্ষর রেখেছিলেন তার কর্মে। সাংবাদিকতা জীবনের শুরু থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকার সঙ্গে। সেখান থেকে নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে অবসর নিয়েছিলেন ২০০৮ সালে; মহান এই পেশায় অহংকারের সাহসে। তবে এখানেই তার মেধা ও দক্ষতার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া যায়, তা নয়। তিনি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাময়িকী 'নিউজউইক'-এর এক দাপুটে বাংলাদেশ সংবাদদাতা। এখানেই তিনি বাংলাদেশের এক টালমাটাল রাজনৈতিক সময়ের চিত্র তুলে ধরেছিলেন বিশ্ব-পাঠকের কাছে। সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ, এরশাদবিরোধী আন্দোলন, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল ও নেতার সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন সংক্রান্ত খবর ও বিশ্নেষণ নিউজউইক সাময়িকীতে বহুবার প্রকাশিত হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি প্রতিবেদক হিসেবে কাজ করেছেন খালিজ টাইমস্‌, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, দি ডেকান হেরাল্ড, এশিয়ান এজসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে। একজন দক্ষ ও চৌকস সাংবাদিক ছিলেন তিনি। সাংবাদিক সমাজে একজন নেতা ও সংগঠক হিসেবেও তিনি তার দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি জাতীয় প্রেস ক্লাব ও বৈদেশিক সংবাদদাতা সমিতির (ওকাব) সভাপতি ছিলেন। ছিলেন আন্তর্জাতিক কমনওয়েলথ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের (সিজেন) পরপর দু'বারের সভাপতি ও আজীবন প্রেসিডেন্ট ইমেরিটাস।

দীর্ঘ কর্মজীবনের শুরুতে করাচির 'ডন' পত্রিকার রিপোর্টার হিসেবে হাসান শাহরিয়ার আন্তর্জাতিক সাংবাদিকতায় যুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পেশার প্রয়োজনে বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। ইন্দিরা গান্ধী থেকে শুরু করে জিয়াউল হক, বেনজির ভুট্টো, মাদার তেরেসাসহ অনেকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন একজন পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে। কড়া প্রশ্ন করতে তিনি পিছপা হননি। সাংবাদিকতার জমিনে তিনি যে সোনার ফসল ফলিয়েছেন- এ প্রমাণ মেলে তার উত্তরসূরিদের মাঝে। সদা-হাসিমুখ এই অমায়িক, বন্ধুবৎসল মানুষটি তার কর্মস্থল থেকে শুরু করে সামাজিক প্রতিষ্ঠান, ক্লাব ও যেখানেই পদচারণা করেছেন; সর্বত্র রেখে গেছেন অজস্র আপনজন। বয়সের বাধা ডিঙিয়ে তিনি বন্ধুত্ব গড়েছেন ছোট-বড় সবার সঙ্গে এক অনায়াস স্বাচ্ছন্দ্যে।

কভিড-১৯ অতিমারি আমাদের জীবন তছনছ করে দিয়েছে। অদৃশ্য এই শত্রুর সামনে থরথর কাঁপছে সারাবিশ্ব। আমাদের বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। এই অতিমারি আমাদের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে নির্মমভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে। গুরুতর অসুস্থ শাহরিয়ার ভাইয়ের জন্য একটি আইসিইউ শয্যা পেতে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ছুটতে হয়েছে। তার এক আত্মীয়ের মাধ্যমে বৃহস্পতিবার রাতে প্রথমে তাকে নেওয়া হয় সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে। সেখানে কোনো সিট পাওয়া যায়নি। তাই, একজন ডাক্তারের ঘরে রেখেই তাকে অক্সিজেন দেওয়া হচ্ছিল। এভাবে কেটে যায় কয়েক ঘণ্টা। শেষ অব্দি তারই প্রতিষ্ঠিত মিডিয়া ক্লাব লি. (এমসিএল)-এর একজন সদস্য জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ইমপাল্‌স হাসপাতালে সোনার হরিণসম দুষ্প্রাপ্য একটি আইসিইউ শয্যা পাওয়া যায়। শুক্রবার রাতে তাকে সেখানে নেওয়া হয়। ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই ব্যর্থতার বেদনা শুধু আমাদের নয়; বাংলাদেশজুড়েই চলছে হাসপাতালে চিকিৎসা সংকটের করুণ গাথা। কবে যে কাটবে এ আঁধার- কে জানে!

শাহরিয়ার ভাই চলে গেলেন। তার সঙ্গে চলে গেল আমাদের জীবনের এক বড় অধ্যায়, যার পরতে পরতে তার ছোঁয়া, তার অভয় ও ভালোবাসা। অবসর জীবনে তিনি কলাম লিখতেন; সমকাল পত্রিকায় যেখানে আমরা দেখেছি দলীয় রাজনীতির ছোবলের বাইরে থাকা একজন সত্যিকার পেশাদার সাংবাদিক।

জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

আরও পড়ুন

×