অন্য এক অনন্য রবীন্দ্রনাথ
আনিস আহমেদ
প্রকাশ: ০৭ মে ২০২১ | ১২:০০ | আপডেট: ০৭ মে ২০২১ | ১৫:২৬
রবীন্দ্রনাথের যে বহুমুখী প্রতিভা আমাদের সবাইকে আকৃষ্ট করে বার বার, তার মধ্যে যেমন কিছু মূর্তমান দিক রয়েছে, তেমনি আছে বিমূর্ত দিকও। রবীন্দ্রনাথ যে শব্দ ও অক্ষরে প্রকাশিত, তার অন্তরালে তার অন্যরকম এক প্রকাশ আছে, যা হৃদয়স্পর্শী। এমন কথায় কেউ কেউ হয়তো খানিকটা হেঁয়ালিপনার আভাস পেতে পারেন, হয়তো বলতে পারেন, সব বড় মাপের লেখকের মধ্যেই থাকে দর্শনের প্রভাব এবং রবীন্দ্রনাথও এর ব্যতিক্রম নন। এ কথা ঠিক কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দর্শন তার লেখার ওপর কাঠামোর চাইতেও গভীর; রবীন্দ্রনাথের সেই দর্শনে রয়েছে যে গভীর প্রেম তা যেমন ইহজাগতিক, তেমনি পারলৌকিকও বটে। এ জন্যই বাহ্যত যে রবীন্দ্রনাথকে আমরা দেখি, তার আড়ালে থেকে যান অন্য এক রবীন্দ্রনাথ, যিনি আমাদের অনুভূতিরই প্রতিধ্বনি তোলেন প্রতিটি পঙ্ক্তিতে। রবীন্দ্রনাথ যে বিশ্বকবি হিসেবে বাঙালির কাছে পরিচিত সেও বোধ করি এ কারণে নয় যে, তিনি পৃথিবীখ্যাত; কারণ, বিশ্ববিখ্যাত সাহিত্যিক তো আরও আছেন। এ কারণেও রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি নন যে, বাঙালিরা আবেগ-আপ্লুত হয়ে তাকে এই অভিধায় অভিষিক্ত করেছেন, তিনি বিশ্বকবি কারণ, তিনি বিশ্বের দর্শনীয় সত্যের মধ্যে অদর্শনীয় সত্যকে উপলব্ধি করেছেন অনন্যসাধারণ প্রেমের মাধ্যমে। প্রেম তার সাহিত্যের বৃত্তের একেবারে কেন্দ্রস্থলে অবস্থান করেছে এবং তার সাহিত্যের অবশিষ্ট দিকগুলো আবর্তিত হয়েছে এই প্রেমকে কেন্দ্র করেই। দেশপ্রেম, রোমান্টিক প্রেম, মানবপ্রেম, ঈশ্বর প্রেম, প্রেমের এই বাহ্য দিকগুলোর অন্তরালে রবীন্দ্রনাথের মধ্যে ছিল এক বিমূর্ত প্রেম, যা একাধারে তাকে এ সব ধরনের প্রেমের সঙ্গে সম্পৃক্ত করেছে, আবার বিচ্ছিন্নও করেছে। এই সম্পৃক্ততা এবং বিচ্ছিন্নতার দিকই হচ্ছে রবীন্দ্রনাথের প্রেমের বৈচিত্র্যের অন্তরালে বিমূর্ততা। একদিকে তিনি সব অর্থেই প্রেমিক কবি, আবার অন্যদিকে তিনি এক বিমূর্ত প্রেমের কবিও।
প্রকৃত অর্থে প্রেম আসলেই একটি বিমূর্ত অনুভূতি, যা প্রকাশিত হয় স্থান-কাল-পাত্রভেদে ভিন্নভাবে। তার প্রেমের বহুল আলোচিত উপন্যাস 'শেষের কবিতা'য় আমরা যে প্রেমের সন্ধান পেলাম সেটা প্লেটনিক প্রেম, যেখানে মিলনের চেয়ে বিরহের মূল্যটাই যেন অনেক বেশি ঘনীভূত হয়ে থাকে হৃদয়ের চত্বরে। সেখানে তিনি ফ্যাশন ও স্টাইলের মধ্যে যে পার্থক্যের কথা বলেন, সেটি যতখানি বাস্তব তার চেয়ে অনেক বেশি দার্শনিক সত্য। অমিত যখন বলে, 'যে ভালোবাসা ব্যাপ্তভাবে আকাশে মুক্ত থাকে, অন্তরের মধ্যে সে দেয় সঙ্গ; যে ভালোবাসা বিশেষভাবে প্রতিদিনের সবকিছুতে যুক্ত হয়ে থাকে, সংসারে সে দেয় আসঙ্গ। দুটোই আমি চাই।' তখন আমরা ভালোবাসার এই দুটি দিকই উপলব্ধি করি, বুঝতে পারি একটি হচ্ছে মূর্তমান ভালোবাসা, অপরটি বিমূর্ত- সকল অর্থেই একেবারে প্লেটনিক। অমিত আবার যখন বলে, 'কেতকীর সঙ্গে আমার সম্বন্ধ ভালোবাসারই, কিন্তু সে যেন ঘড়ায়-তোলা জল- প্রতিদিন তুলব, প্রতিদিন ব্যবহার করব। আর লাবণ্যর সঙ্গে আমার যে ভালোবাসা সে রইল দিঘি, সে ঘরে আনবার নয়, আমার মন তাতে সাঁতার দেবে।' এখানেও আমরা সন্ধান পাই সেই রবীন্দ্রনাথের যিনি মূর্তমান ও বিমূর্ত ভালোবাসাকে পৃথক করে দেখছেন তবে তার ভালোবাসার মূল ঝোঁকটা সেই বিমূর্ততার দিকেই আর এখানেই মুখ্য হয়ে ওঠে রবীন্দ্রনাথের অধ্যাত্মবোধ। শেষের কবিতার শেষে বন্যা যে কবিতাটি লিখে দিল :যে আমারে দেখিবারে পায়/অসীম ক্ষমায়/ভালো মন্দ মিলায়ে সকলি/এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি। এখানেই আমরা যেন পার্থিব প্রেমের সঙ্গে এই বিমূর্ত প্রেমের পার্থক্য খুঁজে পাই, আর এই বিমূর্ত প্রেম যে কোনো এক জীবন- দেবতা বা ঈশ্বর প্রেম সে কথা বলাই বাহুল্য। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের এই ঈশ্বর কোনো ধর্মীয় মতবাদে আবদ্ধ ঈশ্বর নন, তিনি প্রেমময় এবং প্রেমও বটে। প্রেমিক ও প্রেমাস্পদের মধ্যে অভিন্ন বিষয়টি হচ্ছে প্রেম আর এই বিমূর্ত প্রেমেরই আরাধনা করেছেন রবীন্দ্রনাথ তার লেখায়, বিশেষত তার গানে, কবিতায়।
রবীন্দ্র-রচনার প্রায় সবটুকু জুড়েই রয়েছে প্রেম। তবে এর শ্রেষ্ঠতম বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে গীতাঞ্জলি কাব্যে। বাংলা গীতাঞ্জলি প্রকাশিত হয় ১৩১৭ বঙ্গাব্দে। গীতাঞ্জলিতে মোট কবিতার সংখ্যা ১৫৭টি। তবে ইংরেজি গীতাঞ্জলি, যার জন্য তিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছিলেন, সেখানে কবিতা রয়েছে ১০৩টি এবং কোনো কোনোটি তার অন্য কাব্যগ্রন্থ থেকেও সংকলিত এবং সবটাই তার নিজের অনূদিত। 'সং অফারিংস' নামের এই ইংরেজি গীতাঞ্জলির ভূমিকা লিখেছিলেন কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস। তবে তার বাংলা গীতাঞ্জলি ভাবে ও ভাষায় সমৃদ্ধ এক অঞ্জলি সেই প্রেমিকের উদ্দেশে, যিনি একাধারে প্রেমিক এবং প্রেমও বটে। তার অর্থ এই নয় যে, তার ইংরেজি গীতাঞ্জলি দুর্বল ছিল। বরং সেটি বিশ্বসভায় সমাদৃত হয়েছিল বলেই তিনি নোবেল পুরস্কার পেলেন ইংরেজি ১৯১৩ সালে। তবে একজন বাঙালি পাঠক হিসেবে আমার কাছে তার বাংলা গীতাঞ্জলির মূল্য অনেক বেশি, কারণ সেখানে আমি খুঁজে পাই অন্য এবং অনন্য এক রবীন্দ্রনাথকে। বাংলা গীতাঞ্জলির প্রথম কবিতা, 'আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার/চরণ ধূলার তলে/সকল অহংকার হে আমার/ডুবাও চোখের জলে।'প্রেমিকের এই সমর্পণের কথাই এখানে উচ্চারিত যে, সমর্পণ বিমূর্ত এক সত্যের কাছে যে সত্যের সন্ধানে কবি হাঁটছেন তার সাহিত্যের পথ ধরে।
দ্বিতীয় কবিতায় রয়েছে খানিকটা শ্নেষ, খানিকটা অভিমানও যখন তিনি বলেন, 'আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই, বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে ...'। এই কবিতায় তিনি তার প্রেমাস্পদকে যখন বলেন, বঞ্চিত করেই তিনি বাঁচালেন তাকে। তখন আমরা এক গোলকধাঁধায় পড়ে যাই। তবে এই কবিতার শেষ লাইনে রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন ... " নিতে চাও ব'লে ফিরাও আমায়/পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন /তব মিলনেরই যোগ্য করে /আধা-ইচ্ছার সংকট হতে বাঁচায়ে মোরে।''
তখন আসলে প্রেমাস্পদের সঙ্গে মিলনের ইচ্ছেটা প্রবল হয়ে দেখা দেয়; কিন্তু নিজের পূর্ণতা প্রাপ্তির পরেই কেবল। প্রেম যখন পূর্ণতা পায় তখনই মিলন হয় অর্থবহ। গীতাঞ্জলিতে অবশ্য এমন কিছু কবিতাও রয়েছে যেখানে বাহ্যত প্রকৃতির কথা বলা হয়েছে যেমন, 'আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্রচ্ছায়ায় লুকোচুরির খেলা' এমন একটি কবিতায়ও যখন তিনি সূক্ষ্ণ জিজ্ঞাসা রাখেন, 'নীল আকাশে কে ভাসালে সাদা মেঘের ভেলা', তখন মনে হয় তিনি সন্ধান করছেন সেই প্রেমের যার রসে সিক্ত প্রকৃতি। তবে তার এই বিমূর্ত প্রেম, এই সন্ধান আরও পরিপূর্ণতা পায় যখন তিনি লেখেন, 'কতবার তুমি মেঘের আড়ালে/এমনি মধুর হাসিয়া দাঁড়ালে/অরুণকিরণে চরণ বাড়ালে/ললাটে রাখিলে শুভ্র পরশন'....। তখন আমরা বাস্তব মেঘের পাশে পরাবাস্তব সেই সত্যের সন্ধান পাই, যা আমাদের চিত্তে এবং চেতনায় বিরাজমান। তা ছাড়া তার 'সীমার মাঝে অসীম তুমি ...' এই কবিতায়ও আমরা সেই সর্বেশ্বরবাদের সন্ধান পাই যে সর্বেশ্বরবাদে রবীন্দ্রনাথ বিশ্বাসী ছিলেন আগাগোড়া। গীতাঞ্জলির আরেকটি পঙ্ক্তিমালা, 'রূপ সাগরে ডুব দিয়েছি, অরূপ রতন পাবো বলে' সেখানেও তিনি বিমূর্ত এবং নিরাকার এক সত্যের সন্ধান করেছেন।
সুতরাং গীতাঞ্জলিতে তো বটেই তার অন্যান্য লেখায়ও আমরা খুঁজে পাই সেই রবীন্দ্রনাথকে, যিনি দেশকালের সীমারেখায় আবদ্ধ নন আদৌ, যার প্রেম অতিক্রম করে যায় মানুষ ও প্রকৃতিকে এবং স্পর্শ করে প্রকৃতি ও মানুষের অন্তরালের এক অভিন্ন ও অনন্য প্রেমকে, তাকে যেভাবেই বিশ্নেষণ বা পর্যালোচনা করা হোক না কেন, চূড়ান্ত অর্থে তিনি তারই প্রেমে নিমগ্ন। তার সব অভিযোগ ও অভিমান, তার উৎকণ্ঠা ও উপসম সবটুকুই রয়েছে ওই প্রেমাস্পদকে কেন্দ্র করে, যিনি যতটা প্রেমাস্পদ, ততটাই প্রেম। রবীন্দ্রনাথ বিশ্বকবি এ কারণেই যে, বিশ্ব-মানবের চেতনার সেই চত্বরে পৌঁছতে পেরেছেন। তিনি যেখানে অবস্থান করেন সেই অভিন্ন এবং অনপনেয় সত্য, যিনি বিভাজিত নন, কোনো বিশেষ ধর্মাচারের ঘেরাটোপে। তিনি প্রকাশিত এবং বিকশিত মানুষ ও প্রকৃতিতে। এই অন্য এক অনন্য রবীন্দ্রনাথকে চিনতে না পারলে বৃথা হয়ে যাবে সেই গানও, 'আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না আর, এই জানারই সঙ্গে সঙ্গে তোমায় চেনা।'
যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাংবাদিক
- বিষয় :
- রবীন্দ্রনাথ
- আনিস আহমেদ
