ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

প্রতিবেশ

নদীর সঙ্গে বিপন্ন জনপদ

নদীর সঙ্গে বিপন্ন জনপদ
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২২ | ১২:০০ | আপডেট: ১১ জুন ২০২২ | ১৪:২৬

নদীমাতৃক বাংলাদেশ। নদীকে কেন্দ্র করেই জীবন-জীবিকা। নদীর সঙ্গে ছুটে চলেছে মানুষ। গড়ে তুলেছে জনপদ। বনচারী মানুষ খুঁজে পেয়েছে তার ঠিকানা। কিন্তু কৃষি সভ্যতা নদীকে সামনে নিয়ে এগিয়ে চললেও শিল্পবিপ্লব নদীকে আর সামনে রাখতে পারেনি। দিন দিন তা পিছিয়ে নিয়ে গেছে। নগর সভ্যতায় নদী ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। আবর্জনা, মলমূত্র, কলকারখানার বর্জ্য সবকিছুর স্থান হয়েছে নদীতে। নদীর চরিত্র হারানোর সঙ্গে সঙ্গে মানুষও তার চরিত্রের পরিবর্তন দেখতে পায়। ইংরেজ আমল থেকে যে ভুলে নদীশাসন শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতা পাকিস্তান হয়ে বাংলাদেশে এখনও চলমান। একের পর এক ভুল পরিকল্পনায় নদীকে বেঁধে ফেলা হয়েছে। বলাই যায়, ইংরেজ আমলাদের ভুল হস্তক্ষেপে নদীকে মানুষ থেকে আলাদা করা শুরু হয়েছিল। পাকিস্তান আমলে এর অনুশীলন চলেছে সফলভাবে। বাংলাদেশও থেমে না থেকে ভুল কাজ চালিয়ে গেছে আর যাচ্ছে। মারাত্মক ভুল পরিকল্পনার ফলস্বরূপ দেশের এক অংশ ভয়াবহ বন্যায় ডুবে গেলে অন্য অংশ খরায় সব পুড়ে যায়। সঙ্গে স্থায়ী জলাবদ্ধতা তো আছেই। দেশের সাধারণ মানুষ নদীর সর্বনাশা রূপ দেখে তা থেকে মুক্তির পথ খুঁজতে আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে। অনেক মানুষ নদীকে জানার জন্য প্রচণ্ডভাবে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনের জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় নদীর বৈজ্ঞানিক সত্য প্রকাশের জন্য নানা নিবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে এবং টেলিভিশনেও একই ধরনের আলোচনা শোনা যাচ্ছে। যদিও এতে যে দেশের নদনদীর চিত্র এবং গৃহীত পরিকল্পনার বিষয়গুলো সাধারণ ভুক্তভোগী মানুষের কাছে খুব পরিস্কার হয়ে যায়- এমন দাবি করা যাবে না। বিজ্ঞানসম্মতভাবে নদী রক্ষার কার্যক্রম বিশ্নেষণে যেসব তথ্য-উপাত্ত প্রয়োজন তাও সব সময় পাওয়া যায় না। আর তা পেলেও বিশ্নেষণের জন্য নিজেদের অক্ষমতার দায়ও কোনো অংশে কম নয়।

দেশের মানুষের জন্য নদীকে জানার ক্ষেত্রে বই একটা মাধ্যম। অথচ আমাদের দার্শনিকরা সহজে এ কাজে ব্রতী হন না। হয়তো কাজটা বেশ কঠিন বলেই সহজে কেউ এগিয়ে আসতে চান না। তবে এখন অবস্থার অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তাই বেশকিছু বই পাওয়া যায়। যদিও 'এসব বই সাধারণ মানুষের মধ্যে নদীকে জানার আগ্রহ সৃষ্টি করতে, বৈজ্ঞানিক সত্য জানাতে যথেষ্ট'- এমন অবস্থা আজও তৈরি করা যায়নি। সাধারণ বোধসম্পন্ন জনগণের জন্য জটিলতা পরিহার করে সহজবোধ্য বই প্রয়োজন। এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন, আমাদের রাজনীতিতে প্রযুক্তি চিন্তা না থাকার কারণে দেশি-বিদেশি পরিকল্পনা যথার্থ জনকল্যাণে কিনা, তা বিশ্নেষণ করা এখনও সম্ভব হয়নি। এখানকার পেশাজীবীরাও পরিকল্পনাগুলোতে সাধারণ জনগণের কল্যাণকে বিবেচনায় কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ করেন না। অতীত থেকে নিয়ে বর্তমান সময়েও যে অবস্থার পরিবর্তন এসেছে, এমনটা দেখা যায় না। স্বাধীনতাও মানসিক পরিবর্তন করতে পারেনি। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা চলমান। দেশের সাধারণ জনগণ গলার ফাঁস ছাড়ানোর জন্য যে আন্দোলন-সংগ্রাম করে চলেছে তা শোনার জন্য, বিবেচনার জন্য যেন সংশ্নিষ্টদের জন্মই হয়নি। বরং বিদেশি পরামর্শে নদীশাসনের ক্ষেত্রে দেশের রাজনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের ঐক্যের বিষয়টি লক্ষণীয়।

যশোর-খুলনার দুঃখ ভবদহ। বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে বাঁধ দিয়ে, স্লুইসগেট নির্মাণ করে বিশাল এলাকা আজ জলাবদ্ধ। এই বিশাল এলাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে যে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়, তাতে আপেক্ষিকভাবে এলাকাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা সম্ভব হলেও আগামীতে যে আরও বিশাল এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়বে- এই সাধারণ বোধটুকু আমাদের অনেক রাজনীতিবিদ বা পেশাজীবীর নেই। জলাবদ্ধতা নিরসনে নতুন করে নদীর নিম্নাঞ্চলে স্লুইসগেট নির্মাণ কোনো সমাধান হতে পারে না। জনকল্যাণের জন্য যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে এই দুঃখ ক্রয় করা হয়েছিল, তার অন্তত ১০ গুণ অর্থ পরিকল্পকরা এ পর্যন্ত ব্যয় করেছেন সে দুঃখ মোচনের জন্য। জনকল্যাণের নামে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করার পর জলাবদ্ধতা জগদ্দল পাথরের মতো এলাকার মানুষের ওপর চেপে বসেছে।

খুলনা অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ নদ ভৈরব মাথাভাঙ্গা নদী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে দীর্ঘদিন ধরে মৃতপ্রায়। নদী সংস্কার করার জন্য ৮-১০টি দল তিন দশক ধরে আন্দোলন করলেও তাদের মধ্যে চাহিদার সমন্বয় ছিল- এমন দাবি করা যাবে না। যে যার চাহিদামতো আন্দোলন করছে। তথ্য-উপাত্ত না পাওয়া, বৈজ্ঞানিক সত্য না জানার কারণেই এমনটা হয়েছে বলে বিশ্বাস করি। এক যুগ আগে প্রধানমন্ত্রী যশোর সফরে এসে ভৈরব নদ সংস্কারের নির্দেশ দেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এখন নদ সংস্কার প্রকল্প চলমান। প্রকল্পের লক্ষ্য ড্রেনেজ সিস্টেমের উন্নয়ন এবং সেচ সুবিধা বৃদ্ধি, যা নদীকে বহমান করবে না। বহতা নদী না হলে নদী সংস্কার যে জনকল্যাণে কোনো ভূমিকা রাখতে অক্ষম- তা চলমান প্রকল্প দেখে সহজেই অনুমেয়। সাধারণ মানুষ প্রতিদিন এ বিষয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ পরিকল্পকদের কাছে এসব প্রতিক্রিয়া কোনো মাথাব্যথার কারণ হিসেবে বিবেচ্য নয়। উন্নয়নের আনন্দে তাঁরাসহ কিছু মানুষ আবেগাপ্লুত- প্রধানমন্ত্রী এলাকাবাসীর দাবি পূরণ করে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, প্রধানমন্ত্রী নিশ্চিতভাবে নদী মানুষের জীবন-জীবিকায় যেসব ভূমিকা রাখে তার মাত্র একটি বা দুটি কাজের জন্য নদ সংস্কারের নির্দেশ দেননি। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে পেশাজীবী পরিকল্পকদের দায়িত্ব ছিল নদের বহতা রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা। সাধারণ মানুষের দুর্ভাগ্য, তারা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও বহতা নদ পাবে না।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ হলেও আমাদের বড় বড় নদীর উৎসমুখ বিদেশে। দেশগুলো নিজ নিজ পরিকল্পনামতো নদী ব্যবহারের ফলে সমন্বয়হীনতা প্রকট। সর্বত্র যে সুবাতাস বইছে, এমন দাবিও করা যাবে না। আমাদের দেশের মতো বিদেশেও নদী উন্নয়নের নানা পরিকল্পনা সাধারণ জনগণের জন্য বিপদ বয়ে এনেছে- এমন উদাহরণও কম নেই। নৌপথের নাব্য সংরক্ষণের গুরুত্ব, রেল ও সড়ক যোগাযোগে নদীপথ বিপর্যস্ত, জমির উর্বরতা বিনষ্ট, জনস্বাস্থ্য রক্ষা ইত্যাদি বিষয় নদী ব্যবস্থাপনায় স্থান পায়নি। উৎসমুখের মালিক হওয়ার কারণে ভাটির দেশের নূ্যনতম অনুমতির তোয়াক্কা না করে ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়েছিল। সম্পূর্ণ অস্থায়ী ভিত্তিতে চালু করা হলেও গত ৫০ বছরে যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে ব্যারাজ বানানো, তা কতটা সফল- সে বিশ্নেষণ আজ জরুরি। কলকাতা বন্দরের নাব্য রক্ষা ও ভাগীরথী নদীর মজে যাওয়ার বর্তমান অবস্থাই ব্যারাজের সফলতার নির্ধারক হয়ে গেছে। তবে ব্যারাজ আমাদের পদ্মা নদীর জন্য অনিষ্টকর বিপদ সৃষ্টি করেছে। নানা পরিকল্পনায় গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ বছর বছর কমছে। এর প্রভাব আমরা ভোগ করছি। জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণতামুক্ত, ভিন্ন রাষ্ট্র হলেও পরস্পরের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব, নেতৃস্থানীয়দের মনোমালিন্য দূরে রাখা সম্ভব হলে নদীর আজকের এমন বেহাল দশা হতো না। একটা সময় ছিল যখন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ দিয়ে যে রেল যোগাযোগ ছিল, তা দুই বাংলার একটা বড় অংশ ব্যবহারের সুযোগ পেত। সহযোগিতার মনোভাব সৃষ্টি করতে না পারার কারণে নদীতে ব্রিজ তৈরির একটা প্রতিযোগিতা শুরু হলো। একেকটি ব্রিজ নদীর পানিপ্রবাহে বাধা সৃষ্টি করতে থাকে। ফলে পলি পড়ে নদীর খাদ উঁচু হতে থাকে। নদীর সঙ্গে সঙ্গে জনপদ বিপন্ন হতে থাকে। প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি যে অন্যায়- তা কেউ স্বীকার করতে চায় না।

এম আর খায়রুল উমাম: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)
[email protected]

আরও পড়ুন

×