তুচ্ছ ঘটনায় প্রাণহানি
নিছক আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬ | ০৮:৩২
| প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে তুচ্ছ ঘটনায় যেইভাবে অমূল্য প্রাণ ঝরিতেছে, উহা উদ্বেগজনক। বৃহস্পতিবার সমকালে প্রকাশিত কয়েকটা ঘটনায় দেখা যাইতেছে, সামান্য কারণেই প্রতিপক্ষকে হত্যা করা হইয়াছে। রংপুরে থুতু ফেলাকে কেন্দ্র করিয়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটিয়াছে। লক্ষ্মীপুরে ফোন চুরির অপবাদে এক শিক্ষার্থীকে প্রহারে হত্যা করা হইয়াছে। গাইবান্ধার এক কিশোরকে পুকুরে চুবাইয়া হত্যা করা হইয়াছে। যশোরে খুন হইয়াছেন আরেক যুবক। এই সকল অঘটন কেবল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয় না; বরং সমাজে সহনশীলতা, মানবিকতা ও আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ কতটা দুর্বল হইয়া পড়িয়াছে, উহারও নির্মম প্রতিচ্ছবি।
সামান্য সামাজিক আচরণ লইয়া অসামান্য বিরোধ বাংলাদেশে নূতন নহে। কিন্তু এই সকল বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া সাম্প্রতিককালে সংঘর্ষের মাত্রা যেই পর্যায়ে পৌঁছাইতেছে, উহা অদৃষ্টপূর্ব। উদ্বেগের বিষয়, ক্রমশ উহা বৃদ্ধি বৈ হ্রাস পাইতেছে না। এই সকল ক্ষুদ্র বিরোধ বৃহৎ সংঘর্ষে রূপান্তরিত হইবার পূর্বে নিজেরাই সমাধান করিবার কাণ্ডজ্ঞানও সমাজে অনুপস্থিত কিনা, ভাবনার বিষয়। অতীতে ব্যক্তিগত নানা বিরোধ সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে মীমাংসা হইত। বর্তমানে ঐগুলি হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত গড়াইতেছে কেন? ইহাই প্রমাণ করে, মানুষ ক্রমেই অসহিষ্ণু হইয়া উঠিয়াছে। মতভেদ বা বিরোধকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের সংস্কৃতির পরিবর্তে শক্তি প্রয়োগ, হুমকি এবং সহিংসতা স্থান করিয়া লইতেছে।
চুরি কিংবা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ উঠিলে উহার তদন্ত, বিচার এবং আইনের মাধ্যমে দোষী-নির্দোষ নির্ধারিত হইবে। কিন্তু উদ্বেগজনকভাবে দেখা যাইতেছে, অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগই যেন শাস্তির ভিত্তি হইয়া উঠিতেছে। অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার পরিবর্তে জনতার আবেগ, রাগ কিংবা প্রতিশোধস্পৃহা মানুষের জীবন-মৃত্যুর সিদ্ধান্ত নির্ধারণ করিতেছে। ইহা কেবল আইনের শাসনের জন্য নহে, সমাজের জন্যও ভয়াবহ সংকেত। বিশেষত অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকারের শাসনামলে মব সন্ত্রাস যেইভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছিল; নির্বাচিত সরকারের শাসনামলেও উহা প্রত্যাশিত মাত্রায় হ্রাস পায় নাই। এই ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী উহার দায় উপেক্ষা করিবে কী প্রকারে?
আরও বিস্ময়কর, সমাজে সংবেদনশীলতাও যেন ক্রমহ্রাসমান। কেহ আক্রান্ত হইলেও পরিপার্শ্বের মানুষ নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিয়া থাকে। নির্যাতন কিংবা সংঘাত থামাইবার চেষ্টা না করিয়া বরং উহার ভিডিও ধারণ করিয়া সামাজিক মাধ্যমে ছড়াইয়া দিতে উৎসাহী লোকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পাইয়াছে। কেবল আইনি নহে, ইহা নৈতিক সংকটও বটে। যখন একটা সমাজ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াইবার সাহস হারাইয়া ফেলে, তখন সহিংসতা স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়।
এই ধরনের অঘটন প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ভূমিকা যদ্রূপ গুরুত্বপূর্ণ, তদ্রূপ সমাজের দায়ও কম নহে। অপরাধ দমনে কঠোরতার বিকল্প নাই, কিন্তু অধিক প্রয়োজন আইনের প্রতি আস্থা গড়িয়া তোলা। মানুষকে বুঝিতে হইবে, অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নহে এবং কোনো অবস্থাতেই আইন আপন হস্তে তুলিয়া লইবার অধিকার কাহারও নাই।
মানুষের জীবন অমূল্য। থুতু ফেলা, ফোন কিংবা অন্য কিছু চুরি বা অন্যান্য অপরাধ অথবা সামান্য বিরোধ; কোনোটাই একটা প্রাণ কাড়িয়া লইবার বৈধতা দিতে পারে না। তাই প্রতিটা প্রাণহানির ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি। এই ক্ষেত্রে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলিকেও সক্রিয় হইতে হইবে। শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মনুষ্যত্ববোধের শিক্ষা দেওয়া জরুরি।
সার্বিক বিচারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখিতেই হইবে। মানুষ তখনই স্বহস্তে আইন তুলিয়া লয়, যখন বিচারপ্রাপ্তির আশা ফিকে হইয়া উঠে এবং চতুষ্পার্শ্বে অপরাধপ্রবণতা ছড়াইয়া পড়ে। বৃহস্পতিবারের সমকালের শেষ পৃষ্ঠায় উঠিয়া আসা খুন ও ধর্ষণের চিত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তৎপর হইবার তাগিদই দিয়া যাইতেছে। আর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও সদিচ্ছা ব্যতীত উহা কীভাবে সম্ভব?
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
