ইউনিয়নের বিতর্কিত নামকরণ
‘অলৌকিক’ কাণ্ডের লৌকিক কর্তব্য
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৭ জুন ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
বগুড়ার নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের নামকরণ বিষয়ে যেই প্রশ্ন উঠিয়াছে উহা সংগত বলিয়া আমরা মনে করি। সম্প্রতি প্রতিমন্ত্রীর সংসদীয় আসনভুক্ত শিবগঞ্জ উপজেলাকে ভাঙ্গিয়া মোকামতলা নামে আরেকটি উপজেলা গঠন করা হইয়াছে। তৎসহিত উক্ত দুই উপজেলায় চারটি নূতন ইউনিয়নও গঠিত হইয়াছে, যেগুলির মধ্যে তিনটির নামকরণ হইয়াছে প্রতিমন্ত্রীর বংশ পদবি এবং সন্তানদের নাম অনুসরণে। ইউনিয়ন তিনটি হইল ‘মীরবাড়ী’, ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’– যেইখানে মীরবাড়ীর নাম আসিয়াছে প্রতিমন্ত্রীর বংশ পদবি ‘মীর’ হইতে। আর ‘সীমান্ত’ ও ‘দিগন্ত’ তাঁহার দুই পুত্রের নাম। স্থানীয় বিএনপি নেতা এবং সাধারণ মানুষের সহিত আলোচনার ভিত্তিতে মঙ্গলবার সমকালে প্রকাশিত প্রতিবেদনসূত্রে জানা যাইতেছে, গত ৩ জুন শিবগঞ্জ উপজেলার এক সভায় বিএনপির এক নেতা ইউনিয়নগুলির নামকরণ বিষয়ে প্রস্তাব করিলে সভায় সর্বসম্মতিক্রমে তাহা গৃহীত হয়। উপজেলা প্রশাসন প্রেরিত নামগুলিই জেলা প্রশাসক ১১ জুন এবং ১৪ জুন গেজেটরূপে প্রকাশ করিয়াছেন।
সোমবার জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় এক সদস্য এই বিষয়ে প্রশ্ন তুলিলে প্রতিমন্ত্রী দুর্ভাগ্যবশত বাগাড়ম্বরে উহা আড়াল করিবার অপচেষ্টা চালাইয়াছেন। এমনকি এই নামকরণকে তিনি ‘অলৌকিক’ ঘটনা আখ্যা দিয়া ইহার সহিত নিজের সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করিতে খোঁড়া যুক্তি দেন– সন্তানদের নামের সহিত মীর থাকায় তিনি সুপারিশ করিলে ইউনিয়নগুলির নাম হইত মীর সীমান্ত, মীর দিগন্ত। সন্দেহের সুবিধা দিয়া বলা যায়, এই নামকরণের সহিত প্রতিমন্ত্রীর সরাসরি সম্পর্ক নাও থাকিতে পারে। কারণ বিদ্যমান আইন অনুযায়ী, বিষয়টি একান্তই জেলা প্রশাসকের এখতিয়ারে। কিন্তু তাঁহার দলীয় নেতারাই যে এই বিতর্কিত নামকরণের উদ্যোক্তা– উহা স্পষ্ট। আর বিদ্যমান ব্যবস্থায় নির্বাচনী আসনের ‘দণ্ডমুণ্ডের কর্তা’ স্থানীয় সংসদ সদস্যের, তদুপরি প্রতিমন্ত্রী, অজ্ঞাতসারে অতিউৎসাহী কেহ এই ঘটনা ঘটাইয়াছেন– এমন যুক্তিও অবিশ্বাস্য।
আমরা মনে করি, এই ঘটনায় প্রচলিত আইন লঙ্ঘিত হইয়াছে। কারণ, ইউনিয়ন পরিষদ আইন ২০০৯-এর ১১(১) ধারা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নামে ইউনিয়নের নামকরণ করা যায় না। ইহা সত্য, প্রচলিত বিধান অনুসারে, কোনো ব্যক্তি বা পরিবার সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি দান করিলে সেই প্রতিষ্ঠানের নাম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা পরিবারের কোনো সদস্যের নামে হইতে পারে। ইতোপূর্বে দেশের বহু স্থানে এমন নজির স্থাপিত হইয়াছে। কিন্তু কোনো ইউনিয়নের নাম ব্যক্তি বা পরিবারের নামে এই প্রথম দেওয়া হইয়াছে, যাহাকে পরের ধনে পোদ্দারি বলিলেও অত্যুক্তি হইতে পারে না। গণতান্ত্রিক রীতিনীতির সহিতও তাহা সংগতিপূর্ণ নহে।
স্মরণ করা যাইতে পারে, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় নানাবিধ সরকারি প্রতিষ্ঠানের নাম খ্যাতনামা ব্যক্তিদের নামে দেওয়া হইলেও নিছক দলীয় সংকীর্ণ চিন্তা ক্রিয়া করায় ঐ নামকরণ অনেকাংশে বিতর্কেরও জন্ম দিয়াছে। সেই বিতর্কের জের ধরিয়া রাজনৈতিক পালাবদলের পর ক্ষমতাসীন সরকার আবার উক্ত নামের স্থলে স্বীয় দলীয় নেতাদের নাম বসাইয়া নূতন বিতর্ক সৃষ্টি করিয়াছে। বলা বাহুল্য, জনগণের অর্থে গড়া প্রতিষ্ঠানের নামকরণ লইয়া এহেন পাল্টাপাল্টি কর্মকাণ্ড শুধু অর্থের অপচয় ঘটায় নাই; রাজনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলিয়াছে। কে বলিতে পারে, ভবিষ্যতে আলোচ্য তিন ইউনিয়নের নাম রাজনৈতিক পালাবদলের সহিত পাল্টাইয়া যাইবে না!
বিগত সময়ে সংসদ সদস্যদের যেভাবে সংশ্লিষ্ট এলাকার দণ্ডমুণ্ডের কর্তা বনিয়া যাইতে দেখা গিয়াছে। যাহার ফলে ঐ এলাকায় শুধু পরিবারতন্ত্রই জাঁকিয়া বসে নাই; স্থানীয় জনগণ বহু অন্যায়-অত্যাচারও ভোগ করিয়াছেন। আলোচ্য ঘটনায় কেহ উহার আলামত খুঁজিয়া পাইলে তাঁহাকে দোষ দেওয়া যাইবে না। আমরা জানি, বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব অতীতের জমিদারতন্ত্র হইতে বাহির হইয়া আসার প্রতিশ্রুতি দিয়াছেন। সেই হিসাবে উক্ত বিতর্কিত নামকরণ বিষয়ে সরকার দ্রুত পুনর্বিবেচনামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিবে, ইহাই আমাদের প্রত্যাশা। নামকরণের এই কাণ্ড যত ‘অলৌকিক’ হউক না কেন, উহা শোধরাইতে লৌকিক কর্তব্য কঠিন নহে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়
