যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলের অকার্যকরতা
জবি কর্তৃপক্ষ জাগ্রত হউক
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬ | ১২:১৪
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-জবির যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলের কার্যকরতা লইয়া যে সকল প্রশ্ন উঠিয়াছে, সেইগুলি গুরুতর বলিয়া আমরা মনে করি। ভুক্তভোগীদের অভিমত উদ্ধৃত করিয়া রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে জানানো হইয়াছে, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থীই উক্ত যৌন নিপীড়নবিরোধী সেল সম্পর্কে অবগত নন। উপরন্তু অভিযোগ জানাইয়াও অনেকে উক্ত সেল হইতে কোনো সাড়া পান না। এমনকি উপাচার্য ভবনসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটি স্থানে স্থাপিত অভিযোগ বাক্সগুলি নিয়মিত খোলা হয় না। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের ভোটে নির্বাচিত শিক্ষার্থী সংসদ জকসুও এই বিষয়ে তৎপর নহে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ দায়ের প্রক্রিয়া সহজ করার জন্য তাহারা অ্যাপস চালুর প্রতিশ্রুতি দিলেও কখন উহা আলোর মুখ দর্শন করিবে, কেহ জানে না। এহেন পরিস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের দায়িত্বহীনতাই নহে শুধু; নারী অধিকারের প্রতি সংবেদনহীনতার প্রকাশ বলিয়া আমরা মনে করি, যদিও প্রতিবেদনে জবি যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলের প্রধান অভিযোগগুলি অস্বীকার করিয়াছেন; উপাচার্যও গতানুগতিকভাবে যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে তথাকথিত ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহিষ্ণুতা প্রদর্শনের ঘোষণা দিয়াছেন।
প্রসঙ্গত, যৌন হয়রানি বন্ধে ২০০৯ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়নপূর্বক দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তাহা বাস্তবায়নে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে (ইউজিসি) নির্দেশ দেন উচ্চ আদালত। উক্ত নির্দেশনা অনুসরণ করিয়াই অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও যৌন নির্যাতনবিরোধী সেল গঠিত হয়। কিন্তু সেই সেল আদৌ কোনো কার্যে আসিতেছে কিনা, মঞ্জুরি কমিশন তাহা আর তদারক করে নাই। অতএব, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ইতোমধ্যে সংঘটিত যৌন হয়রানির অনেক ঘটনা অন্তরালে থাকিয়া গিয়াছে বলিয়া প্রতিবেদনে যে উদ্বেগজনক তথ্য দেওয়া হইয়াছে, উহার দায় মঞ্জুরি কমিশনও উপেক্ষা করিতে পারে না।
বিগত বৎসরগুলিতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বহু যৌন নির্যাতন ও হয়রানির ঘটনা ঘটিয়াছে। সেইগুলির বিরুদ্ধে বেশ কিছু ক্ষেত্রে তৎক্ষণাৎ আন্দোলনও গড়িয়া উঠিয়াছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ও এই ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নহে। তবে, অতি অল্প কিছু ক্ষেত্রে এহেন অভিযোগের বিচার হইয়াছে। অনেক ক্ষেত্রে অপরাধী ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট ছিল বলিয়া বিবিধ বাহানায় অভিযোগগুলি ধামাচাপা দেওয়া হইয়াছে। প্রধানত এই কারণেই প্রতিষ্ঠানগুলিতে অদ্যাবধি নারী নির্যাতনের মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা নিরন্তর ঘটমান। এই প্রসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষার্থী অবন্তিকার দুঃখজনক আত্মহত্যার কথা স্মরণ করা যায়। সহপাঠী ও শিক্ষক কর্তৃক যৌন নিপীড়নের প্রতিকার না পাইয়া আইন বিভাগের এই শিক্ষার্থী ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ সামাজিক মাধ্যমে এক ব্যাখ্যামূলক পোস্ট দিয়া আত্মহনন করেন। ঐ ঘটনায় শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নহে; প্রায় সর্বত্র শিক্ষার্থী-জনতার মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। তাহার বহিঃপ্রকাশস্বরূপ আন্দোলনও হয়। কিন্তু হতাশাজনকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ উক্ত ঘটনার পরও জাগ্রত হয় নাই। আমরা জানি, সমাজের অগ্রসর মানুষেরাই একটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনায় যুক্ত থাকেন, যাহারা শুধু উচ্চতর জ্ঞান নহে, উন্নত মূল্যবোধেরও চর্চা করেন।
স্বাধীনতাপূর্ব হইতে অদ্যাবধি দেশে যত রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক আন্দোলন হইয়াছে, সেইগুলিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলি বাতিঘরের ন্যায় কার্য করিয়াছে। এহেন প্রতিষ্ঠানেও নারী অধিকারের প্রতি এতটা উদাসীনতা তাই হতাশার সৃষ্টি করে। আমরা জানি, বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও সমাজে বহু গণতান্ত্রিক সংগ্রাম সত্ত্বেও পুরুষতন্ত্র জাঁকিয়া বসিয়া আছে। এই কারণে রাষ্ট্রের আইন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিচারালয় নারী অধিকারের প্রতি যথেষ্ট সংবেদনশীল নহে। উহার অন্যতম প্রকাশস্বরূপ নারী নির্যাতনের ঘটনাবলি, এমনকি ধর্ষণের ন্যায় গুরুতর অপরাধও অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সকলের যথাযথ মনোযোগ আকর্ষণ করে না। বিচারের বাণী অনেক ক্ষেত্রেই নিভৃতে ক্রন্দিত। আমরা মনে করি, এই নারী-বৈরী পরিবেশ পাল্টাইবার সংগ্রামের নেতৃত্ব বিশ্ববিদ্যালয় হইতেই আসিবে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলিকে নারীবান্ধবরূপে গড়িয়া তোলার স্বার্থে বিশেষত যৌন নির্যাতন ও হয়রানির যে কোনো অভিযোগ গুরুত্বের সহিত লইতে হইবে। ইহারই অংশ হিসাবে জবিসহ সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন নিপীড়নবিরোধী সেলগুলি দ্রুত সক্রিয় হইবে, যথায় ভুক্তভোগী মাত্রেই প্রতিকার মিলিবে।
- বিষয় :
- জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
- সম্পাদকীয়
