ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনে স্থবিরতা

শিশুপুষ্টির প্রতি উদ্বেগজনক ঔদাসীন্য

শিশুপুষ্টির প্রতি উদ্বেগজনক ঔদাসীন্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬ | ০৭:২৪

| প্রিন্ট সংস্করণ

শিশুদের ভিটামিন ‘এ’ প্লাস ক্যাম্পেইন পুনরায় পিছাইবার বিষয় যথেষ্ট উদ্বেগজনক। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুসারে, জুনের ১০ তারিখের মধ্যে দেশব্যাপী এই কর্মসূচি আয়োজনের পরিকল্পনা ছিল। সময়মতো ক্যাপসুল সরবরাহ না পাওয়ায় তাহা সম্ভব হইতেছে না। দেশে সর্বশেষ এই ক্যাম্পেইন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল গত বৎসরের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী বৎসরে দুইবার উহা আয়োজিত হইবার কথা। সেই হিসাবে সেপ্টেম্বর ও মার্চে দুইটি বিশেষ ক্যাম্পেইন আয়োজনের সময় নির্ধারিত হইলেও উহা বাস্তবায়িত হয় নাই। অর্থাৎ একাদিক্রমে ১৪ মাসাধিককাল শিশুস্বাস্থ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচিটি বন্ধ রহিয়াছে; এই দীর্ঘ সময় প্রায় সোয়া দুই কোটি শিশু নিয়মিত ডোজ হইতে বঞ্চিত হইতেছে। 

প্রসংগত, ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৬ হইতে ১১ মাস বয়সী শিশুদের এক লক্ষ আইইউ এবং ১ হইতে ৫ বৎসর বয়সী শিশুদের ২ লক্ষ আইইউ ডোজের ক্যাপসুল খাওয়ানো হয়। ইহার সহিত সাধারণত জাতীয় কৃমিনাশক সপ্তাহও পালিত হয়। কারণ শরীরে কৃমি থাকিলে ভিটামিন ‘এ’র পূর্ণ শোষণ বাধাগ্রস্ত হয়। দুই বৎসর যাবৎ এই কর্মসূচিও বন্ধ। ভিটামিন ‘এ’র অভাবে দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, রাতকানা এবং গুরুতর ক্ষেত্রে অন্ধত্ব হইতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণের মতে, এই ক্যাম্পেইন অনিয়মিত হইবার প্রভাব তাৎক্ষণিক স্পষ্ট না হইলেও দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর পুষ্টি ও রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ বলিয়াছেন, এক বৎসরের বেশি সময় যাবৎ ক্যাম্পেইন না হওয়ায় অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজ পায় নাই। অন্যদিকে হামের কারণে শিশুর শরীরের ভিটামিন ‘এ’র মজুত দ্রুত হ্রাস পায়। ফলে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও অপুষ্টির মতো জটিলতার বৃদ্ধি ঘটে, যাহা শিশুর মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধি করিয়া দেয়। 

গত কয়েক মাস ধরিয়া দেশে হামের যেই ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব চলিতেছে, তাহাতে ছয় শতাধিক শিশু ইতোমধ্যে প্রাণ হারাইয়াছে। এই মৃত্যুর ব্যাখ্যা দিতে গিয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তর স্বল্প ক্ষেত্রে হামের কথা স্বীকার করিলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে হামের উপসর্গের সহিত অন্য রোগের কথা উল্লেখ করিয়াছে। সেই ‘অন্য রোগ’-এর সহিত ভিটামিন ‘এ’ সাপ্লিমেন্টেশন কার্যক্রম বন্ধ থাকিবার সম্পর্ক নাই, তাহা কে বলিতে পারে!
ইতোপূর্বে প্রকাশিত সমকালের আরেক প্রতিবেদন সূত্রে আমরা জানি, ২০২৪ সালের জুন মাসে স্বাস্থ্য খাতের সর্বশেষ কর্মপরিকল্পনার মেয়াদ শেষ হইবার পর নূতনটি অনুমোদনে দীর্ঘ বিলম্ব হয়। ইহার ফলে রাষ্ট্র প্রদত্ত বিভিন্ন টিকা ও চিকিৎসাসেবা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিষয়টি লইয়া অত্র সম্পাদকীয স্তম্ভে আমরা তখন উদ্বেগও প্রকাশ করিয়াছি। হামের টিকা ও ভিটামিন এ ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকিবার বিষয়ও তখন আলোচিত হয়। সেই সময় হামের টিকার ন্যায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল ক্রয়ের পদ্ধতি লইয়া সরকারের মধ্যে দ্বিধা ছিল, তাহাও আমরা জানি। তবে সম্ভবত পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুভব করিয়া বর্তমান সরকার অতীতের নিয়মে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ইউনিসেফের মাধ্যমে হামের টিকার ন্যায় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, যেই ক্যাপসুল সংস্থাটি অদ্যাবধি সরবরাহ করিতে পারে নাই। এই প্রেক্ষাপটে কেহ চাহিলে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন বিলম্বের জন্য ইউনিসেফকে দায়ী করিতেই পারেন। তবে সরকারের দিক হইতে তাগাদা দিবার ঘাটতি ছিল কিনা, তাহাও খতাইয়া দেখা দরকার।

আমাদের প্রত্যাশা, ২৭ জুন ক্যাম্পেইন আয়োজনের যেই তারিখ নির্ধারণ করা হইয়াছে, তাহা আর পিছাইবে না। সেই লক্ষ্যে প্রত্যেক শিশুই জাতির সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ– এই কথা বিবেচনায় লইয়া সংশ্লিষ্ট সকলকে তৎপর হইতে হইবে। 

আরও পড়ুন

×