ঢাকা শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

পল্লবীর শিশু হত্যার রায়

শিশু সুরক্ষায় পথপ্রদর্শক হউক

শিশু সুরক্ষায় পথপ্রদর্শক হউক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬ | ০৭:৩৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর পল্লবীর শিশু হত্যার রায় যেই দ্রুততার সহিত ঘোষণা করা হইয়াছে, উহাকে আমরা স্বাগত জানাই। এত কম সময়ের মধ্যে এহেন বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষত দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতির সহিত বিচারের দীর্ঘসূত্রতা যেইখানে দশকের পর দশক চলিতেছে। সোমবার প্রকাশিত সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবর অনুসারে, রবিবার ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনাল উক্ত মামলার আসামি সোহেল রানা ও তাঁর স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়াছেন। বস্তুত শিশুটিকে ধর্ষণের পর নৃশংসভাবে হত্যার অঘটন দেশের মানুষকে ব্যাপকভাবে নাড়া দিয়াছে। তজ্জন্য বিচারের দাবিতে নাগরিক সমাজ শুরু হইতেই বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করিয়াছে। এই পরিস্থিতিতে সরকারও নাগরিকদের অনুভূতি উপলব্ধি করিয়া দ্রুত বিচার অনুষ্ঠানে আদালতকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিয়াছে।

উল্লেখ্য, স্বীয় সন্তানকে হারাইয়া শিশুটির বাবা ‘বিচার চাহি না’ বলিয়া প্রথমে খেদোক্তি করিয়াছিলেন। উহাতে রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থার প্রতি তাঁহার আস্থাহীনতা ফুটিয়া উঠিয়াছিল। পরে অবশ্য প্রধানমন্ত্রী শোকসন্তপ্ত পরিবারের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া দ্রুততম সময়ের মধ্যে বিচারের প্রতিশ্রুতি প্রদান করিয়াছিলেন। উক্ত রায় নিশ্চয় সংশ্লিষ্ট পরিবারকে স্বস্তি দিয়াছে।

এই রায়ে প্রমাণ হইল– রাষ্ট্র ইচ্ছা করিলে যেই কোনো অপরাধের শাস্তি নিশ্চিত করিতে পারে। আবার ইহাও সত্য, কোনো ঘটনা যখনই সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়, তখনই রাষ্ট্র ও সরকারকে তদ্বিষয়ে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে তৎপর হইতে দেখা যায়। শিশু ধর্ষণ ও হত্যার প্রতিটি ঘটনাতেই আইন নিজস্ব গতিতে চলুক। আইনেই বলা রহিয়াছে কত দিবসে তদন্ত হইবে, কত দিবসের মধ্যে চার্জশিট ও আলামত সংগ্রহ করিতে হইবে। উহা যথার্থই প্রতিপালিত হউক। আদালত তাঁহার পর্যবেক্ষণে বলিয়াছেন, ন্যায়বিচার আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নহে; বরং তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন বা রাষ্ট্রপক্ষ, ডিফেন্স বা আসামিপক্ষ, সাক্ষী তথা বিচার ব্যবস্থার সকল অংশীজনের সমন্বিত দায়িত্বশীল ভূমিকাই তাহা নিশ্চিত করে। বিষয়টি সকলেরই মনে রাখা জরুরি।

আদালত যথার্থই বলিয়াছেন, শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার শিকার হইলে উহা শুধু পরিবারকেই নহে; গোটা সমাজকেই আহত করে এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাইয়া দেয়। আমরা প্রত্যাশা করি, আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সংশ্লিষ্ট সকলে আমলে লইবে। সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি নৃশংসতা ও বর্বরতার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবেই ক্রমবর্ধমান এবং দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিও এই ক্ষেত্রে প্রভাবক ভূমিকা পালন করিতেছে। তজ্জন্য সরকারকে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে মনোযোগী হইতে হইবে। 

ইতোপূর্বে আমরা দেখিয়াছি, ধর্ষণের মামলায় অনেক ক্ষেত্রে বিচারিক আদালতে রায় হইলেও উহা কার্যকর হইতে বিলম্ব হয়, যাহা বিচারপ্রার্থীদের হতাশা বৃদ্ধি করে। উচ্চতর আদালতে পর্বতপ্রমাণ মামলা স্তূপীকৃত বলিয়া তথায় আপিল, পাল্টা আপিল নিষ্পত্তি হইতে দীর্ঘ সময় ব্যয় হয়। এই অবস্থারই সুযোগ গ্রহণ করিয়া বহু অপরাধী জামিনের অধিকারী হয়। ক্ষেত্রবিশেষ অনেক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি জামিনে বাহির হইয়া পালাইয়াও যায়। আলোচ্য রায়ের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই সেই দীর্ঘসূত্রতা থাকিবে না। হাইকোর্টে যেন উহার শুনানি দ্রুত হয়, তদ্বিষয়ে পদক্ষেপ গৃহীত হইয়াছে বলিয়া আদালত সূত্রের বরাত দিয়া সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হইয়াছে। আমরা বিশ্বাস করি, পল্লবীর শিশু হত্যার রায় দেশে শিশুর সুরক্ষা ও নিরাপত্তায় পথপ্রদর্শক হইবে। ইহার পর কোনো শিশু যাহাতে এহেন নৃশংসতার শিকার না হয়, তজ্জন্য নাগরিক সমাজের প্রতিবাদও অব্যাহত রাখিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×