ঢাকা রোববার, ২১ জুন ২০২৬

উন্নয়ন

নদীমাতৃক দেশ যখন সড়কমাতৃক

নদীমাতৃক দেশ যখন সড়কমাতৃক
×

এম আর খায়রুল উমাম

প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৩ | ১৮:০০

‘সমৃদ্ধির জন্য প্রথম সোপান হচ্ছে যোগাযোগ, নদীর কারণে অনেক সময় যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়’। পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক বরিশাল ডিভিশনাল জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ‘পদ্মা সেতু : দক্ষিণাঞ্চলের স্বপ্ন বুনন’ শীর্ষক একটি আলোচনা সভায় এ কথা বলেছিলেন। নদীমাতৃক দেশের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নদীকে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাধা হিসেবে বিবেচনা করছেন। আসলেই এই বঙ্গদেশে রঙ্গের কোনো শেষ নেই। উন্নয়নের রেসে দৌড়ে চলা বাংলাদেশে এক-একটা সেতু বহতা নদীর জন্য কতটা ক্ষতির কারণ তা খতিয়েও দেখা হয় না।

 সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে প্রাধান্য দেওয়ার কারণে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে সর্বত্র। যমুনা সেতু থেকে শুরু করে যশোরের দড়াটানা সেতু পর্যন্ত একটা সেতুও পাওয়া যাবে না, যা নদীর দৈর্ঘ্য বিবেচনায় করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিজেদের মর্জিমতো সেতু নির্মাণ করেছে, স্লুইস গেট নির্মাণ করেছে, বাঁধ দিয়েছে। অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারলেই যেন সাধারণ মানুষকে উন্নয়ন দেখানো যায়।

সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য সেতুর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাবে না। পাশাপাশি ৫৫০০০ বর্গমাইলের এই বদ্বীপে নৌপথকে অবহেলা করার কোনো কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না এবং সড়ক যোগাযোগকে একমাত্র সমৃদ্ধির পথ বিবেচনা করা বুদ্ধিমানের কাজ বলে মনে হয় না। ভেবে দেখা প্রয়োজন, নদীমাতৃক দেশকে সড়কমাতৃক দেশে রূপান্তর করার কার্যক্রম দেশের অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলবে কিনা!

ভুল পরিকল্পনায় ভরা বাংলাদেশে পানিকে সম্পদ না করে সমস্যার আধার করে ফেলা হয়েছে। মালিকানাহীন নদীগুলোকে যার যেভাবে ইচ্ছা ব্যবহার করছে। নৌপথ দিনে দিনে কমছে, নদী খালে রূপান্তরিত হচ্ছে, দূষণ বাড়ছে আর দখল হচ্ছে। বন্যার প্রকোপ বাড়ছে, জলাবদ্ধ হয়ে পড়ছে বিশাল এলাকা।

বাঙালির বিদেশপ্রীতির কথা সর্বজনবিদিত। পাকিস্তান আমলের ক্রুগ মিশন থেকে শুরু হয়ে বর্তমান ডেলটা প্ল্যান সবখানেই দেশের পানিসম্পদ নিয়ে বিদেশি সুপারিশের ফুলঝুরি। যে কোনো সুপারিশেরই ভালোমন্দ দুটি দিকই থাকে। আমরা কোনটা গ্রহণ করব বা কোনটা গ্রহণ করব না তা বিচার করার দায়িত্ব আমাদের বিশেষজ্ঞদের। দেশি সমস্যার দেশি সমাধানই যে সর্বোৎকৃষ্ট তা অনেকের ভাবনার মধ্যে থাকে বলে মনে হয় না। ফলে বিদেশি সুপারিশ বাস্তবায়নের নামে যা হয় তা জনকল্যাণের চেয়ে জনদুর্ভোগের কারণ হয়েই শুধু দাঁড়ায়। তাছাড়া এক একটা দুর্ভোগ বিশেষজ্ঞদের লাভজনক। কারণ জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হয়ে গেলে তা নিরসনের জন্য একটার পর একটা পরীক্ষামূলক কার্যক্রম চলে আসে। কোনো ক্ষেত্রেই দেশি সমস্যার দেশি সমাধান করা হয় না, তাই মুক্তিও আসে না।

আমাদের মতো নদীমাতৃক দেশে নৌপথ সুলভ ও অনেকাংশেই ঝুঁকিমুক্ত হওয়ার কারণে কম খরচে পণ্য পরিবহন করা যায়। হিসাবে দেখা যায়, এক মণ পণ্য পরিবহন যদি নৌপথে ৫০ পয়সা লাগে তবে রেলে লাগে ৫ টাকা, সড়কে ২০ টাকা এবং বিমানে ১০০ টাকার মতো। এ কারণে বিশ্বব্যাপী নৌপথের গুরুত্ব আছে এবং দিনে দিনে বাড়ছে। আমরা মুখ ফিরিয়ে বসে আছি। প্রতিনিয়ত আমাদের নৌপথ কমছে। আমাদের দেশের নিরক্ষর মানুষগুলো নৌকায় শ্যালো ইঞ্জিন দিয়ে যে গতি সৃষ্টি করেছে তাতে যদি বিশেষজ্ঞদের হাত পড়লে অভাবনীয় পরিবর্তন সম্ভব হতো। ফলে সড়কপথ বৃদ্ধি আর জলপথ নিধন চলতেই থাকবে।

দেশের নদী রক্ষা করা যায়নি, খাল রক্ষা করা যায়নি, বিল-বাঁওড়-হাওর রক্ষা করা যায়নি, পুকুর রক্ষা করা যায়নি, এমনকি ড্রেনগুলো পর্যন্ত রক্ষা করা যায়নি। নদী, খাল দখল হয়ে গেছে, ড্রেন বন্ধ হয়ে গেছে, বিল-বাঁওড়ের প্রতি ইঞ্চি জমি আবাদ করতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলা হয়েছে। নদীর প্রাথমিক সর্বনাশ শুরু ব্রিটিশ আমল থেকে; যখন রেল ও সড়ক পথ গুরুত্ব পেতে থাকে। পাকিস্তানি আমল পেরিয়ে বাংলাদেশেও এ সর্বনাশের ধারা কমেনি বরং দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও আমাদের সরকারগুলো সর্বনাশের এ ধারা থেকে বের হতে পারেনি। বাংলাদেশের নদীতেই যে তার প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে তা সবাই ভুলে বসেছে।

বদ্বীপ গঠন প্রক্রিয়া চলমান থাকার কারণে প্রাকৃতিকভাবে নদীর মজে যাওয়ার প্রবণতা, খাত পরিবর্তন হওয়ার প্রবণতা রয়েছে। আমাদের অপরিকল্পিত অগ্রযাত্রার পাশাপাশি উদাসীনতা ও ভুল পরিকল্পনা নদীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়াকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানিবণ্টন সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং সংকট থেকে উত্তরণের কার্যক্রমের অভাব সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। সরকার আন্তরিক হয়ে সমুদ্র বিজয় করেছে, যে উদাহরণকে মনে রাখলে নদীরক্ষায় আন্তরিকতার ঘাটতি আছে বলেই প্রতীয়মান হয়।

সাধারণ জনগণ নদীর মালিকানা বিষয়ক একটা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছিল। নদীর মালিকানা না থাকার কারণে দেশে যে যার ইচ্ছা মতো নদীকে ব্যবহার করছে। নদী পরিকল্পনা করেছে, নদীশাসন করেছে, নদী দূষণ করেছে, নদী দখল করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে শুধু এক সুপারিশকারী কর্তৃপক্ষ তৈরি করা হয়েছে ফলে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে নদী নিয়ে খেলা চলছে। নদীসংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমের সমন্বয় হচ্ছে না। আন্তর্জাতিক নদীগুলোর একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিবাদে যেমন কাজ হচ্ছে না, তেমনি দেশের নদীগুলোকে নিয়ে কোনো পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনাও করা যাচ্ছে না। নদীমাতৃক দেশের জন্য এটা কাম্য হতে পারে না। পদ্মা সেতুর গর্বে পানিসম্পদ মন্ত্রীসহ অন্যরা ভুলে যাচ্ছেন যে নদী আমাদের এই বদ্বীপের প্রাণ। নদীর সুষ্ঠু প্রবাহ নিশ্চিত করার ওপরে সাধারণ মাণুষের জীবন ও বিকাশ নির্ভর করে আছে।

সরকার একদিকে নদীতে অবকাঠামো নির্মাণ করছে, পাশাপাশি আবার মজা নদী পুনরুদ্ধারের কাজ করছে পরিকল্পনাহীনভাবে; ফলে নৌপথ সৃষ্টি হচ্ছে না। মৎস্য চাষের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না, জনস্বাস্থ্যের উন্নতি হচ্ছে না, পানি নিষ্কাশনের উন্নত ব্যবস্থা হচ্ছে না, এমনকি শিল্প ও কৃষির উন্নতি হচ্ছে না। সার্বিক সংকট নিরসনে বিদেশিদের অনুকরণ ও অনুসরণ থেকে বের হয়ে এসে বদ্বীপের চরিত্রানুযায়ী পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন। আমেরিকায় জলাভূমিতে চাষ করা হয় ঠিকই কিন্তু কয়েক বছর পর আবার সেই জমিকে জলাভূমিতে পরিবর্তন করেও দেওয়া হয়। আমরা শুধু অন্ধ হাতি দর্শনের মতো চাষটুকুই দেখি, অনুকরণ করি। তাই বিদেশি অনুকরণ নয়। দেশি টেকসই পরিকল্পনা চাই। তার জন্য চাই জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতামূলক নদী মালিকানা কর্তৃপক্ষ। তা না হলে নদীমাতৃক দেশটা সড়কমাতৃক হয়ে যাবে অচিরেই। বদ্বীপের অস্তিত্ব সে ক্ষেত্রে বজায় থাকবে তো! 

এম আর খায়রুল উমাম: সাবেক সভাপতি, ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স, বাংলাদেশ (আইডিইবি)

আরও পড়ুন

×