ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন ২০২৬

অন্যদৃষ্টি

তামাকাসক্ত বাংলাদেশ

তামাকাসক্ত বাংলাদেশ
×

ইকবাল হাবিব

প্রকাশ: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৯:৩৬ | আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২৩ | ১৯:৩৬

নিবিড় পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, যে জমিতে তামাক চাষ হয়, পরে সেখানে অন্যান্য ফসলের প্রত্যাশিত উৎপাদন হয় না। অর্থাৎ যে জমিতে গড়ে ১৪-১৫ মণ ধান উৎপাদিত হতো, সে জমিতে তামাক চাষ হলে পরবর্তী সময়ে তা থেকে গড়ে ৫-৬ মণ ধানের উৎপাদন কমে যায়, যা আমাদের মতো দেশের পরিবেশ এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে নিঃসন্দেহে ঝুঁকিপূর্ণ।

সে হিসেবে অতীতের নীল চাষের সঙ্গে তামাক চাষের কোনো পার্থক্য দেখা যায় না। পরিবেশদূষণে তামাক পণ্য ব্যবহারের ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। ২০০৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা  ‘Framework Convention on Tobacco Control’-এর সন্ধি করে, যেখানে বাংলাদেশ প্রথম দিকের দেশ হিসেবে তাতে চুক্তিতে স্বাক্ষর করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে বিশ্বে তামাকদ্রব্য উৎপাদনে প্রতি বছর গড়ে ১১.৪ মিলিয়ন টন কাঠের প্রয়োজন হয়। এ প্রক্রিয়ায় ১৯৭০ সালের পর থেকে এখন পর্যন্ত দুনিয়া থেকে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন হেক্টর বন এই তামাকদ্রব্য উৎপাদনের কবলে পড়ে হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ একটি ‘ধূমপানাসক্ত জনগণের দেশ’ হিসেবে পরিবেশের জায়গা থেকে যথেষ্ট বিপজ্জনক অবস্থায় আছে। এ দেশের গাছপালা-বন উজাড়করণের মধ্যে ৩১ শতাংশই হয় তামাক চাষের ফলে। প্রতি বছর ৬৯ হাজার হেক্টর জমি কৃষি খাত থেকে বিবিধ কারণে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বিগত কয়েক বছরের খাদ্য ও কৃষি ইনস্টিটিউটের জরিপ মতে, বাংলাদেশে কৃষকরা তামাক চাষের দিকে ঝুঁকছে। কারণ এতে অর্থনৈতিকভাবে তাদের আপাত লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা সৃষ্টি করা হচ্ছে। ফলে প্রচুর পরিমাণ উর্বর জমি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা বাড়ছে। একই সঙ্গে জমি এবং নদীনালার পানির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। 

২০১৭ সালে বাংলাদেশ সরকার জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অধীনে জাতীয় তামাক চাষ নিয়ন্ত্রণ নীতি গ্রহণ করে। যেই নীতির মূল লক্ষ্যই ছিল চাষিদের তামাক চাষে নিরুৎসাহিত করা এবং তাদের অন্যান্য দরকারি ফসল চাষে উৎসাহ এবং সেই লক্ষ্যে সহায়তা দেওয়া। কিন্তু গৃহীত সেই নীতির কোনো আশানুরূপ ফল পাওয়া যায়নি। 

এ দেশে সর্বপ্রথম ২০০৫ সালে তামাকদ্রব্য ব্যবহার নিয়ে আইন প্রণয়ন করা হয়। পরে ২০১৩ সালে ওই আইনের সংশোধনী আনা হয়। দেখা যাচ্ছে, এত বছর পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্ট মতে, বাংলাদেশে ৩৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ তামাকদ্রব্য ব্যবহার করছে, যা মূলত সিগারেট এবং অন্যান্য মাধ্যমে। কর্মক্ষেত্রে এবং বাসায় যথাক্রমে ৪৩ শতাংশ এবং ৩৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ পরোক্ষভাবে ধূমপান করছে। এ ছাড়া ১৩ থেকে ১৫ বছর বয়সী কিশোর ৭ শতাংশই তামাকদ্রব্য ব্যবহার করে। সেই হিসাবে বাংলাদেশে মোট ৩ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ তামাকদ্রব্য ব্যবহার করে। এ কারণেই বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক ধূমপায়ী দেশের মধ্যে একটি। এই সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তামাকদ্রব্য ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিদ্যমান যে আইন রয়েছে, তার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতাও লক্ষ্য করা গেছে। যেমন ২০১৩ সালের আইনে ‘জনপরিসর’কে সংজ্ঞায়িত করা হলেও, ধূমপানের নির্দিষ্ট স্থানগুলোয় ধূমপান করার অনুমতি আছে। এই বিভিন্ন নির্ধারিত স্থানে ধূমপান করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া জনপরিসরে ধূমপানকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে লিখিতভাবে গ্রহণ করলেও, তার বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায় না। ১৯ থেকে ৩৮ শতাংশ সমুদ্রের বর্জ্য হলো সিগারেটের খোসা এবং প্যাকেট।  ২০৪০ সালে যে তামাকমুক্ত বাংলাদেশ করার ভিশন রয়েছে, তা কখনোই অর্জন হবে না, যদি প্রস্তাবিত আইনের সংশোধনটি দ্রুত পাস না হয় এবং তাকে যথাযথ উপায়ে কঠোরভাবে কার্যকর নিশ্চিত না করা হয়। 

স্থপতি ইকবাল হাবিব: সহসভাপতি, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন-বাপা

আরও পড়ুন

×