ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

বাড়ি ভাঙিতে বুলডোজার

অভিযুক্তরা কেন অধরা?

অভিযুক্তরা কেন অধরা?
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলায় মাধবখালী ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান এবং স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা কাজী মিজানুর রহমান লাভলুর বসতবাড়ি বুলডোজার দিয়া গুঁড়াইয়া দিবার ঘটনা পুনরায় প্রমাণ করিল– দেশে মবতন্ত্র এখনও চলমান। বিশেষত ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর স্বেচ্ছাচারিতা নিয়ন্ত্রণে যেন কেহ কোথাও নাই। রবিবার সমকাল জানাইয়াছে, পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শাহীন চৌধুরী এবং স্থানীয় বিএনপির নেতাকর্মী শুক্রবার রাত্রে লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের পর বাড়িটি বুলডোজার দিয়া গুঁড়াইয়া দেয়। উপরন্তু নিরাপত্তার অভাবে ভুক্তভোগীরা রবিবার অবধি মামলাও করিতে পারেন নাই। অন্যদিকে মির্জাগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এই ব্যাপারে ‘কেহ মামলার জন্য থানায় আসেন নাই’ মর্মে সমকালের নিকট দায়সারা বক্তব্য দিয়াছেন। অভিযোগ বা মামলা হইলে ‘তদন্তসাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা’ গ্রহণের বক্তব্য কেবল সন্ত্রাসীদিগকেই উৎসাহিত করিবে। অথচ সমকালে প্রকাশিত ভুক্তভোগী পরিবারের বক্তব্য, এহেন ন্যক্কারজনক আক্রমণের আশঙ্কা হইতে তাহারা পূর্বেই প্রশাসন ও বিএনপি নেতাদের সাহায্য কামনা করিয়াছিলেন। অর্থাৎ স্থানীয় প্রশাসন ও পুলিশের গোচরেই ঘটনাটি ঘটিয়াছে। তদুপরি ভাঙচুর প্রতিরোধে পদক্ষেপ দূরস্থান, ঘটনা ঘটিবার পরও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তৎপরতা দেখা যাইতেছে না। 

বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে অগ্রাধিকার প্রদানের অঙ্গীকার করিয়াছিল– দেশে আর মব সন্ত্রাস চলিবে না। পটুয়াখালীর ঘটনাটিই সরকারের সেই অঙ্গীকার ও ঘোষণাকে প্রথম প্রশ্নের মুখে ফেলিল, এমন নহে। তবুও স্মরণ করা যাইতে পারে, বিগত পুলিশ সপ্তাহ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বাহিনীটিকে সকল প্রকার দলীয় প্রভাব উপেক্ষা করিয়া আইনানুযায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত আলোচ্য ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর উক্ত নির্দেশের কোনো প্রতিফলন দেখা গেল না। 

বিএনপির নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে এহেন ফৌজদারি অপরাধে সংশ্লিষ্ট হইবার অভিযোগ ইহাই প্রথম নহে। ইহার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশের নিষ্ক্রিয় থাকিবার ঘটনাও নূতন নহে। গণঅভ্যুত্থানের অব্যবহিত পর হইতেই মাঠ পর্যায়ের বিএনপির নেতাকর্মী অনেকে প্রায় বিনা বাধায় এই প্রকার অপকর্ম চালাইয়া আসিতেছেন। নির্বাচনের পূর্বে বিএনপি এহেন কতিপয় ঘটনায় সাংগঠনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করিলেও ক্ষমতাসীন হইবার পর উহাও লক্ষ্য করা যাইতেছে না। কিন্তু এই অবস্থা চলিতে থাকিলে নাগরিকদের মধ্যে কেবল নিরাপত্তাহীনতাই বৃদ্ধি পাইবে না; সামগ্রিক পরিস্থিতিও নৈরাজ্যের দিকে ধাবিত হইতে পারে। অর্থনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ ইত্যাদির উপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়িতে পারে।

সমকালের প্রতিবেদনমতে, আলোচ্য বাড়ির জমির মালিকানা লইয়া বিরোধ রহিয়াছে বলিয়া বিবদমান পক্ষগুলি দাবি করিতেছে। সরকারি গণগ্রন্থাগার উক্ত জমির একাংশে মালিকানা দাবি করিয়া স্থানীয় জেলা প্রশাসনের নিকট প্রতিকার প্রত্যাশা করিয়াছে। সেই ক্ষেত্রে একমাত্র আইনি প্রক্রিয়াই বিষয়টি সুরাহা করিতে পারিত। এইখানে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের দূরতম কোনো ভূমিকা থাকিতে পারে না। অতএব মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র এক বিবৃতিতে উক্ত ঘটনাকে যথার্থই বেআইনি তৎপরতারূপে চিহ্নিত করিয়াছে। সংস্থাটি বলিয়াছে, আদালতের আদেশ বা যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ব্যতীত কাহারও বাড়িঘর ভাঙিয়া ফেলা, সম্পদ লুট করা কিংবা অগ্নিসংযোগ করা সম্পূর্ণ বেআইনি এবং আইনের শাসনের পরিপন্থি। সংস্থাটির এই বক্তব্যও যথার্থ– রাজনৈতিক পরিচয় বা মতাদর্শ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। 

পটুয়াখালীর এই ঘটনা কেবল আইনশৃঙ্খলার প্রশ্ন নহে; নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় ন্যায্যতা এবং সামাজিক স্থিতিশীলতারও বিষয়। ঘটনাটির নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত নিশ্চিত করিয়া দায়ীদের আইনের আওতায় আনয়নে সরকারের প্রতি আমরা আহ্বান জানাই। আমরা ইহাও প্রত্যাশা করি, ক্ষমতাসীন দল উহার নেতাকর্মীকে আইনানুগ আচরণে বাধ্য করিবে। সরকারও ইতোমধ্যে বহুবার ব্যক্ত প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পুলিশকে দলমত নির্বিশেষে সকল অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনসংগত পদক্ষেপ গ্রহণে বাধ্য করিবে।

আরও পড়ুন

×