ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

কীটনাশকে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি

নীতিনির্ধারকদের নিদ্রাভঙ্গ হউক

নীতিনির্ধারকদের নিদ্রাভঙ্গ হউক
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬ | ১০:৫৬

কীটনাশক ব্যবহারে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বিষয়ে শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। ১১ জেলায় চকিত জরিপ, যশোর জেলায় জরিপ ও সরেজমিন তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে রচিত উক্ত প্রতিবেদন বলিতেছে, ৮৪ শতাংশ নারী কৃষক কীটনাশকের কারণে কোনো না কোনো স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগিতেছেন।

জরিপে অংশগ্রহণকারী ১০৯ নারীর মধ্যে সর্বাধিক ২৮ জন ত্বকের প্রদাহ ও চুলকানির সমস্যা, ২৪ জন শ্বাসকষ্ট, ২৩ জন দৃষ্টিসমস্যা এবং ২০ জন উচ্চ রক্তচাপ মোকাবিলা করিতেছেন। কিডনির সমস্যায় ভুগিতেছেন একজন। একাধিক রোগে ভোগা নারী কৃষকের সংখ্যা ২৫। শুধু উহাই নহে, জরিপে সামাজিক চাপ বা সংস্কারসহ অনেক কারণে নারী কৃষকদের সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য প্রকাশ করিতে অনীহা এবং চিকিৎসা-বঞ্চনাও ধরা পড়িয়াছে। অসুস্থ হইলে তাহাদের ভরসা পল্লিচিকিৎসক এবং বাড়ির নিকটবর্তী ছোট্ট ঔষধালয়।

কীটনাশকের নিরাপদ ব্যবহার বিষয়ে নারীকে সচেতন করা বা প্রশিক্ষণের উদ্যোগও বেশ সীমিত। সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের নিয়ম অনুসারে, এই সংক্রান্ত প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে ৩০ শতাংশ নারী কৃষক রাখা বাধ্যতামূলক হইলেও সমকালের জরিপে অংশগ্রহণকারী নারীদের একজনও উক্ত প্রশিক্ষণ পান নাই। স্পষ্টত অন্যান্য ক্ষেত্রের ন্যায় কৃষিতে সংশ্লিষ্ট নারীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রশ্নেও নীতিনির্ধারকগণ গভীর নিদ্রামগ্ন। অথচ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) বাংলাদেশ শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুসারে, কৃষিতে যে ৪৫ শতাংশ জনবল নিয়োজিত, তাহার ২৬ শতাংশ নারী এবং ১৯ শতাংশ পুরুষ। 

নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিকভাবে জরিপটিকে প্রতিনিধিত্বশীল বলা যায় না। তবে ইহার  ফলাফল হইতে কীটনাশকে নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকির একটি প্রাথমিক ধারণা পাওয়া যায়– ইহা স্বীকার করিতে হইবে। তদুপরি প্রতিবেদনে যদ্রূপ বলা হইয়াছে, যশোরের সরেজমিন চিত্রের সহিত অবশিষ্ট ১১ জেলার জরিপের তথ্যগত সাদৃশ্য পাওয়া গিয়াছে। অতএব অধিকতর গবেষণার প্রয়োজন থাকিলেও কৃষিক্ষেত্রের নীতিনির্ধারকগণ ইচ্ছা করিলে উক্ত চকিত জরিপের ফলের ভিত্তিতেই বিশেষত কীটনাশকের ক্ষতিকর প্রভাব হইতে নারীস্বাস্থ্য সুরক্ষায় পদক্ষেপ লইতে পারেন।

মনে রাখিতে হইবে, কীটনাশক ছড়াইবার কাজে নারীর অংশগ্রহণ অদ্যাবধি ব্যাপক না হইলেও নিয়মিত ফসল আহরণ; ফুল ছোঁয়ানো (হাতের মাধ্যমে পরাগায়ন), কীটনাশক ও সারের পাত্র ধৌত করিতে হয়। সর্বোপরি গৃহাভ্যন্তরে কীটনাশকের বোতল বা প্যাকেট সাধারণত এমন স্থানে রাখা হয়, যেখানে বসিয়া নারীকে রন্ধন ও অন্যান্য গৃহস্থালি কর্ম সম্পাদন করিতে হয়। উক্ত স্থানের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা ব্যবস্থাপনায় তাহারাই দায়িত্বরত। ফলে বিষের সংস্পর্শে নারীদের আসিতেই হয়।

সার্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য কীটনাশকের অনিরাপদ ব্যবহার কী ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করিয়া থাকে, তাহা লইয়া আলোচনা বহু দশক ধরিয়াই চলমান। সেই সকল আলোচনার ভিত্তিতে আমরা অবগত, কীটনাশকের অনিরাপদ ব্যবহার তাৎক্ষণিক বিষক্রিয়া ছাড়াও দীর্ঘ মেয়াদে স্নায়ুতন্ত্র, ত্বকসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতির ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। কীটনাশক পরিমিত ব্যবহার না করিবার কারণে পরিবেশের জন্যও উহা মারাত্মক হুমকি হইয়া দাঁড়াইয়াছে, যাহার চূড়ান্ত কুপ্রভাব মানুষকেই পোহাইতে হয়।

যত্রতত্র এবং ইচ্ছামাফিক কীটনাশক ব্যবহারের কারণে আমাদের খাদ্যচক্রে কীটনাশকে ব্যবহৃত বিভিন্ন ক্ষতিকর রাসায়নিক কী প্রকারে ও কতটা জায়গা করিয়া লইয়াছে, তাহাও আমরা অবগত। এই সকল কিছুর ক্ষতিকর প্রভাব পুরুষ, তৎসহিত নারীকেও ভোগ করিতে হইতেছে। তবে দুর্ভাগ্যজনক, একটি পরিবারে অদ্যাবধি নারী ও পুরুষের চিকিৎসা সমান গুরুত্ব বহন করে না। আমাদের প্রত্যাশা, সরকার অবিলম্বে কীটনাশক বা বালাইনাশক ব্যবহারের নীতিমালা কঠোর করিবে। এই সংক্রান্ত নজরদারি নিশ্চিতকরণ এবং নারী কৃষকদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দিবে।

আরও পড়ুন

×