ঢাকা মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬

টানা বৃষ্টিতে নষ্ট ২২২ হেক্টর জমির সবজি

টানা বৃষ্টিতে নষ্ট ২২২ হেক্টর জমির সবজি
×

টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার জান্না গ্রামে জলাবদ্ধতায় নষ্ট হওয়া একটি সবজি ক্ষেত। গতকাল সোমবার তোলা সমকাল

 মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি  

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫২

| প্রিন্ট সংস্করণ

টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে মানিকগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মরিচ ও সবজি ক্ষেতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। এসব ক্ষেতের গাছ মরে যাচ্ছে। এতে উৎপাদন কমে যাওয়াতে পাইকারি ও খুচরা বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। কৃষি অধিদপ্তরের হিসাব মতে, ২২২ হেক্টর জমির সবজি ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে। টাকার অঙ্কে যা তিন কোটি টাকার ওপরে। 

মানিকগঞ্জ জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে অনেক জমিতে দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকায় মরিচগাছ পচে যাচ্ছে এবং গোড়া নরম হয়ে পেঁপে গাছ পড়ে যাচ্ছে। সবজি ক্ষেত পানিতে তলিয়ে যাওয়াতে গাছ মরে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কাঁচামরিচ, পেঁপে, বোনা আমন এবং বেগুন, লাউ, ধুন্দল, চিচিঙ্গা, লালশাক, মুলা শাক, চালকুমড়া ও পটোল ক্ষেতের। সব মিলিয়ে ২২২ হেক্টর জমির সবজি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় তিন কোটি ১৩ লাখ টাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করেছে কৃষি বিভাগ। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক শাজাহান সিরাজ গত রোববার জেলা সমন্বয় সভায় এসব তথ্য তুলে ধরেন।
জেলা কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলার সাতটি উপজেলায় চার হাজার ৫২১ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি, ৯০০ হেক্টর জমিতে পেঁপে, ২৩১ হেক্টরে রোপা আমনের বীজতলা এবং ৪৩০ হেক্টর জমিতে মরিচের আবাদ করা হয়েছে। টানা বৃষ্টিতে ১৪৪ হেক্টর জমির বিভিন্ন ধরনের সবজি, ৫৫ হেক্টর জমির পেঁপে ও ১৬ হেক্টর জমির রোপা আমনের বীজতলা পানিতে নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ৪৫ হেক্টর বেগুন, ৩৬ হেক্টর লাউ, ২৫ হেক্টর ধুন্দল, ৯ হেক্টর লালশাক, ৭ হেক্টর করলা, ৬ হেক্টর মুলা শাক, ৫ হেক্টর পুইশাক, ৫ হেক্টর পটোল, ৩ হেক্টর চালকুমড়া, ২ হেক্টর ঢ্যাঁড়শ এবং ১ হেক্টর জমির শসা ক্ষেত নষ্ট হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন চার হাজার ৮৮৫ জন কৃষক।
গত দুদিন জেলার বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অতিবৃষ্টিতে জমে থাকা পানির কারণে মরিচ ও সবজি গাছের গোড়া পচে যাচ্ছে, পাতাগুলো হলুদ হয়ে ঝরে পড়ছে। কোনো কোনো এলাকায় সবজি গাছ মরে মাচার ওপর নুয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

হরিরামপুর উপজেলা বাল্লা গ্রামের কৃষক জমির উদ্দিন বলেন, ৮৫ শতাংশ জমিতে মরিচের চাষ করেছিলাম। বৃষ্টির আগে মরিচের উৎপাদন ভালোই ছিল। ভেবেছিলাম পেঁয়াজ চাষে যেহেতু ক্ষতি হয়েছে, মরিচ চাষে ক্ষতিটা পুষিয়ে নেব। বাজারের মরিচের দামও ছিল ভালো। কিন্তু কয়েকদিনের বৃষ্টিতে ক্ষেতে পানি জমে গেছে। এখন গাছগুলো মরে যাচ্ছে। অপরিপক্ক মরিচ তুলতে হচ্ছে। আরেক কৃষক মনির হোসেন জানান, প্রথমে নিজের ৯০ শতাংশ ও অন্যের আরও ১২৭ শতাংশ জমিতে পেঁয়াজ চাষ করেছিলেন। কিন্তু পেঁয়াজ পরিপক্ব হওয়ার আগেই ওই সময়ের কয়েকদিনের টানা বৃষ্টিতে ক্ষেত তলিয়ে যায়। চার ভাগের এক ভাগ পেঁয়াজ তুলতে পারেননি। পরে ক্ষেত পরিষ্কার করে মরিচ চাষ করেন। এখন পানি জমে মরিচ গাছ মরে যাচ্ছে। 
সদর উপজেলার জাগির, সাটুরিয়ার জান্না এবং সিংগাইরের জয়মন্টপ ইউনিয়নে জেলার মধ্যে সবজি চাষ বেশি হয়। এসব অঞ্চলে সারা বছর সবজি চাষ হয়, যা জেলার চাহিদা মিটিয়ে ঢাকার একাংশের চাহিদা মেটায়। এসব অঞ্চলের ৬০ ভাগ জমির সবজি টানা বৃষ্টির কারণে নষ্ট হয়ে গেছে।

সদর উপজেলার জাগির ইউনিয়নের গারাকুল গ্রামের চাঁন মিয়া এবার ১৫০ শতাংশ জমিতে ধুন্দল ও কুমড়া চাষ করেছেন। জমি প্রস্তুত, বীজ রোপণ, কীটনাশক ও সার, মাচা তৈরিসহ সব মিলিয়ে ৬২ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়েছে। বৃষ্টির আগে তিনি মাত্র ২৭ হাজার টাকা সবজি বিক্রি করেছেন। এখন ক্ষেত পানিতে ডুবে গিয়ে গাছগুলো মরে যাচ্ছে।
সাটুরিয়ার জান্না গ্রামের গফ্‌ফার মিয়া জানান, ৪০ শতক জমিতে লালশাক ও ১৫ শতাংশ জমিতে মুলা শাক চাষ করেছেন। কিন্তু টানা বৃষ্টিতে সব নষ্ট হয়ে গেছে। সিংগাইরের জয়মন্টপ গ্রামের আজাহার হোসেন বলেন, নিজের ৫২ শতাংশ ও অন্যের ৮৬ শতাংশ জমিতে পেঁপে চাষ করেছেন। প্রচুর পেঁপে ধরেছে। কিন্তু বৃষ্টির কারণে মাটি নরম হয়ে প্রায় ৪০ ভাগ গাছ মাটিতে পড়ে গেছে। 
বাজারে বেড়েছে সবজির দাম

 জেলা শহরের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে এক সপ্তাহের ব্যবধানে সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে গড়ে ৪ গুণ বেড়েছে। বৃষ্টির আগে খুচরা বাজারে প্রতিকেজি মরিচ বিক্রি হতো ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে। এখন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা থেকে ২০০ টাকায়। ধুন্দল ও চিচিঙ্গা বিক্রি হতো ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকায়, এখন বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকা থেকে ৭০ টাকায়। ৩০ থেকে ৪০ টাকার বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়। ২০ টাকার ঢ্যাঁড়সের দাম উঠেছে ৮০ টাকায়। লাউ বিক্রি হতো ৩০ থেকে ৪০ টাকায়, এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ টাকা থেকে ১২০ টাকায়। ২০-৩০ টাকার কুমড়া বিক্রি হচ্ছে ৬০-৭০ টাকায়। লাউ শাক বিক্রি হতো ২০ টাকায়, এখন কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা দিয়ে। মিষ্টি লাউ বিক্রি বিক্রি হচ্ছে ২০ টাকা বেড়ে ৫০ টাকা কেজি দরে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, মাঠে ফসল নষ্ট হওয়ায় পাইকারি বাজারে সরবরাহ কমেছে এবং এ কারণেই এই মূল্যবৃদ্ধি। 

আরও পড়ুন

×