অস্বাভাবিক বরাদ্দ, প্রকল্পে অনিয়ম প্রশ্নের মুখে কোষাগারে টাকা ফেরত
নবীগঞ্জের শেরখাই নদীর তীরে প্রকল্পের কথা বলা হলেও সরেজমিন তার কোনো অস্তিত্ব নজরে আসেনি। শনিবার তোলা সমকাল
নবীগঞ্জ (হবিগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
নবীগঞ্জে গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ (ত্রাণ ও পুনর্বাসন) কর্মসূচির আওতায় টিআর, কাবিখা ও কাবিটা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। কাজ না করেই বিল উত্তোলন, ভুয়া প্রকল্প তৈরি এবং একই প্রকল্পে তিনবারসহ অস্বাভাবিক অর্থ বরাদ্দের ঘটনায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে।
এ-সংক্রান্ত কয়েকটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর টনক নড়েছে প্রশাসনের। ইতোমধ্যে একটি প্রকল্পের টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে এবং অন্যান্য অভিযোগ খতিয়ে দেখতে তদন্ত শুরু করেছে উপজেলা প্রশাসন।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সংসদ সদস্য (হবিগঞ্জ-১ আসন) ড. রেজা কিবরিয়ার অনুকূলে বরাদ্দকৃত টিআর ও কাবিটা প্রকল্পের অর্থ নয়ছয়ের পেছনে মূল অভিযোগ উঠেছে তাঁর চাচা শাহ আজাদ আলী সুমনের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আউশকান্দি ইউনিয়নের উলুকান্দি সড়কে সাবেক মেম্বার বরকত উল্লাহর বাড়ির পাশে ৩ ফুট প্রস্থ ও ১৫ ফুট দৈর্ঘ্যের একটি ছোট কালভার্ট নির্মাণে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ৮ নম্বর ওয়ার্ডে প্রকল্পটির অবস্থান হলেও স্থানীয় কাউকে কমিটিতে না রেখে বেতাপুর গ্রামের শাহ আব্দুর রাজ্জাককে সভাপতি করা হয়। স্থানীয় মেম্বার সিজিল আহমদ সেজলু এবং আউশকান্দি ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শিহাব আহমদ অভিযোগ করেন, এই কাজে বড়জোড় ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। তাঁরা এ বিষয়ে কিছুই জানেন না। সংসদ সদস্যের চাচার ইশারাতেই এটি হয়েছে বলে তাদের অভিযোগ।
সবচেয়ে বড় অনিয়মের চিত্র দেখা গেছে দীঘলবাক ইউনিয়নে। মসিবপুর ফজলু মিয়ার বাড়ি থেকে নুরগাঁও জামাল মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কার দেখিয়ে জনৈক এমদাদুল হককে সভাপতি করে ৩ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। কিন্তু সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাস্তবে সেখানে কোনো সড়কই নেই; শেরখাই নদীর একটি বাঁধকে সড়ক দেখিয়ে পুরো বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প সভাপতি এমদাদুল হক নিজের অজ্ঞতা প্রকাশ করেন। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউনিয়ন বিএনপি নেতা ছালিক মিয়া এবং ইউপি সদস্য খালেদ হাসান দোলন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ইউনিয়ন পরিষদকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে এই ভুয়া প্রকল্প দেখিয়ে সরকারি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
এছাড়া, আউশকান্দি ইউনিয়নের আমুকোনা জামে মসজিদের সড়ক সংস্কারের নামে একই প্রকল্পে তিন দফায় ১২ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়েছে। সংসদ সদস্যের চাচা শাহ আজাদ আলী সুমনের বাড়ির সামনের এই প্রকল্পে তাঁর ঘনিষ্ঠজন লায়েক চৌধুরীকে সভাপতি করা হয়েছে। তবে আজাদ আলী সুমন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমি নিজে কোনো প্রকল্পের সভাপতি নই। তবে কাজ চলমান রয়েছে। কিছু প্রকল্পের টাকা ইতিমধ্যে ফেরত দেওয়া হয়েছে।’
পাশাপাশি সংসদ সদস্যের নিজ ইউনিয়ন দেবপাড়ার জালালসাপ গ্রামে হযরত শাহ শাবুদ (র.) মাজার সড়কের একটি কাজে ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ উঠেছে। ৩০০ ফুট রাস্তা করার কথা থাকলেও পুরাতন ইট ব্যবহার করে মাত্র ২০০ ফুট কাজ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
নবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের সহকারী হাবিবুর রহমান জানান, অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় কালভার্ট প্রকল্পের অর্ধেক টাকা (এক লাখ) ১৯ জুলাই সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে। দীঘলবাকের ভুয়া প্রকল্পের টাকাও ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
নবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) রাশেদুর রহমান বলেন, এমপি মহোদয়ের প্রস্তাবে এই প্রকল্পগুলো করা হয়েছিল। শাহ আজাদ আলী সুমনের অনুরোধে তারা কোনো কাজ না দেখিয়ে বিল দিয়েছিলেন। এখন অভিযোগ আসায় বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং প্রকল্পগুলো সরেজমিনে পরিদর্শন করা হবে।
নবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমীন বলেন, পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে আমলে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে কিছু টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত এসেছে। বাকি প্রকল্পগুলোর বিষয়ে সরেজমিনে তদন্ত করে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
- বিষয় :
- প্রকল্প