ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

উগ্রবাদ মোকাবিলা

ফলেন পরিচয়তে

ফলেন পরিচয়তে
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬ | ০৮:৩৬

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশে চরমপন্থা বা উগ্রবাদকে প্রশ্রয় না দিবার প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় অবস্থানের ঘোষণা নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের সমাপনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী আরও উল্লেখ করিয়াছেন, সরকারি ও বিরোধী দল কোনো কোনো বিষয়ে দ্বিমত থাকিলেও উগ্রবাদ ও চরমপন্থা প্রশ্নে বিরোধী দলের সম্পূর্ণ সহযোগিতা পাইবেন বলিয়া বিশ্বাস করেন। যেই দেশের রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব ও বিরোধ ব্যাপকভাবে বিরাজমান এবং জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও রাজনৈতিক ঐক্য অনুপস্থিত, সেইখানে প্রধানমন্ত্রীর এইরূপ বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। কেবল স্মরণে রাখিতে হইবে, উগ্রবাদ মোকাবিলার প্রশ্নটি কেবল কথায় মীমাংসা হইবে না।

স্মরণে রাখিতে হইবে, অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বাংলাদেশের শক্তি হইলেও এই দেশে উদীচীর অনুষ্ঠানে যশোরে ১৯৯৯ সালে এবং নেত্রকোনায় ২০০৫ সালে বোমা হামলার ঘটনা ঘটিয়াছিল। রাজশাহীর বাগমারা ও নওগাঁ এলাকায় ‘চরমপন্থি দমন’ করিবার নামে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন জেএমবি নেতা ‘বাংলা ভাই’ স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্বের একাংশের মদদে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করিতে পারিয়াছিলেন। ২০০১ সালে রমনার বটমূলে বোমা হামলার ভয়াবহ স্মৃতি এখনও প্রতিটি পহেলা বৈশাখে ফিরিয়া আসে। নির্মল সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হইয়াও পাশের অপরিচিতজনকে সন্দেহ করিতে হয়। মানুষের কাছে মানুষের অনিরাপদ বোধ করিবার, সন্দেহ করিবার এই বিষ অন্তরে প্রবেশ করাইয়া দিতে সফল হইয়াছে চরমপন্থিরা। ২০১৬ সালের পহেলা জুলাই রাজধানীর ‘হলি আর্টিসান’ হামলা দেশের বাহিরে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কেও শঙ্কিত করিয়া তুলিয়াছিল। হামলার দায় স্বীকার করিয়া বিবৃতি দিয়াছিল আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট-আইএস।
স্বীকার্য, দেশে উগ্রবাদের চর্চা কোনো না কোনো প্রকারে সকল সময়েই ঘটিয়া আসিতেছে। ইহাও অনস্বীকার্য, উগ্রবাদ কেবল ধর্মীয় পরিচয়ে নহে, রাজনৈতিক মতাদর্শেও রহিয়াছে। সামাজিক মাধ্যমসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তৃতির সহিত উহাতে ভিন্ন মাত্রা ও গতি যুক্ত হইয়াছে। বস্তুত উগ্রবাদ প্রচারের সর্বাধিক সহজ মাধ্যম হইয়াছে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। সামাজিক মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য, ধর্মের অপব্যাখ্যা, বিদ্বেষমূলক প্রচারণা এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্বের দ্রুত সম্প্রসারণ ঘটিতেছে। এই সকলের মধ্য দিয়া তরুণদের একটি অংশকে চরমপন্থার দিকে আকৃষ্টকরণের চেষ্টা অব্যাহত। ফলে উগ্রবাদ মোকাবিলার কৌশলও পূর্বাপেক্ষা বহুমাত্রিক হওয়া প্রয়োজন। শুধু অভিযান চালাইয়া অথবা গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এই কঠিন সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নহে। এই ক্ষেত্রে সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর পদক্ষেপ এবং বিরোধী রাজনৈতিক অংশীদারদের সহযোগিতার বিকল্পও নাই।

আমরা জানি, অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ গ্রহণ করিতে সকল সময়েই স্বার্থান্বেষী মহল প্রস্তুত থাকে। ফলে উগ্রবাদ দমনের নামে রাষ্ট্রের নাগরিককে যেন অহেতুক হেনস্তা না হইতে হয়, তাহাও নিশ্চিত করিতে হইবে। সামাজিক প্রতিরোধ, রাজনৈতিক পরিবেশ সহনশীল রাখার দিকে নজর দিতে হইবে। রাজনৈতিক ভাষণে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, প্রতিপক্ষকে অমানবিকভাবে উপস্থাপন কিংবা ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার– এই সকল প্রবণতা উগ্রপন্থার জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈয়ার করিয়া থাকে। তাই উগ্রবাদ দমনের অঙ্গীকার এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিবাচক পরিবর্তনও গুরুত্বপূর্ণ। 
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আমরা আশ্বস্ত হইতে চাহি। তবে এই কথাও উল্লেখ করিয়া রাখা প্রয়োজন; সেই আশ্বাসের প্রকৃত মূল্য হইবে যখন ইহা শুধু কথার কথা হইবে না; কার্যের মধ্য দিয়াই প্রমাণ হইবে। বৃক্ষের পরিচয় আমরা ফলের মধ্য দিয়াই পাইতে চাহি।

আরও পড়ুন

×