ঢাকা শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

বন্যা ও পাহাড়ধস

পূর্বাভাস সত্ত্বেও অমার্জনীয় প্রস্তুতিহীনতা

পূর্বাভাস সত্ত্বেও অমার্জনীয় প্রস্তুতিহীনতা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬ | ০৭:১৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চল ও উত্তরের বিভিন্ন জেলায় ভারী বৃষ্টি, বন্যা ও পাহাড়ধসের কারণে জনজীবনে যেই দুর্ভোগ নামিয়া আসিয়াছে, তাহা অবর্ণনীয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের ৫৯ উপজেলা, ৩৩৪ ইউনিয়ন ও ১২ পৌর এলাকা প্লাবিত হইয়া পানিবন্দি রহিয়াছে দেড় লক্ষাধিক পরিবার। ইহার ফলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ইতোমধ্যে ছয় লক্ষ অতিক্রম করিয়াছে। অধিকতর দুঃখজনক বিষয়, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে শুধু দুর্গতরা বিপুল সম্পদই হারান নাই; ৫৪ জনের প্রাণও গিয়াছে। এই প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি এমন সময়ে ঘটিয়াছে যখন বিগত কয়েক দশক যাবৎ বাংলাদেশ বিশেষত বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের ন্যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় অন্যতম সফল রাষ্ট্রের স্বীকৃতি পাইয়াছে। 

উদ্বেগের বিষয়, মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১ জুলাই হইতে আবহাওয়া অধিদপ্তর ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পক্ষ হইতে আলোচ্য দুর্যোগ সম্পর্কিত সতর্কবার্তা জারি হইতেছিল। এমনকি এল নিনোর প্রভাবে বড় বন্যা হইতে পারে– এমন শঙ্কার কথাও সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলির অজানা নহে। তথাপি সেই সকল পূর্বাভাস অনুযায়ী মাঠ পর্যায়ে ত্রাণসামগ্রী মজুত, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরাইয়া লওয়া, উদ্ধার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা, চিকিৎসা দল সক্রিয় করা কিংবা স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত প্রস্তুতি– কোনোটিই প্রয়োজনীয় মাত্রায় গৃহীত হয় নাই। ফলে টানা অতিবৃষ্টি, উজান হইতে নামিয়া আসা ঢল ও পাহাড়ধস কয়েক দিনের মধ্যেই মানবিক বিপর্যয়ে রূপ গ্রহণ করে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য বিশ্লেষণেও দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির ঘাটতি স্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, বন্যার প্রাদুর্ভাব ঘটে ৫ জুলাই। সেই দিনই পাহাড়ধসে ১০ জনের মৃত্যু হয়। কিন্তু সাত জেলার জন্য প্রথম দফায় ত্রাণ বরাদ্দ দেওয়া হয় সাত দিন পরে– ১২ জুলাই। উপরন্তু প্রথম ধাপে বরাদ্দ এক কোটি ৭৫ লক্ষ টাকা এবং তিন সহস্র টনের সামান্যাধিক চাউল, যাহা চাহিদার তুলনায় নেহাত অপ্রতুল। দ্বিতীয় দফায় দেশের অন্য ৫৭ জেলার জন্য অতিরিক্ত যেই দুই কোটি ৮৫ লক্ষ টাকা ও পাঁচ সহস্র ৭০০ টন চাউল বরাদ্দ হইয়াছে, উহাও সমুদ্রে বিন্দুবৎ মাত্র। বিশ্লেষকগণ যথার্থই বলিয়াছেন, এইবারের বন্যা কেবল প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নহে; বরং পূর্বপ্রস্তুতির ঘাটতি, সমন্বয়ের দুর্বলতা, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরাইয়া লইবার ব্যর্থতা এবং উদ্ধার কার্যক্রমে বিলম্বের পরিণাম। 

সন্দেহ নাই, দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল-নালা দখল এবং দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামিতে পারে নাই। অতীতে জলাবদ্ধতা নিরসনে বড় প্রকল্প বাস্তবায়িত হইলেও সমন্বিত পরিকল্পনা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা ও কৃত্রিম বন্যার সৃষ্টি হইয়াছে। দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ না হওয়ায় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রমে চাপ সৃষ্টি হইয়াছে, ইহাও অনস্বীকার্য। তবে পূর্বাভাস পাইবার অব্যাবহিত পরে সংশ্লিষ্টগণ তৎপর হইলে অন্তত ক্ষয়ক্ষতি হ্রাস করা যাইত। এই ক্ষেত্রে সরকারের উচ্চমহলও দায় উপেক্ষা করিতে পারে না। তাহাদের পক্ষ হইতে যথাযথ তাগাদা ও তদারকি থাকিলে মাঠ প্রশাসনের পক্ষে দুর্যোগপীড়িত মানুষদের প্রতি উক্ত সংবেদনহীনতার প্রদর্শন সম্ভবপর হইত না।
আমাদের প্রত্যাশা, দুর্গত এলাকাসমূহে অনতিবিলম্বে পর্যাপ্ত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সরকার উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নূতন বন্যার পূর্বাভাসকেও মান্যতা দিবে। বিশেষত জলবায়ু পরিবর্তনজনিত আকস্মিক দুর্যোগের শঙ্কা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে স্থায়ী কার্যকর প্রস্তুতির বিষয়টি জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।
 

আরও পড়ুন

×