জরুরি প্রকল্পের নামে লুটপাটে পুরোনো সিন্ডিকেট
রৌমারী উপজেলার খেদাইমারী এলাকায় ব্রহ্মপুত্রের তীরে ভাঙনরোধে রাখা সারি সারি জিওব্যাগ সমকাল
জিতেন চন্দ্র দাস, রৌমারী (কুড়িগ্রাম)
প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২৬ | ০৭:৫৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
কুড়িগ্রামের রৌমারী, রাজীবপুর ও উলিপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের বাম তীরে বছরজুড়েই চলে নদীভাঙন। এই ভাঙন রোধের নামে প্রতিবছর ‘জরুরি প্রকল্প’ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পুরোনো সিন্ডিকেটটি আবারও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের আমলেও এই চক্রটি তাদের অপতৎপরতা বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে বলে স্থানীয় ভুক্তভোগী ও নদী আন্দোলন কর্মীরা অভিযোগ তুলেছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, বর্তমানে রৌমারী উপজেলার সুখেরবাতি, সোনাপুর ও খেদাইমারী এলাকায় ‘জরুরি প্যাকেজ’-এর আওতায় নদীশাসন ও প্রতিরক্ষামূলক কাজ শুরু হয়েছে। এই প্রকল্পের অধীনে ২৫০ কেজি ওজনের ৬ হাজারেরও বেশি বালুভর্তি জিওব্যাগ ফেলার কাজ চলছে, যার প্রতিটি কাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ৪১ হাজার টাকা। এতে দুটি প্যাকেজে প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ৫৬ লাখ ৮২ হাজার টাকা।
নথিপত্র অনুযায়ী এই কাজের মূল ঠিকাদার হিসেবে মো. রশিদ (সোনাপুর এলাকায়) ও মো. রবিউল (সুখেরবাতি এলাকায়) নামে দুজনের নাম থাকলেও বাস্তবে তারা কখনও সাইট পরিদর্শনে আসেন না। অভিযোগ রয়েছে, পঞ্চগড়ের রবিউল হলেন নির্বাহী প্রকৌশলীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও পছন্দের ঠিকাদার। ওই প্রকৌশলী দিনাজপুরে কর্মরত থাকাকালীন তাদের মধ্যে যে সখ্য গড়ে ওঠে, তা তিনি কুড়িগ্রামে বদলি হয়ে আসার পরও বহাল রেখেছেন।
স্থানীয়দের দাবি, এই মূল ঠিকাদাররা মূলত নামমাত্র। প্রকৃতপক্ষে নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের অভ্যন্তরীণ ভাগাভাগির অংশীদার ও বিশ্বস্ত সাব-ঠিকাদার আবু সাঈদের মাধ্যমেই সব কাজ করানো হচ্ছে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন সংসদ সদস্য বিপ্লব হাসান পলাশের সুপারিশে ওই নির্বাহী প্রকৌশলী কুড়িগ্রামে আসেন এবং এই সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও এই মেকানিজমে কোনো পরিবর্তন আসেনি; বরং প্রভাবশালী এই সিন্ডিকেট রাতারাতি খোলস বদলে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও সাব-ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণ করছেন।
অনিয়ম নিয়ে কথা বলতে যোগাযোগ করা হয় ঠিকাদার মো. রশিদ ও মো. রবিউলের সঙ্গে। তারা বলছেন, ‘নিয়ম মেনেই আমরা টেন্ডার পেয়েছি এবং কাজ করছি। সাইটে না যাওয়ার অভিযোগ সত্য নয়, আমাদের প্রতিনিধিরা সেখানে সার্বক্ষণিক উপস্থিত আছেন। কোনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে আমাদের সম্পৃক্ততা নেই।’
পুরোনো দুর্নীতির ফাইল ও ধামাচাপা পড়া তদন্ত
গত বছরও ব্রহ্মপুত্রের বাম তীরে হবিগঞ্জ বাজার থেকে কোদালকাটি পর্যন্ত জরুরি কাজের নামে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নৌকা দিয়ে ডাম্পিং করার নিয়ম থাকলেও প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যাগই সঠিকভাবে ফেলা হয়নি। এ নিয়ে এলাকাবাসীর পক্ষে রহিজ মাস্টার পাউবোর মহাপরিচালক বরাবর লিখিত অভিযোগ দিলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমানকে তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। রহস্যজনক কারণে তদন্ত কর্মকর্তা নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের পক্ষেই সাফাই গান। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টার কাছে এলাকাবাসী মৌখিক অভিযোগ দিলে ঠিকাদার পুনরায় কাজ করতে
বাধ্য হন, যা দুর্নীতির প্রাথমিক প্রমাণ হিসেবে
গণ্য হলেও আজ পর্যন্ত ওই নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোনো প্রকার শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ ছাড়া পাউবোর ডিজি (অ্যাডমিন) মিজানুর রহমান আরেকটি তদন্ত করলে সেটিও রহস্যজনকভাবে ধামাচাপা পড়ে যায়।
তদন্তে এসে অভিযুক্ত নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের পক্ষে সাফাই গাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর পাউবো সার্কেলের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমি ওই এলাকায় অন্য কাজে গিয়েছিলাম। তা ছাড়া এখন আমি আর ওই অঞ্চলের দায়িত্বে নেই।’ বর্তমানে ওই অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা রংপুর পাউবো সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিবের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়ে তিনি ফোনকলটি কেটে দেন।
এদিকে সোনাপুর এলাকার কাজও আবু সাঈদকে দিয়ে করানোর প্রক্রিয়া চলছিল, তবে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর বাধার মুখে তা সাময়িকভাবে স্থগিত রয়েছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে সম্প্রতি চরগেন্দার আলগার বাসিন্দারা নদীভাঙন রোধের দাবি নিয়ে গেলে নির্বাহী প্রকৌশলী তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং স্থানীয় সংসদ সদস্যকে দিয়ে কাজ করিয়ে নেওয়ার কথা বলে ফিরিয়ে দেন। একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণে পুরো এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
এ বিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর উপজেলা শাখার শহীদ আবু সাঈদ ইউনিটের সভাপতি মাহবুব আলম বলেন, অনিয়মের বিষয়ে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসানের কাছে সরাসরি অভিযোগ ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। অনিয়মের বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে মাহবুব আলম আরও বলেন, নিয়ম অনুযায়ী সঠিক পরিমাপে জিওব্যাগ ভর্তি করা হয়নি। এ ছাড়া নৌকা
দিয়ে ডাম্পিং করার কথা থাকলেও তা না করে ওপর থেকে ফেলা হয়েছে। এমনকি নির্ধারিত ছয় হাজার জিওব্যাগের জায়গায় মাত্র তিন হাজার ব্যাগ ফেলেই কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান ও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের যোগসাজশে সম্পূর্ণ বিল উত্তোলন করে নেওয়া হয়েছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের গত ১০ বছরের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ব্রহ্মপুত্রের বাম তীর স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের চেয়ে অস্থায়ী ও নামমাত্র ‘জরুরি তহবিল’-এর কাজের দিকেই কর্মকর্তাদের আগ্রহ বেশি। প্রতিবছর বন্যার পর রৌমারীর বন্দবেড়, ঘুঘুমারী, ফলুয়ারচর, চরশৌলমারী ও রাজীবপুরের কোদালকাটি এলাকায় আপৎকালীন তহবিলের কোটি কোটি টাকার জিওব্যাগ ফেলা হয়। নিয়ম না মেনে ফেলায় স্রোতে ভেসে যায়। ২০২৪ সালের মে থেকে জুলাই মাসেও ফলুয়ারচর ও যাদুরচর ঘাট রক্ষা প্রকল্পে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যার কাজ করেছিলেন স্থানীয় সাব-ঠিকাদার বিল্লাল হোসেন ও তাঁর গ্রুপ। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এ ছাড়াও ঘুঘুমারী থেকে ফলুয়ারচর নৌকাঘাট পর্যন্ত ৫ হাজার মিটার স্থায়ী তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের কাজ শুরু হলেও ৯টি প্যাকেজের গতি ছিল অত্যন্ত ধীর।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, ‘আমরা সম্পূর্ণ বিধি ও নিয়ম মেনেই কাজ করছি। এখানে পরিচিত আর অপরিচিতের কোনো সম্পৃক্ততা নেই। নির্ধারিত ঠিকাদাররাই কাজ করছেন। তারা বিধি অনুযায়ী কাজ না করলে বিল পাবেন না। এ ছাড়াও স্থানীয় প্রতিনিধি, রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও পাউবোর দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কাজের তদারকি করছেন। ফলে কাজে সামান্যতম অনিয়মের কোনো সুযোগ নেই।’
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রংপুর পাউবো সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিবের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
- বিষয় :
- লুটপাট