ঢাকা রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

খুলনার তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসীরা

উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ কাম্য

উপযুক্ত আইনি পদক্ষেপ কাম্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ১৯ জুলাই ২০২৬ | ০৭:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনায় পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী অনেকে গ্রেপ্তার হইলেও ইতোমধ্যে জামিনে বাহির হইয়া নূতন অপরাধে সংশ্লিষ্ট বলিয়া শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। এই সন্ত্রাসী প্রত্যেকের বিরুদ্ধে হত্যা, ডাকাতি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধে তিনটি হইতে ১৪টি পর্যন্ত মামলা নথিবদ্ধ; যাহাদের গ্রেপ্তার করিতে পুলিশকে অনেক কাষ্ঠ-তৃণ পোড়াইতে হইয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই উহাদের জামিনে মুক্তিপ্রাপ্তির বিষয়টি একদিকে মামলার বাদী ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের জন্য আতঙ্কস্বরূপ, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের মনোবলেও আঘাত করে। তদুপরি নূতন হত্যা, চাঁদাবাজির ঘটনায় উক্ত অপরাধীদের নাম যুক্ত হওয়ায় সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণও কঠিন হইয়া পড়িয়াছে। মনে রাখিতে হইবে, শুধু তালিকাভুক্ত অপরাধীরাই নহে; পুলিশের তালিকাবহির্ভূত জামিনে মুক্তিপ্রাপ্ত কিশোর ও উঠতি সন্ত্রাসীর সংখ্যাও এই উদ্বেগের অগ্নিতে ঘৃত ঢালিতেছে। 

বস্তুত প্রতিবেদনে শুধু খুলনার চিত্র তুলিয়া ধরা হইলেও দেশের অন্য অনেক জেলাও এহেন পরিস্থিতি হইতে মুক্ত নহে। এই কারণেই বিশেষত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খুন, ধর্ষণ, চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইসহ বিবিধ অপরাধের যেই বাড়বাড়ন্ত অবস্থা ছিল, তাহা নির্বাচিত সরকার ক্ষমতাসীন হইবার চার মাস অতিবাহিত হইবার পরও বদলায় নাই। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কতটা নাজুক, তাহা তুলিয়া ধরিতেছে।

এইচআরএসএসের প্রতিবেদন অনুসারে, এই বৎসরের প্রথম ছয় মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ৫৬ জন নিহত হইয়াছেন, যেইখানে ৮১ শতাংশই বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল বা বিএনপির সঙ্গে অন্যান্য দলের সংঘর্ষকে কেন্দ্র করিয়া ঘটিয়াছে। টিআইবির প্রতিবেদন অনুসারে, সরকারের ১০০ দিনে ৬০৫টি খুন, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং নারী-শিশু নির্যাতনের তিন সহস্র ৪৯৬টি অঘটন ঘটিয়াছে। এমনকি এই সময়ে পুলিশের উপর হামলার ঘটনা ঘটিয়াছে ১২৯টি। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজি, অস্ত্রবাজি, খুনসহ বেপরোয়া অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সকলেই অবগত। গত ১৩ জুলাই সোমবার চাঁদাপ্রাপ্তিতে ব্যর্থ হইয়া চট্টগ্রাম মহানগরে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাসীদের ভাঙচুর ও লুটপাটের দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে প্লাবিত হইয়াছিল। জুন মাসে ঢাকার মোহাম্মদপুরে চাঁদার দাবিতে একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ঢুকিয়া সন্ত্রাসীরা হামলা, কর্মীদের প্রহার ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায়। বরিশাল ও নরসিংদীতে পৃথক নজিরবিহীন ঘটনায় ব্যবসায়ীর স্পর্শকাতর অঙ্গে চাপ দিয়া অর্থ হস্তগত এবং কান কামড়াইয়া আহত করার দৃশ্যও দেখা গিয়াছে। দুর্ভাগ্যবশত, এই সকল অঘটনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীর নাম সংযুক্ত হওয়া প্রমাণ করে– অতীতের দুর্বৃত্তায়িত রাজনীতি হইতে দেশ অদ্যাবধি মুক্ত হয় নাই, যদিও বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণকালে ইহার অবসান ঘটাইবার অঙ্গীকার করিয়াছিল।

অস্বীকার করা যাইবে না, এহেন নিরাপত্তাহীনতা শুধু সাধারণ জনগণের মধ্যেই আতঙ্ক জাগায় না; ব্যবসায়ী সম্প্রদায়েরও মধ্যে অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দেয়। এহেন অবস্থা অর্থনীতি পুনরুদ্ধারকে যদ্রূপ দুরূহ, তদ্রূপ ব্যবসা ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনাস্থার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণও অসম্ভব হইয়া দাঁড়ায়। অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় অঞ্চলভিত্তিক আধিপত্য বিস্তারের লড়াইয়ে ক্ষমতাসীন দলের অনেক নেতার বিরুদ্ধে বিভিন্ন শীর্ষ সন্ত্রাসীকে প্রশ্রয় দিবার অভিযোগ ছিল। বর্তমানে অপরাধীদের প্রতি রাজনৈতিক ছত্রছায়া প্রদান বন্ধ হইয়াছে– এমন দাবি করা যায় না, যদিও আইনশৃঙ্খলার উন্নতি এই সরকারের অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত বলিয়া পুলিশকে খোদ প্রধানমন্ত্রী দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠিয়া দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়াছিলেন। 
নিঃসন্দেহে জামিনপ্রাপ্তি সকলের অধিকার। তবে সেই অধিকার অনুমোদন করিতে গিয়া সমগ্র সমাজকে ঝুঁকিতে ফেলিবার কোনো অবকাশ থাকিতে পারে না। জামিনের ক্ষেত্রে আইনের রন্ধ্র সন্ধান করা হয় কিনা, তাহাও অনুসন্ধেয়। সর্বোপরি অপরাধীদের ট্র্যাক রেকর্ডও বিচার্য বলিয়া আমরা মনে করি।

আরও পড়ুন

×