ফিলিস্তিন
সন্ত্রাসী কে– যে নিজ ভূমি রক্ষা করে, না যে শিশু হত্যা করে
ইহসান আকতাস
প্রকাশ: ২৯ অক্টোবর ২০২৩ | ১৮:০০ | আপডেট: ৩০ অক্টোবর ২০২৩ | ০৩:৩৭
ইসরায়েলের দখলদারিত্বে ফিলিস্তিনের দীর্ঘমেয়াদি দুর্দশা আবারও মানবতার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ইসরায়েল নির্বিচারে নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিকদের ওপর ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা হামলা করছে, আর ফিলিস্তিনিরা প্রাণ হারাচ্ছে। ইসরায়েল বলতে চায়– ‘আমরা ধীরে ধীরে তোমাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলব; সেটি গাজা হোক কিংবা পশ্চিম তীর। আমরা প্রত্যাশা করি, তোমরা নীরব থাকবে।’
বলার অপেক্ষা রাখে না, পশ্চিমা দেশগুলো ইহুদিদের কাছে ঋণী। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়েপ এরদোয়ান সম্প্রতি তাঁর এক বক্তব্যেও বিষয়টা জোর দিয়ে উল্লেখ করেছেন। প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের এমন কথা বলার অর্থ স্পষ্ট করার জন্য কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা দরকার। ইতিহাসের পুরো সময়ে আমরা দেখেছি, ইহুদিরা সাধারণত খ্রিষ্টানপ্রধান দেশগুলোতেই বসবাস করত। কিন্তু সেখানে তারা বৈষম্য ও নানা সমস্যায় পড়ে। খ্রিষ্টানরা ইহুদিদেরকে নৈতিক অবক্ষয়, সংক্রমণ এবং বিভিন্ন সংকটের মূল কারণ মনে করত। প্রায় ৫০০ বছর আগে ইহুদিরা যখন বহিষ্কার হয়, তখন ওসমানিয়া সাম্রাজ্য তাদের আশ্রয় দেয় এবং নিজেদের ভূমিতে বসবাসের অনুমতি দেয়। তাদের সঙ্গে মুসলমানরা ন্যায়সংগত ও সহানুভূতিমূলক আচরণ করেছিল। এর সম্পূর্ণ বিপরীতে ইহুদিরা অ্যাডল্ফ হিটলারের নেতৃত্বে খ্রিষ্টানদের দ্বারা অত্যাচার, নিপীড়ন ও গণহত্যার শিকার হয়েছিল। পশ্চিমা দেশগুলোর ইহুদিদের ব্যাপারে বিশেষ ভীতি আছে। এক ধরনের অপরাধবোধ থেকেই তারা জায়নবাদের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে না।
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় তিন সপ্তাহ ধরে ইসরায়েল ধ্বংসযজ্ঞ চালাচ্ছে। তাদের বোমা হামলা থেকে হাসপাতাল, বাড়িঘর, বেসামরিক মানুষের আবাসস্থল– কিছুই রেহাই পাচ্ছে না। এর ফলে নারী-শিশুসহ নিরীহ মানুষের মর্মান্তিক প্রাণহানি ঘটছে। তারা এমনকি চিকিৎসার জন্য বহন করা অ্যাম্বুলেন্সেও হামলা করতে দ্বিধা করছে না। ইসরায়েল জাতিসংঘের সদস্য এবং আন্তর্জাতিক নিয়মনীতি পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তৎসত্ত্বেও তারা ফিলিস্তিনিদের ওপর গণহত্যা চালাতে দ্বিধা করছে না, যা কোনো আইন বা নৈতিকতার বিচারেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এর বিপরীতে আমরা দেখছি হামাসকে। তারা এমন রাজনৈতিক দল, যারা তাদের ভূমি ও সামরিক বাহিনীর রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। তারা স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে। ইতিহাসজুড়ে এমন অগণিত যুদ্ধ আমরা দেখেছি। তুর্কি বা আলজেরিয়ানরা যেমন স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছে; এমনিভাবে অত্যাচারী দখলদারদের বিরুদ্ধে অসংখ্য জাতি যুদ্ধ করেছে। যেসব দেশপ্রেমিক তাদের ভূমি রক্ষা করে; দখলদাররা তাদের ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসরায়েলকে ভয় পায় বলেই পশ্চিমা সরকারগুলো তার সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে কোনো দলকে ‘গণতন্ত্রপন্থি’ বা ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিচ্ছে। তবে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এ পথে হাঁটেননি। তিনি এমন বিশ্বনেতা, যিনি তাঁর কৃতিত্ববলে বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। তিনি বরং পশ্চিমাদের বয়ানের একটা বিরোধী অবস্থান নিয়েছেন। হামাস সন্ত্রাসী কিনা– তুরস্কের প্রেসিডেন্টের প্রতিরোধ ও প্রতিক্রিয়া এতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; তিনি এর চেয়েও বেশি কিছু করেছেন। তাঁর ভাষায়, ‘যারা শিশুদের হত্যা করে, তারা কীভাবে রাষ্ট্র হতে পারে? আর যারা তাদের ভূমি রক্ষা করে, তারা কীভাবে সন্ত্রাসী হতে পারে?’ প্রাসঙ্গিকভাবে মিসরীয় কমেডিয়ান বাসেম ইউসুফের বক্তব্য উল্লেখ করা যায়। তিনি বলেছেন, পশ্চিম তীরে তো হামাসের প্রাধান্য নেই; সেটা তো গাজা নয়। তবে কেন সেখানকার লোকজনকেও আপনি হত্যা করছেন?
ইসরায়েল সন্ত্রাসী সংগঠনের চেয়েও খারাপ আচরণ করছে। এটি প্রচলিত রাষ্ট্রের পরিবর্তে মাফিয়া রাষ্ট্রের আচরণ করছে। এর চেয়েও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, পশ্চিমা দেশগুলো সম্মিলিতভাবে এই অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে। আজ পর্যন্ত তারা যে মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেছে, তার সবই তারা ধ্বংস করেছে।
তবে আমরা দেখছি, বিশ্বের যত রাষ্ট্রই নিপীড়কের পাশে, অন্যায় ও শিশুহত্যার পক্ষে দাঁড়াক না কেন; বিবেকবান সব জাতিই ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়িয়েছে। সে জন্যই আমরা দেখছি, পশ্চিমা দেশগুলোর নাগরিকদের মধ্যেও বিভক্তি তৈরি হয়েছে। ন্যায়বিচারের পশ্চিমা ধারণার ব্যাপারে পূর্ব ও পশ্চিম উভয় জাতির মধ্যে সংশয় তৈরি হয়েছে। যার প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট– মানুষ ন্যায়বিচারের জন্য রাস্তায় প্রতিবাদ করছে এবং তাদের দেশের আচরণের জন্য তারা অসন্তোষ প্রকাশ করছে। কারণ, প্রতিষ্ঠিত এমন ব্যবস্থায় তারা সম্পূর্ণ আস্থা রাখতে পারছে না। আমি বিশ্বাস করি, নিপীড়ন বন্ধ হবে। এখন থেকে দিন দিন ফিলিস্তিনিদের অধিকার ওইসব মানুষের দাবিতে পরিণত হবে, যারা ন্যায়সম্মত বিশ্ব দেখতে চায়।
ইহসান আকতাস: ইস্তাম্বুলের মেডিপল ইউনিভার্সিটির শিক্ষক; ডেইলি সাবাহ থেকে সংক্ষেপিত ভাষান্তর
- বিষয় :
- ফিলিস্তিন
- সন্ত্রাস
- শিশু হত্যা
