শিপইয়ার্ডে দুর্ঘটনা
জাহাজই ভাঙুক, নিরাপত্তা নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্প আবারও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা প্রত্যক্ষ করিল। এইবারের ঘটনাস্থল সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড। শুক্রবার সকালে উক্ত পুরোনো জাহাজ ভাঙার কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে ৯ জনের মৃত্যু ঘটিয়াছে। ফায়ার সার্ভিস চট্টগ্রামের সহকারী পরচিালক তৌফিকুল ইসলামকে উদ্ধৃত করিয়া শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে, আলোচ্য জাহাজটি এলএনজি বহন করিত, যেই ধরনের জাহাজে বিষাক্ত কার্বন মনোঅক্সাইডসহ বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাস থাকে। নিয়মানুযায়ী গ্যাসমুক্ত না করিয়া জাহাজটি ভাঙিতে গিয়া উক্ত হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। শনিবার সকালে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে শিল্প সচিব সাংবাদিকদের বলিয়াছেন, বিস্ফোরক অধিদপ্তরের পরীক্ষায় জাহাজটিতে স্বাভাবিক মাত্রার তুলনায় অতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি পাওয়া গিয়াছে।
সীতাকুণ্ডের এই জাহাজ ভাঙা শিল্পে এহেন দুর্ঘটনা নূতন নহে। ফেরদৌস স্টিলেই, শ্রম অধিকারবিষয়ক নজরদারি সংস্থা বিলসের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ১৪ নভেম্বর উপর হইতে পড়িয়া মৃত্যু হয় খলিলুর রহমান নামে এক শ্রমিকের। বৈদ্যুতিক কাজ করিতে গিয়া ২০২৩ সালে নিহত হন বাবু নামে আরেক শ্রমিক। তদুপরি ২০২৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর এসএন করপোরেশন নামে একটি ইয়ার্ডে জাহাজ কাটিবার সময় গ্যাস বিস্ফোরণে প্রাণ হারাইয়াছিলেন সাত শ্রমিক। প্রতি বৎসর ৮-১০ জন এই শিল্পে প্রাণ হারান। ২০২৩ সালে বেসরকারি সংস্থা শিপ ব্রেকিং প্ল্যাটফর্মের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৫ হইতে ২০২২ সাল পর্যন্ত সীতাকুণ্ডের শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে দুর্ঘটনায় মোট ২৪৯ জন শ্রমিক নিহত হন। দশকের পর দশক ধরিয়া সংঘটিত এই সকল দুর্ঘটনায় আরও কত আহত শ্রমিককে যে পঙ্গুত্ব বরণ করিতে হইয়াছে তাহার কোনো হিসাব নাই। বিস্ময়কর হইল, ছয় মাস পূর্বে নিরাপত্তা বিষয়ে ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে একই রকমের গাফিলতির প্রমাণ পাইয়াছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। তাহাদের পর্যবেক্ষণে গুরুতর তিনটি অনিয়ম ধরা পড়িবার পর গত জুলাই মাসে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শ্রম আদালতে একটি মামলা করা ব্যতীত আর কোনো পদক্ষেপই গৃহীত হয় নাই। এই প্রেক্ষাপটে এহেন ধারাবাহিক প্রাণহানিকে নিছক দুর্ঘটনার ফল না বলিয়া কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলাই সংগত। প্রসঙ্গত, শ্রম আইন অনুযায়ী, একজন শ্রমিক প্রতি দুই ঘণ্টা পর আধা ঘণ্টা বিশ্রাম পাইবার অধিকারী হইলেও বাস্তবে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ডে শ্রমিকরা টানা আট হইতে ১০ ঘণ্টা কাজ করিতে বাধ্য হন। উপরন্তু, শ্রমিকদের জাহাজ ভাঙার কাজে নিয়োজিত করিবার পূর্বে প্রশিক্ষণদানের বাধ্যতামূলক নিয়মটিও উপেক্ষিত থাকে। খুব কম ক্ষেত্রেই শ্রমিকদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়। আরও হতাশাজনক হইল, এমনকি ইতোমধ্যে গ্রিন ইয়ার্ডের স্বীকৃতিপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানেও ধারাবাহিক নজরদারির অনুপস্থিতিতে কোনো নিয়মই প্রতিপালিত হয় না।
প্রতিবেদনমতে, ঘটনায় তদন্ত শুরু হইয়াছে। জাহাজের দুর্ঘটনাকবলিত অংশে কাজ শুরুর পূর্বে তথায় বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হইয়াছিল কিনা এবং কাজের জায়গাটি নিরাপদ ঘোষণা করিবার পদ্ধতি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হইয়াছিল কিনা, তাহা খতাইয়া দেখিতেছে তদন্ত কমিটি। তবে এলএনজি পরিবহন করা জাহাজটি কাটার জন্য ২০২৫ সালের জুলাইয়ে কীভাবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র পাইল, তাহাও জানা প্রয়োজন। সর্বোপরি, ইয়ার্ডটিতে নিরাপত্তা ঘাটতি সংক্রান্ত মামলা হইবার পরও মালিকপক্ষ কেন শোধরাইল না? কোন আশীর্বাদ তাহাকে এহেন ঔদ্ধত্য প্রদর্শনের সাহস জোগাইয়াছে, তাহাও বাহির করা প্রয়োজন। আশীর্বাদপুষ্টের সহিত আশীর্বাদদাতাকেও আইনের আওতায় না আনা হইলে জাহাজ ভাঙা শিল্প মৃত্যুফাঁদ হিসাবেই থাকিয়া যাইবে; আর ইহার পরিণামে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। অনস্বীকার্য, এই শিল্প কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখিতেছে, সরকারকে ভালো পরিমাণ রাজস্বও জোগাইয়া থাকে। দেশের ইস্পাত ও রিরোলিং মিলগুলিও ইহার উপর প্রভূত পরিমাণে নির্ভরশীল। কিন্তু এই শিল্প প্রাণ-প্রকৃতির জন্য হুমকি হইয়া থাকিলে লাভের গুড় কার্যত পিঁপড়ায় খাইবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়