ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

নেপালে প্রাকৃতিক বিপর্যয়

বাংলাদেশের জন্য যাহা শিক্ষণীয়

বাংলাদেশের জন্য যাহা শিক্ষণীয়
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ১০:৫৩

প্রকৃতির আশীর্বাদ সতর্কতার সহিত গ্রহণ ও ব্যবহার না করিলে তজ্জনিত পরিণাম কতটা ভয়াবহ হইতে পারে, গত বুধবার নেপালে সংঘটিত প্রলয়ংকরী দুর্যোগ তাহার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। উহাকে নিছক বন্যা বলিলে ভ্রম হইবে; বরং উহা ছিল প্রকৃতির নির্মম প্রত্যাঘাত। নেপালি বিশেষজ্ঞদিগের প্রাথমিক অনুসন্ধানে হিমবাহের একটি অংশ ধসিয়া পড়া এবং তথা হইতে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোতের ঘটনাকে দায়ী করা হইয়াছে।

মার্কিন ভূ-তাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও অন্যান্য বিশেষজ্ঞের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পাঁচ সহস্র মিটারের অধিক উচ্চতায় হিমবাহের একটি বৃহৎ অংশ ভাঙিয়া উপত্যকায় আছড়াইয়া পড়িয়াছে। উহার ফলে আকস্মিক জলপ্রবাহের সহিত বিপুল পরিমাণ পাথর, মাটি ও ধ্বংসাবশেষ নিম্নে চলিয়া আসে। পর্বতবিজ্ঞানীরা বলিতেছেন, দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহগুলির অস্থিতিশীলতা এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বৃদ্ধি করিতেছে।

এই দুর্যোগে নেপাল ও তিব্বতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত। তিন শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গিয়াছে; নিখোঁজ প্রায় দেড় সহস্র মানুষ। প্রজন্মের পর প্রজন্মের ব্যবসায়ী, অভিযাত্রী ও তীর্থযাত্রীদের ব্যবহৃত কাঠমান্ডু-লাসা সংযোগপথও ক্ষতিগ্রস্ত।

হিমালয় নেপালের পর্যটন ও অর্থনীতির বৃহৎ ভিত্তি। তৎসহিত এই অঞ্চল হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈনসহ বহু ধর্মাবলম্বীর গুরুত্বপূর্ণ তীর্থভূমি। ফলে এই বিপর্যয় শুধু প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি নহে; উহার অভিঘাত অর্থনীতি, যোগাযোগ, পর্যটন ও জনজীবনযাত্রার উপরেও দীর্ঘস্থায়ী হইবে। সমগ্র বিশ্ব উক্ত ঘটনায় উদ্বিগ্ন। কিন্তু এই বিপর্যয়কে শুধু একটি দুর্ঘটনারূপে চিহ্নিতকরণের অবকাশ নাই।

ঘটনাটি আকস্মিক হইলেও হিমালয়ের এমন বিপর্যয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্কতা পূর্বের। এক বৎসরের কিয়ৎকাল অধিক সময়ের মধ্যে উক্ত অঞ্চলে উহা দ্বিতীয় হিমবাহ বিপর্যয়সৃষ্ট আকস্মিক জলস্রোত। গত বৎসরের জুলাই মাসে প্রায় একই ধরনের একটি ঘটনায় পুরেপা হিমবাহের উপরের একটি হ্রদ হইতে বন্যার পানি নেপালে প্রবেশ করিলে আটজন প্রাণ হারাইয়াছিল। গত কয়েক বৎসরে প্রকাশিত একাধিক গবেষণায় দেখা গিয়াছে, হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলিতেছে এবং হিমবাহ-হ্রদ ও পাহাড়ি নদীর ঝুঁকি ক্রমবর্ধমান। শনিবার সমকালে প্রকাশিত এক নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া অঙ্গরাজ্যের কমনওয়েলথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. খালেকুজ্জামানও লিখিয়াছেন, ঘটনাটির সূচনা নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তঘেঁষা অত্যন্ত দুর্গম ও খাড়া পার্বত্যাঞ্চলে হইলেও পূর্বের কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট অঞ্চল হইতে শুরু করিয়া অন্নপূর্ণা পর্বতমালা হইয়া নেপালের রসুওয়া গাদি জেলার বিস্তীর্ণ এলাকার শত শত হিমবাহেই এহেন কাঠামোগত অস্থিতিশীলতা ধীরে ধীরে সঞ্চিত হইতেছে। ফলে এই অঞ্চলের সরকারগুলির জন্য হিমবাহ পর্যবেক্ষণ, সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং উদ্ধার পরিকাঠামোতে বিনিয়োগ করা অপরিহার্য। 

বাংলাদেশের জন্য এই সতর্কবার্তা আরও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রধান নদীগুলির উৎস হিমালয়ে। একাধিক দেশ অতিক্রম করিয়া সেই পানি বাংলাদেশে আসিয়া থাকে। ফলে হিমালয়ের হিমবাহ বিপর্যয় কিংবা আকস্মিক জলপ্রবাহের অভিঘাত আমাদের উপরেও পড়িতে পারে। তৎকারণে আন্তঃসীমান্ত নদী, জলবায়ু ও দুর্যোগ-সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত বিনিময় জোরদার করা আবশ্যক। শুধু পানি বণ্টন নয়, ঝুঁকির তথ্যও বণ্টন করিতে হইবে।

সর্বোপরি উপর্যুপরি প্রাকৃতিক দুর্যোগ সত্ত্বেও নেপালকে বুধবারের ঘটনার পর যে রকম অপ্রস্তুত মনে হইয়াছে, তাহা হইতে আমাদেরও শিক্ষণীয় অনেক কিছু। ঢাকা, চট্টগ্রাম কিংবা সিলেটে বৃহৎ আকারের ভূমিকম্প হইলে কয়েক লক্ষ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হইতে পারে– এমন সতর্কবাণী সত্ত্বেও দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি প্রায় নাই বলিলে অত্যুক্তি হইবে না। দুর্যোগের অব্যবহিত পর তৎপর হওয়ার সংস্কৃতি বদলাইয়া দুর্যোগের পূর্বেই প্রস্তুত হওয়ার সংস্কৃতি গড়িতে হইবে। এই ব্যাপারে অবিলম্বে সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলকে তৎপর হইতে হইবে। জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সচেতনতা ও প্রতিরোধ কার্যক্রম বিষয়েও নিদ্রামগ্ন থাকিবার অবকাশ নাই।
 

আরও পড়ুন

×