সুনামগঞ্জে সড়কের বৃক্ষ কর্তন
হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুসরণ করুন
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের দুই পাশের সাড়ে চার সহস্র বৃক্ষ কর্তনের কারণে বন বিভাগের উদ্যোগের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ যে প্রতিবাদে সরব হইয়াছেন তাহা সংগত বলিয়া আমরা মনে করি। গত রবিবার প্রকাশিত সমকালের সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন হইতে ইহা স্পষ্ট যে, যদিও সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় রোপিত বৃক্ষসমূহের পরিচর্যাকারীদের ‘লভ্যাংশ’ দেওয়ার জন্য একটা নির্দিষ্ট সময় অন্তর বৃক্ষসমূহ কর্তনের নিয়ম রহিয়াছে; বাস্তবে বন বিভাগ উক্ত বিষয়ে উহার ইচ্ছামাফিক চলিতেছে। প্রথমত, সড়কের মালিক সড়ক ও জনপথ বিভাগ হইলেও সংস্থাটিকে উক্ত বৃক্ষ কর্তন বিষয়ে দরপত্রের একটা অনুলিপি প্রদান করা ব্যতীত তেমন কিছুই অবহিত করা হয় নাই। দ্বিতীয়ত, বন বিভাগ শুধু বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষ কর্তনের কথা বলিলেও, স্থানীয়দের অভিযোগ, ইতোমধ্যে যে এক সহস্রাধিক বৃক্ষ কর্তন হইয়াছে সেগুলির মধ্যে দেশীয় ফলদ ও ছায়াবৃক্ষও রহিয়াছে। সর্বোপরি, ২০২৪ সালেও বন বিভাগ একই সড়কের প্রায় তিন সহস্র বৃক্ষ কর্তনের উদ্যোগ লইলে উহার বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে একটি বেসরকারি সংস্থার পক্ষ হইতে রিট আবেদন হয়। সেই রিটের পরিপ্রেক্ষিতে জারীকৃত রুল নিষ্পত্তি করিয়া ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্ট সামাজিক বনায়ন বিধিমালা, ২০০৪-এর আওতায় রোপণ করা বৃক্ষ কর্তন না করিয়া তার বাজারমূল্য নির্ধারণপূর্বক নির্বাচিত উপকারভোগীদের অর্থ দেওয়ার বিধান যুক্ত করিবার নির্দেশ দিয়াছিলেন। আলোচ্য ক্ষেত্রে বন বিভাগ উক্ত নির্দেশনার ধারেকাছেও যায় নাই। উপরন্তু একই রায়ে সামাজিক বনায়নের বৃক্ষ কর্তনের ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বে শিক্ষক, সমাজকর্মী, সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের সমন্বয়ে সাত সদস্যের কমিটি গঠন এবং সেই কমিটির অনুমোদন ব্যতিরেকে বৃক্ষ কর্তন না করিবার নির্দেশনাও দিয়াছিলেন। বন বিভাগ উহাও অনুসরণ করে নাই।
প্রসংগত, ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির আওতায় সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের প্রায় ১৯ কিলোমিটার অংশের দুই পাশে প্রায় ২০ সহস্র বৃক্ষ রোপণ করা হয়। স্থানীয় উপকারভোগীরা শুরু হইতেই এই সকল বৃক্ষের পরিচর্যা করিয়াছেন। তাহাদের সহিত স্বাক্ষরিত চুক্তি মতে, বৃক্ষসমূহ পরিপক্ব হইয়াছে বিধায় তাহারা অনেকদিন যাবৎ লভ্যাংশ দাবি করিয়া আসিতেছেন। অভিযোগ রহিয়াছে, অতীতে বিভিন্ন সময় বহু স্থানে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তারা এহেন সামাজিক বনায়নের বৃক্ষ বিক্রয় করিয়া সমুদয় অর্থ নিজেদের পকেটস্থ করিয়াছেন; পরিচর্যাকারীরা কিছুই পান নাই। সুনামগঞ্জের আলোচ্য ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট অনেক উপকারভোগীর মধ্যে অনুরূপ সন্দেহ দানা বাঁধিয়াছে; তাই তাহারাও উক্ত বৃক্ষ কর্তনের বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছেন।
বিদ্যমান সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি লইয়াও বিশেষত পরিবেশসচেতন মহলে অনেক প্রশ্ন রহিয়াছে; সেইগুলিরও উত্তর খোঁজা প্রয়োজন। উহার আওতাধীন বৃক্ষ একটা নির্দিষ্ট সময় পর বিক্রয় করিবার অধিকার বন বিভাগের রহিয়াছে, তবে উহা শর্তহীন হইতে পারে না। বন বিভাগ কর্তিত বৃক্ষের স্থলে নূতন চারা রোপণ করিবে এমন বিধান সেখানে রহিয়াছে বটে, তবে একটা বৃক্ষ পরিপক্ব হইতে যে বিপুল সময় প্রয়োজন হয় সেই সময়ে সংশ্লিষ্ট এলাকায় পরিবেশ-প্রতিবেশের কী হইবে তাহাও ভাবনায় রাখিতে হইবে। দিন শেষে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির লক্ষ্য কিন্তু নিছক স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান বা কিছু অর্থ আয়ের ব্যবস্থা করা নহে, পরিবেশ-প্রতিবেশের সুরক্ষা ও উন্নয়নও ইহার অন্যতম লক্ষ্য। মনে রাখিতে হইবে, এমন সময়ে এই কর্মসূচি গৃহীত হইয়াছে যখন তাপমাত্রার অত্যধিক বৃদ্ধি এবং জনজীবনে উহার বহুবিধ বিরূপ প্রভাব জনপরিসরসহ প্রায় সর্বত্রই অন্যতম আলোচনার বিষয়। অন্যদিকে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব এমনকি বাংলাদেশের ন্যায় পলিগঠিত ভূখণ্ডসমূহের অস্তিত্বের প্রতি ক্রমবর্ধমান হুমকি সৃষ্টি করিয়া চলিয়াছে। ফলে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিটি ঢালিয়া সাজানো জরুরি বলিয়া আমরা মনে করি। নিদেনপক্ষে উচ্চ আদালতের এ-সংক্রান্ত রায় অনুসরণ করিলেও কর্মসূচিটি জনবান্ধব তো বটেই, পরিবেশবান্ধবও হইয়া উঠিবে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়