ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

জলবন্দি চট্টগ্রাম

জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধ!

জনগণের অর্থের শ্রাদ্ধ!
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:২৮

| প্রিন্ট সংস্করণ

তিন সরকারি সংস্থার পৃথক প্রকল্প বাস্তবায়ন করিতে গিয়া ইতোমধ্যে মোট ১০ সহস্র কোটি টাকা ব্যয় হইলেও সামান্য বৃষ্টিতে প্রায় সমগ্র চট্টগ্রাম নগরীকে ডুবিয়া যাইতে দেখা নিশ্চয় দুর্ভাগ্যজনক। মঙ্গলবার প্রকাশিত সমকালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগরবাসীকে জলাবদ্ধতা হইতে মুক্তি দিতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), সিটি করপোরেশন (চসিক) ও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় মোট ১৪ সহস্র কোটি টাকার যে চারটি প্রকল্প গ্রহণ করিয়াছিল, সেইগুলির কাজ শেষ পর্যায়ে থাকিলেও গত তিন মাসে বন্দরনগরী তিন দফা পানিতে নিমজ্জিত হইয়াছে। এই কারণে প্রকল্পসমূহের পশ্চাতে ইতোমধ্যে ১০ সহস্র কোটি টাকা ব্যয় হইলেও অপূরণীয় ক্ষতি হইতেছে ব্যবসা-বাণিজ্যে। সোমবারও তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে স্মরণকালের সর্বাধিক জলাবদ্ধতা হইয়াছে চট্টগ্রামের বৃহৎ পাইকারি ও খুচরা বাণিজ্যকেন্দ্র রেয়াজুদ্দিন বাজারে। রেয়াজুদ্দিন বাজার ও তামাকুমণ্ডি লেনের প্রায় ১৩০টি মার্কেটের নিচতলার ৮০০ দোকান পানিতে নিমজ্জিত। ইহাতে ক্ষতি হইয়াছে প্রায় ২০ কোটি টাকার। আমরা জানি, চট্টগ্রামকে জলাবদ্ধতামুক্তকরণ প্রকল্পসমূহে যে অর্থ বরাদ্দ হইয়াছে, তাহার ভার দিবাবসানে নাগরিকদেরই বহন করিতে হইবে। অতএব প্রকল্প বাস্তবায়নে যে সকল নাগরিক অর্থের জোগান দিতেছেন; প্রকল্পের ব্যর্থতায় সেই নাগরিকদের শুধু দুর্ভোগই নহে, আর্থিক ক্ষতিও পোহাইতে হইতেছে। 

সিডিএর চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বিবিধ সমস্যার কথা বলিয়া দাবি করিয়াছেন, আগামী বৎসর নগরবাসী এই সকল প্রকল্পের সুফল পাইবেন। কিন্তু চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলিয়াছেন, যথাযথভাবে সমীক্ষা না করা, পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণ না করা, জোয়ার-ভাটা বিবেচনায় না আনা, খাল-নালা-জলাধারের সক্ষমতা বুঝিতে না পারা এবং অপরিকল্পিতভাবে জলকপাট নির্মাণের কারণে প্রকল্পের অন্তিম পর্যায়ে আসিয়াও সুফল মিলিতেছে না। এমনকি ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রস্তাবও উপেক্ষা করা হইয়াছে এই সকল প্রকল্পে। অভিযোগ রহিয়াছে, চারটি প্রকল্পের কোনোটিতেই নগরের খালসমূহকে অন্তর্ভুক্ত করা হয় নাই। সিডিএর পরিসংখ্যানমতে, নগরে ছোট-বড় ৭৪টি খাল রহিয়াছে। তন্মধ্যে ৬১টি খাল লইয়া বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করা হইয়াছে। কিন্তু বৃহৎ প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত হইয়াছে মাত্র ৩৬টি খাল। অর্থাৎ অবশিষ্ট ৩৮টি খাল এখনও প্রকল্পের বাহিরে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, এমতাবস্থায় প্রকল্পের সুফলপ্রাপ্তি অসম্ভব। 

বস্তুত যে প্রক্রিয়ায় প্রকল্পসমূহ গৃহীত হইয়াছিল, উহাতেও বড় ধরনের গলদ ছিল। স্মরণ করা যাইতে পারে, উল্লিখিত তিনটি সংস্থা নগরীর জলাবদ্ধতা লইয়া সমন্বিতভাবে কাজ করিবার কথা থাকিলেও উহারা কার্যত প্রকল্প গ্রহণে এক প্রকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হইয়াছিল। তৎকালীন ঊধ্বর্তন কর্তৃপক্ষও রহস্যজনক কোনো কারণে পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ব্যতীত প্রকল্পসমূহ অনুমোদন করিয়াছিল। এই কারণে প্রকল্পসমূহের শুরুতে তো বটেই, সেইগুলি অনুমোদনের পূর্বেও বিশেষজ্ঞ মহলে উহাদের কার্যকারিতা লইয়া ব্যাপক প্রশ্ন উঠিয়াছিল। আমরাও এই স্তম্ভে তখন বিষয়টি লইয়া একাধিক সম্পাদকীয় লিখিয়া জনগণের কষ্টার্জিত অর্থের শ্রাদ্ধ না করিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাইয়াছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক, সকলই শেষ পর্যন্ত অরণ্যে রোদনে পরিণত হয়।
আমরা মনে করি, এহেন হতাশাজনক অভিজ্ঞতা হইতে বর্তমান সরকার বিশেষত প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করিতে পারে। ইহাও প্রত্যাশিত, চট্টগ্রামের দুঃখরূপে পরিচিত সাংবৎসরিক জলাবদ্ধতা সমস্যাটির কার্যকর সমাধানও তাহারা খুঁজিবে। মনে রাখিতে হইবে, বন্দর ও অন্যান্য কারণে দেশের অর্থনীতির সিংহভাগ চট্টগ্রাম নগরীর উপর নির্ভরশীল বলিয়া ওই দুঃখ কার্যত সমগ্র দেশের। তাই সমস্যাটি সমাধানে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। তবে আপাতত বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের ভিত্তিতে চলমান প্রকল্পসমূহের পরিমার্জন-পরিবর্ধন করিয়া সমস্যার তীব্রতা হ্রাসে প্রয়াস চালানো যাইতে পারে।
 

আরও পড়ুন

×