ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পণ্ড

আইন অপেক্ষা নৈরাজ্য শক্তিশালী

আইন অপেক্ষা নৈরাজ্য শক্তিশালী
×

প্রতীকী ছবি

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:০৫ | আপডেট: ২৪ আগস্ট ২০২৬ | ১১:১১

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় পুলিশের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার ঘটনাটি শুধু অনভিপ্রেত নহে, এক অশনিসংকেতও বটে। কারণ এই হামলায় উগ্রপন্থিদের সম্মুখে খোদ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসহায়ত্ব প্রকাশ পাইয়াছে।

বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার পুলিশের চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজির ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আগমন উপলক্ষে পুলিশ লাইন্সে জেলা পুলিশের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে উচ্চ শব্দে গান বাজানোর অভিযোগে সড়কের অপর পাশের দারুল আরকাম মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানস্থলে ভাঙচুর করিয়াছে।

স্মরণ করা যাইতে পারে, চলতি বৎসরের মে মাসেও কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদের শিক্ষার্থীদের বাধার মুখে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘বনলতা এক্সপ্রেস’-এর প্রদর্শনী বাতিল করা হয়। সেই সময়েই উক্ত প্রদর্শনী বন্ধের প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিবাদ কর্মসূচি পালিত হইলেও সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন উক্ত চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর অনুষ্ঠানে কোনো সহযোগিতা করে নাই। মঙ্গলবার পুলিশ লাইন্সের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ন্যক্কারজনক হামলাটি উক্ত ঘটনারই ধারাবাহিকতা বলিয়া বিশ্বাস করিবার যথেষ্ট কারণ রহিয়াছে। বস্তুত গত দুই বৎসরে দেশের বিভিন্ন স্থানে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের ওপর তৌহিদি জনতার নামে হামলা হইয়াছে। অনেক স্থানে নারীদের ফুটবল বা ক্রিকেট খেলা বন্ধেরও চেষ্টা চলিয়াছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, অন্তর্বর্তী সরকার তো বটেই, বর্তমান সরকারও উক্ত হামলাকারীদের গ্রেপ্তার ও শাস্তি নিশ্চিত তো দূরস্থান, এমনকি নিবৃত্ত করিবার প্রয়াস চালায় নাই। এহেন পরিস্থিতি উগ্রবাদী ও সংস্কৃতিবিরোধী গোষ্ঠীগুলিকে নিঃসন্দেহে আশকারা জোগাইয়াছে।

সংবিধান বা প্রচলিত কোনো আইনেই গানবাজনা বা যে কোনো প্রকার সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ নহে। বরং সকলেরই নিজের মতো করিয়া ধর্ম পালন, তৎসহিত আনন্দ-উৎসব করিবার পূর্ণ অধিকার রহিয়াছে। কিন্তু নাগরিকের সেই অধিকারের সুরক্ষা যাহারা নিশ্চিত করিবে তাহারাই যখন উৎসব করিতে গিয়া আক্রান্ত হন, তখন সচেতন মহল গভীরভাবে উদ্বিগ্ন না হইয়া পারে না।
আমরা জানি, সমাজের সিংহভাগ মানুষ যে কোনো সাংস্কৃতিক উৎসবে যেভাবে মাতিয়া উঠে তাহা একটি বিশেষ ধর্মীয় গোষ্ঠীর অপছন্দ। ইহার বিরুদ্ধে তাহারা দশকের পর দশক প্রচারাভিযানও চালাইয়া আসিতেছে। কিন্তু সেই প্রচারাভিযান যখন হামলা, ভাঙচুর বা সহিংসতার রূপ পরিগ্রহ করে তখন তাহা ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে যায়। অতীতের এহেন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হইত, তাহা হইলে সাম্প্রতিক হামলাগুলি হয়তো দেখিতে হইত না। উল্লেখ্য, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে হামলার পরদিনই কিশোরগঞ্জে একটি কনসার্ট স্থগিত করা হইয়াছে। অনুষ্ঠানটি বুধবার হইবার কথা থাকিলেও স্থানীয় আলেম-উলামাদের আপত্তি এবং আয়োজক প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন না থাকিবার কারণ দেখাইয়াছে জেলা প্রশাসন। এই ধরনের ঘটনা বিশেষত সামাজিক সম্প্রীতি ও মানবিক মূল্যবোধের উপর প্রত্যক্ষ আঘাত। 

সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে এই ধরনের হামলা, ভাঙচুর, এমনকি অনুষ্ঠান হইতে না দিবার ঘটনা অব্যাহত থাকিলে সামাজিক অস্থিরতাই শুধু বৃদ্ধি পাইবে না; সমাজকেও রসাতলে লইয়া যাইবে। অন্যদিকে আন্তর্জাতিকভাবেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইবে। অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতাসহ উন্নয়নমূলক সকল প্রত্যাশা পূরনের পথে তাহা প্রতিবন্ধক হইবে। তাই অবিলম্বে স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য তদন্তের মাধ্যমে আলোচ্য ঘটনাবলির জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, অভিভাবক ও ধর্মীয় নেতাদের দায়িত্বশীল ভূমিকাও প্রয়োজন। সহনশীল ও মানবিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সর্বত্র জনসচেতনতা গঠন করা সময়ের দাবি। তবে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতীত কোনো কিছুই সম্ভব নহে। সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন ও সচেতন মানুষদের এই ব্যাপারে সোচ্চার থাকিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×