ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সংকটাপন্ন সেন্টমার্টিন

কর্তৃপক্ষের অমার্জনীয় উদাসীনতা

কর্তৃপক্ষের অমার্জনীয় উদাসীনতা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৯ | আপডেট: ২৫ আগস্ট ২০২৬ | ০৭:১৯

| প্রিন্ট সংস্করণ

পরিবেশ অধিদপ্তর ঘোষিত দেশের ১৩টি প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার একটি হওয়া সত্ত্বেও সেন্টমার্টিনে পরিবেশবিরোধী প্রায় সকল কর্মকাণ্ড চলিতেছে বলিয়া সোমবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে যাহা বলা হইয়াছে, তাহা দুর্ভাগ্যজনক। তথায় কংক্রিটের কোনো অবকাঠামো নির্মাণ, এমনকি ইট-সিমেন্ট লওয়া নিষিদ্ধ হইলেও দ্বীপটিতে ইট-সিমেন্টের অবকাঠামো নির্মীয়মাণ। প্রকাশ্য দিবালোকে তথায় নির্মাণসামগ্রী পরিবহন করা হয়; বহুতল ভবনের নির্মাণকার্য চলমান; অবাধে হোটেল ও রিসোর্টও উদ্বোধন হইতেছে। বর্তমানে সেন্টমার্টিনে পর্যটকের বিচরণ সীমিত করা হইলেও দ্বীপের হোটেল মালিক সমিতি ও পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, তথায় বহুতল ও একতল মিলাইয়া হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ ও রেস্তোরাঁর সংখ্যা আড়াই শতাধিক, যেইগুলির মধ্যে গত পাঁচ বৎসরে তৈয়ার হইয়াছে অন্তত ১৫০টি। দ্বীপে যত্রতত্র ময়লা-আবর্জনা, প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট ও হোটেল-রেস্তোরাঁর বর্জ্য ফেলা হইতেছে। নির্জন সৈকতের বালিয়াড়ি ও কেয়াবন উজাড় করিয়া অবকাঠামো তৈয়ারের কারণে ডিম দিতে পারিতেছে না মা কচ্ছপ। অন্যদিকে সৈকতের বালুচর দিয়া পর্যটকবাহী ইজিবাইক ও মোটরসাইকেল চলাচলের ফলে শামুক, ঝিনুক, লাল কাঁকড়াসহ জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হইতেছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এই লীলাভূমিতে এহেন পরিবেশবিরোধী ক্রিয়াকর্ম এমন সময়ে চলিতেছে, যখন ২০২০ সালে সেন্টমার্টিন লইয়া আন্তর্জাতিক ওশান সায়েন্স জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধ অনুসারে, দ্রুত নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ না লইলে ২০৪৫ সালের মধ্যে দ্বীপটি সম্পূর্ণ প্রবালশূন্য হইতে পারে। 

সেন্টমার্টিনে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ প্রতিহতকরণের দায়িত্ব জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের। প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা হিসাবে দ্বীপ রক্ষার দায়িত্ব পরিবেশ অধিদপ্তরেরও। এই কারণে পুলিশ ফাঁড়ির সহিত সেন্টমার্টিন দ্বীপেই পরিবেশ অধিদপ্তরের একটি কার্যালয় স্থাপন করা হইয়াছে। উহারা যে নির্ধারিত দায়িত্ব কতটুকু পালন করিতেছেন, তাহা দ্বীপের বর্তমান অবস্থা দেখিয়াই উপলব্ধ। কিন্তু দুঃখজনক, সংশ্লিষ্ট কোনো কর্তৃপক্ষই দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি স্বীকার করিতে কুণ্ঠিত।

টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস.এম. অনীক চৌধুরী সমকালকে বলিয়াছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের সংবাদপ্রাপ্তির অব্যবহিত পরই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইতেছে। আর দ্বীপে নির্মাণাধীন স্থাপনা মালিকদের নামে একাধিক নোটিশ ও মামলা করা হইয়াছে দাবি করিয়া পরিবেশ অধিদপ্তর-কক্সবাজার জেলা কার্যালয়ের পরিচালক জমির উদ্দিন স্বীয় দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে কী কী সীমাবদ্ধতা রহিয়াছে, তাহার একটি ফিরিস্তি উপস্থিত করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, সেন্টমার্টিন দ্বীপে তাহাদের ‘ছোট্ট একটি অফিস’ থাকিলেও জনবল সংকটের কারণে তথায় কোনো কর্মকর্তা নাই। তাই জেলা সদর হইতেই দ্বীপের পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষায় তাহারা ‘সর্বোচ্চ’ কার্য চালাইয়া যাইতেছেন। 

এইদিকে সরকারের অবহেলা, অনিয়ন্ত্রিত উন্নয়ন ও লাগামহীন পর্যটনের চাপে সেন্টমার্টিন যখন অস্তিত্ব সংকটে; প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ভাঙিয়া তথায় যখন গড়িয়া তোলা হইয়াছে একাদিক্রমে মুনাফাকেন্দ্রিক স্থাপনা; তখন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম শনিবার সেন্টমার্টিনকেন্দ্রিক মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা ব্যক্ত করিয়াছেন সাংবাদিকদের নিকট। প্রতিবেদনমতে, মহাপরিকল্পনাটি বর্তমান রূপে কার্যকর হইলে দ্বীপের একটা এলাকা হইবে শুধুই পর্যটকদের জন্য। দুইটি এলাকায় পর্যটক ও স্থানীয় বাসিন্দারা দিবালোকে প্রবেশ করিতে পারিলেও রাত্রিযাপন করিতে পারিবেন না এবং চতুর্থটি হইবে পর্যটক ও স্থানীয় অধিবাসী সকলের জন্যই সর্বদা নিষিদ্ধ এলাকা। আপাতদৃষ্টিতে পরিকল্পনাটি উত্তম মনে হইলেও এখনও উহা দূরবর্তী বিষয়। উপরন্তু সরকার পরিবর্তনের সহিত ঐকতানে এই দেশে যেইভাবে নীতি-কৌশলেরও পরিবর্তন ঘটিয়া যায়, উহাও মহাপরিকল্পনার ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সংশয়ের উদ্রেক করে বৈ কি।
অতএব আমরা মনে করি, পরিবেশ বিশেষজ্ঞসহ সংশ্লিষ্ট সকলের পরামর্শক্রমে আলোচ্য মহাপরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের মধ্যেই সরকারকে সেন্টমার্টিন সুরক্ষায় সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ, তৎসহিত তথায় নূতন কংক্রিটের স্থাপনা নির্মাণ কঠোর হস্তে প্রতিরোধে মনোনিবেশ করিতে হইবে।

আরও পড়ুন

×