ঢাকা বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অপরাধের বাড়বাড়ন্ত

প্রশাসনের দৃষ্টিকটু নিষ্ক্রিয়তা

প্রশাসনের দৃষ্টিকটু নিষ্ক্রিয়তা
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬ | ০৮:২৭

| প্রিন্ট সংস্করণ

রাজধানীর মিটফোর্ড হাসপাতালের সড়কে প্রকাশ্য দিবালোকে প্রস্তর দ্বারা প্রহারে জনৈক ব্যক্তিকে হত্যা করা হইয়াছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে সংঘটিত ঐ হত্যাকাণ্ডের ন্যায় আরও অসংখ্য অঘটনের পর গণতান্ত্রিক সরকারের নিকট মানুষের প্রত্যাশা জন্মিয়াছিল পরিবর্তনের। সকলেই ভাবিয়াছিলাম, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হইবে; নাগরিকের নিরাপত্তা বাড়িবে। আরও সংকটের কথা, দেশের নীতিনির্ধারকগণ এইরূপ পরিস্থিতিতেও আত্মতৃপ্ত হইতেছেন। অথচ সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতা প্রায় প্রতিদিনই দখল করিতেছে খুন আর সহিংসতার খবর। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতি অস্বীকার যে প্রকারান্তরে অধিকতর অবনমনেরই বৈধতা– কর্তাব্যক্তিদিগকে বুঝাইবে কে!  

গত ১৭ আগস্ট সচিবালয়ে এক সভা শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলিয়াছিলেন, গত ছয় মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ‘দৃশ্যমান উন্নতি’ ঘটিয়াছে। জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিস্থিতি আরও সুসংহত করিতে সময় প্রয়োজন। প্রশ্ন হইল, দৃশ্যমান উন্নতি ঘটিল কী রূপে? মন্ত্রীর বক্তব্যের মাত্র তিন দিবসান্তে পরিবারসমেত নৃশংসভাবে খুন হইলেন রংপুরের শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী। তাহাদের হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ এখনও তদন্তাধীন। কিন্তু ইহা তো সত্য– এই ঘটনায় রাষ্ট্রে নাগরিকের নিরাপত্তাহীনতাই উন্মোচিত হইয়াছে। মাদারীপুরের শিবচরে ধর্ষণের পর এক নারীকে হত্যা করিয়া তাঁহার ১ বৎসর বয়সী সন্তানকে পানিতে ফেলিয়া দিয়াছে দুর্বৃত্ত। দুই দিন পরই জামালপুরে দুই শিশুসন্তানের সম্মুখে মাকে কণ্ঠ রুদ্ধ করিয়া হত্যা করা হইয়াছে। মন্ত্রীর ‘আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটিতেছে’ মন্তব্যের পূর্বেও কি এইরূপ অঘটন ঘটে নাই? গত ৬ আগস্ট রাজধানীর সবুজবাগে নারীর খণ্ডিত মস্তক ও পলিথিনে মোড়ানো দুই হাত উদ্ধার হইয়াছিল। এই সকলই সাম্প্রতিক ঘটনা।

বুধবার সমকালের প্রথম পাতায় ছাপা হইয়াছে ‘দেশে ৩৮৬ কিশোর গ্যাং, সোয়া ৪ হাজার সদস্য বেপরোয়া’ শিরোনামের সংবাদ। পুলিশের দেওয়া তথ্যমতে, এই সকল গ্রুপের সদস্য আড়াই সহস্রাধিক। আর রাজধানীতেই কিশোর গ্যাংয়ের ১৫৯টি গ্রুপ রহিয়াছে। ইহার মাত্র দুই দিন পূর্বেই সমকালের শীর্ষ প্রতিবেদনে খুন বৃদ্ধি পাইয়া জনমনে উদ্বেগের কথা প্রকাশ হইয়াছিল। তথায় বলা হইয়াছে, গত তিন মাসে দেশে হত্যার ঘটনায় ৯৩৪টি মামলা হইয়াছে। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১০টির অধিক। চলতি বৎসরের ফেব্রুয়ারি হইতে জুলাই পর্যন্ত হত্যা, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ সাত প্রকার অপরাধে ২১ হাজার ৭৫৬টি মামলা হইয়াছে। তাহার আগের ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল ২১ হাজার ২২৮টি। এই সকল তথ্য জানাইয়াছে পুলিশ সদরদপ্তরের পরিসংখ্যান। তবে মামলার পরিসংখ্যানই অপরাধের পূর্ণ চিত্র নহে। বহু ঘটনা থানায় মামলা পর্যন্ত গড়াইতে পারে না। প্রশ্ন হইতেছে, এত পুলিশ, প্রশাসন, আইন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান থাকিবার পরও হত্যা ও সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে স্থায়ী অগ্রগতি কেন হইতেছে না? আর জনপ্রিতিনিধিগণ কীভাবে দাবি করিতেছেন যে, পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে?

অপরাধ বিশ্লেষকগণ বলিতেছেন, টার্গেট কিলিং, সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত সংঘাত, মাদক, কিশোর গ্যাং, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ, নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পারিবারিক কলহ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে ক্রিয়াশীল। ইহার সঙ্গে যুক্ত হইয়াছে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার, পুলিশের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও মনোবলের সংকট, বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং রাজনীতি ও অপরাধের পারস্পরিক আশ্রয়। জনতার স্বীয় হস্তে আইন তুলিয়া লইবার প্রবণতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করিয়াছে। পুনরায় স্মরণ করাইয়া দিতে হয়, রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব নাগরিকের জীবন রক্ষা করা। কে জানে, সহিংসতার মাত্রা আরও কোথায় উপনীত হইলে স্বীকার করা হইবে– যথেষ্ট সহিংসতা ঘটিতেছে!

আরও পড়ুন

×