শিপইয়ার্ড দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন
সুপারিশ কার্যকর করিতে হইবে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:২৫
| প্রিন্ট সংস্করণ
গত মাসের মাঝামাঝিতে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে ক্ষতিকর গ্যাসের বিষক্রিয়ায় ১০ শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা তদন্তে বিস্ফোরক অধিদপ্তরের বিরুদ্ধে যে দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ও গুরুতর গাফিলতির অভিযোগ উঠিয়াছে, উহা গুরুতর। আমরা জানি, ১৪ আগস্টের ঐ দুর্ঘটনার পর শিল্প মন্ত্রণালয় ও বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের লইয়া পৃথক দুইটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। রবিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বোর্ড উভয় কমিটির প্রতিবেদন গ্রহণ করিয়াছে, যেথায় বলা হইয়াছে– নিয়মানুযায়ী, ভাঙার পূর্বে যে কোনো জাহাজের ট্যাঙ্ক পরীক্ষা করিবার দায়িত্ব সরকারি এই সংস্থাটির হইলেও তাহারা পরীক্ষা না করিয়াই সংশ্লিষ্ট মালিককে সনদ প্রদান করিয়াছিল। তদন্ত প্রতিবেদনে শুধু বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অবহেলার বিষয় উঠিয়া আসে নাই; জাহাজটির মালিক বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতির বিষয়ও দুর্ঘটনার পশ্চাতে প্রধান কারণ হিসাবে চিহ্নিত। জাহাজ কর্তন করা হইতেছিল পর্যাপ্ত শ্রমিকদের জন্য কোনো নিরাপত্তাব্যবস্থা না রাখিয়াই। এই অবস্থায় উক্ত প্রাণহানিকে নিছক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু বলার কোনো অবকাশ নাই, বরং কাঠমোগত হত্যাকাণ্ডের আরেক নিদর্শন।
উল্লেখ্য, জাহাজভাঙা শিল্পে প্রতিষ্ঠালগ্ন হইতেই এহেন হত্যাকাণ্ড ঘটিয়া চলিয়াছে; এক দশক পূর্বে বিশেষত পরিবেশ অধিকার বিষয়ক কতিপয় সংগঠন এবং সংবাদমাধ্যমের ধারাবাহিক তৎপরতায় উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে তথায় কিছু নিয়মনীতির প্রবর্তন করা হইলেও সরকারের তদারকের অভাবে পরিস্থিতি পুনরায় পূর্বের রূপ ধারণ করিয়াছে। এইবারও যদি তদন্ত প্রতিবেদনে বর্ণিত সুপারিশগুলি পূর্বের ন্যায় উপেক্ষা করিয়া যাওয়া হয়, তাহা হইলে দরিদ্র ও অদক্ষ শ্রমজীবীদের জন্য উল্লেকযোগ্য কর্মসংস্থান জোগানদাতা এবং দেশের স্টিল ও রিরোলিং মিলসমূহের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহকারী শিল্প অনিরাপদই থাকিয়া যাইবে।
চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা শিল্পে শুধু বিষাক্ত গ্যাস নিঃসরণেই শ্রমিকের মৃত্যু হইতেছে না; বিস্ফোরণ ও অগ্নিকাণ্ডও তথায় প্রাণহানির কারণ। এই সকল কিছুর জন্য দায়ী মালিকপক্ষ এবং সরকারি বিভিন্ন তদারক সংস্থা।
এমন অভিযোগও রহিয়াছে, বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও অধিকার সংস্থার অব্যাহত তৎপরতার ফলস্বরূপ সকল ইয়ার্ড ইতোমধ্যে গ্রিন ইয়ার্ডে পরিণত হওয়ার কথা থাকিলেও এই ক্ষেত্রে অগ্রগতি খুবই সামান্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দুই বৎসর পূর্বে সীতাকুণ্ডেরই এসএন করপোরেশন নামক শিপইয়ার্ডে ভয়াবহ বিস্ফোরণে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটে, যদিও অন্য একটি ইয়ার্ডের সহিত উক্ত ইয়ার্ডকেও গ্রিন ইয়ার্ডরূপে প্রত্যায়িত করা হইয়াছিল। আমরা চাই, পরীক্ষা ব্যতীত সনদ প্রদানকারী সংশ্লিষ্ট বিস্ফোরক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদিগের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হউক। তৎসহিত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করিয়া বিপজ্জনক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য শিপব্রেকিং ইয়ার্ড কর্তৃপক্ষের দায় নির্ধারণ করিয়া উপযুক্ত শাস্তি ও নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ দিতে হইবে। প্রতিটি জাহাজের স্ক্র্যাপ কর্তনের পূর্বে গ্যাসমুক্ত সনদ প্রদান প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়ন এবং স্বাধীন ও নিরপেক্ষ কোনো সংস্থার মাধ্যমে নিয়মিত নজরদারির ব্যবস্থা করাও জরুরি।
শিপব্রেকিং শিল্পের কর্মপরিবেশ নিরাপদ করিতে আধুনিক সুরক্ষা সামগ্রীর ব্যবহার বাধ্যতামূলক এবং নিয়মিত তদারকি অব্যাহত রাখিতে হইবে। সর্বোপরি, দুই তদন্ত প্রতিবেদনে যে ৪৪টি সুপারিশ করা হইয়াছে; শিপইয়ার্ডের সুরক্ষা ও শ্রমিকের নিরাপত্তায় সেইগুলি আমলে লইবার বিকল্প নাই। তবে সচেতন মহলকেও, বিশেষত পরিবেশকর্মী ও এতদ-সংক্রান্ত বেসরকারি সংস্থাগুলি উক্ত বিষয়ে পূর্বের ন্যায় সোচ্চার না হইলে কোনো পরিবর্তনই সম্ভবপর নহে, ইহাও আমরা মনে করি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়