মন্ত্রীপুত্রের কর মওকুফে পত্র
বন্ধ হউক ক্ষমতার অপব্যবহার
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:১৮
| প্রিন্ট সংস্করণ
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নিকট বিশেষ সুবিধা চাহিয়া স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের আবেদন ঘিরিয়া যেই প্রশ্ন উঠিয়াছে, তাহা উপেক্ষা করিবার কোনো অবকাশ নাই বলিয়া আমরা মনে করি। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, বগুড়ার শিবগঞ্জের বেতগাড়ী মীরবাড়ীতে অবস্থিত রূপসী রাইস অ্যান্ড পুষ্টি মিলস স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, যাহার বর্তমান কর্ণধার প্রতিমন্ত্রীর পুত্র মীর শাকরুল আলম সীমান্ত। পুষ্টিসমৃদ্ধ চাউল, আটা ও বিস্কুট উৎপাদনকারী এই প্রতিষ্ঠান সম্প্রতি কর, ভ্যাট ও অন্যান্য শুল্ক মওকুফের জন্য এনবিআর বরাবর এক আবেদন করিয়াছে। তথায় সংযুক্ত করা হইয়াছে প্রতিমন্ত্রীর ভিজিটিং কার্ড। স্পষ্টত, উক্ত আবেদনটি নিরীহ কোনো আবেদন নহে। উহাতে প্রতিমন্ত্রীর প্রভাবকে ব্যবহার করিয়া রাষ্ট্রীয় সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করা হইয়াছে, যাহা যে কোনো বিচারে গর্হিত কর্ম। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলিয়াছেন, ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক সুবিধার জন্য সরকারি পরিচয় ব্যবহার স্পষ্ট নৈতিক স্খলন এবং রাষ্ট্রীয় নীতির পরিপন্থি। এহেন আচরণ শুধু পদের অবমাননা নহে; বরং উহা স্বার্থের দ্বন্দ্বও তৈয়ার করে। উপরন্তু এনবিআরের সাবেক সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিন বলিয়াছেন, সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১৯ অনুযায়ী কোনো একক প্রতিষ্ঠানকে এই জাতীয় সুবিধা প্রদানের সুযোগ নাই।
প্রতিষ্ঠানটি দাবি করিয়াছে, উৎপাদিত পণ্যের কাঁচামাল বিভিন্ন ভিটামিন ও মিনারেল বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না বলিয়া দেশের ১৪টি কার্নেল উৎপাদনকারী সেইগুলি বর্তমানে প্রিমিক্স বা মিশ্রণ হিসাবে বিদেশ হইতে আমদানি করিতেছে। তৎকারণে প্রতি বৎসর প্রায় ৩০ লক্ষ ডলার বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলিয়া যায়। অন্যদিকে রূপসী রাইস মিলস সম্প্রতি দেশে একমাত্র প্রতিষ্ঠান হিসাবে প্রিমিক্স উৎপাদন কারখানা স্থাপন করায় অন্তত প্রিমিক্স আমদানি বাবদ প্রায় ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা দেশেই থাকিয়া যাইবে। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে প্রিমিক্সের দাম যে রূপসী রাইস মিল উৎপাদিত প্রিমিক্সের তুলনায় সর্বদা বেশি থাকিবে এবং কার্নেল উৎপাদক অন্য ১৪টি প্রতিষ্ঠানও যে সর্বদা রূপসী রাইস মিলেরই প্রিমিক্স ব্যবহার করিবে, তাহারই-বা নিশ্চয়তা কী? সর্বোপরি ২০২২ সালে প্রতিষ্ঠিত যেই প্রতিষ্ঠান ২০২৩ সাল হইতে খাদ্য অধিদপ্তরকে রাইস কার্নেল তথা পুষ্টিসমৃদ্ধ চাউল সরবরাহ করিতেছে এবং অদ্যাবধি সরকারি খাদ্যবান্ধব ও ভিজিডি কর্মসূচিতে এক সহস্রাধিক কার্নেল সরবরাহ করিয়াছে, সেই লাভজনক প্রতিষ্ঠান কেন এই সময়ে আসিয়া কর-শুল্ক মওকুফ প্রার্থনা চাহিতেছে– তাহাও প্রশ্নের জন্ম দিয়াছে। অর্থাৎ মূলত ঐ ক্ষমতার সুবিধাপ্রাপ্তির বিষয়ই এই ক্ষেত্রে মুখ্য উদ্দেশ্যরূপে কাজ করিতেছে– সেই সন্দেহ কেহ পোষণ করিলে তাহাকে দোষ দেওয়া যাইবে না বলিয়া আমরা মনে করি।
ক্ষমতায় থাকিবার অর্থ বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তির অধিকার নহে; বরং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের বিপরীতে উঠিয়া সমষ্টির স্বার্থ রক্ষা– ইহা অস্বীকার করিবার কোনো উপায় নাই। এই মৌলিক কথাটি একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিক ও জনপ্রতিনিধি হিসাবে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীরও অজানা থাকিবার কথা নহে। অতএব, পুত্রের মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে তাঁহার ভিজিটিং কার্ড ব্যবহার করিবার সুযোগ দিয়া প্রতিমন্ত্রী কার্যত একটি অন্যায় কার্যে ইন্ধন দিয়াছেন– এই অভিযোগ তোলাই যায়।
ইহাও উল্লেখ্য, প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম পূর্বেও বিবিধ প্রকারে ক্ষমতার অপব্যবহার, তৎসহিত অন্যান্য বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে সংযুক্ত হইয়াছেন। তাই আমরা প্রত্যাশা করি, তাঁহার পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের কর মওকুফের উক্ত আবেদনকে গ্রাহ্য করিবার কোনো সুযোগ তো নাই-ই; প্রতিমন্ত্রীকে কেন্দ্র করিয়া যেইভাবে একাদিক্রমে বিতর্ক সৃষ্টি হইতেছে, তাহাও সরকারকে আমলে লইতে হইবে। মনে রাখিতে হইবে এই ক্ষেত্রে ছাড় দেওয়া হইলে ভবিষ্যতে মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদিগের ক্ষমতার অপব্যবহারে লাগাম টানিয়া ধরা কঠিন হইতে পারে।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়