ঢাকা শুক্রবার, ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পুলিশ বাহিনীতে নারী

সংখ্যাতেই সকল সংবাদ

সংখ্যাতেই সকল সংবাদ
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:০২

| প্রিন্ট সংস্করণ

বাংলাদেশে নারীর নিরাপত্তা লইয়া উদ্বেগ যখন ক্রমবর্ধমান, তখন নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের রাষ্ট্রীয় প্রধান বাহিনীর নীতিনির্ধারণী স্থানে নারীর উপস্থিতি ক্রমহ্রাসমান। গত শনিবার প্রকাশিত সমকালের ‘পুলিশের শীর্ষ ১০০ কর্মকর্তার মধ্যে একজন নারী’ শিরোনামের প্রতিবেদনে এই দুর্ভাগ্যজনক চিত্রই তুলিয়া ধরা হইয়াছে। প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, পুলিশের একজন মহাপরিদর্শকসহ সর্বোচ্চ তিনটি পদে দায়িত্ব পালন করিতেছেন মোট ১০০ জন। তন্মধ্যে ডিআইজি পদে মাত্র একজন নারী কর্মকর্তা রহিয়াছেন। যে দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি সংখ্যক নারী, সেই দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতে নারীর প্রতিনিধিত্ব ১০ শতাংশেরও কম; ইহা নিছক কাকতালীয় পরিসংখ্যান নহে, বরং রাষ্ট্রের নিরাপত্তা-দর্শনের বৃহৎ ঘাটতি বলিয়া আমরা মনে করি।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে নারী পুলিশের যাত্রা ১৯৭৪ সালে ৭ জন এসআই এবং ৭ জন কনস্টেবল পদে যোগদানের মধ্য দিয়া সূচিত হইয়াছিল। প্রথমে সাদা পোশাকে; দুই বছর পর অর্থাৎ ১৯৭৬ সালে ইউনিফর্মধারী নারী পুলিশের যাত্রার সূচনা। বর্তমানে পুলিশের এক লক্ষ ৯৬ সহস্রাধিক সদস্যের মধ্যে পুরুষ এক লক্ষ ৭৮ সহস্রাধিক এবং নারী ১৭ সহস্র ৯১৩ জন। অর্থাৎ সদস্যদের মধ্যে মাত্র ৯ শতাংশের কিঞ্চিদধিক নারী।

আমরা জানি, বর্তমানে বাংলাদেশ পুলিশের নিয়োগব্যবস্থা আনুষ্ঠানিকভাবে নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য উন্মুক্ত। কনস্টেবল পদেও নারীদের জন্য পৃথক শারীরিক যোগ্যতার মানদণ্ড বিদ্যমান। কিন্তু সুযোগ থাকা এক কথা; সেই সুযোগ লইতে সামাজিকভাবে উৎসাহিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা– এই বিষয়টাই প্রকট হইয়া উঠিয়াছে। অনেক পরিবার কন্যাকে এমন পেশায় প্রেরণে অনিচ্ছুক; যথায় রাত্রে ডিউটি, দূরবর্তী স্থলে পদায়ন ও ঝুঁকি রহিয়াছে, ইহা স্বীকার্য। তবে পুলিশ বাহিনীর কর্মপরিবেশও প্রশ্নের ঊর্ধ্বে নহে। একজন নারী পুলিশ সদস্যকে দায়িত্ব পালন, তৎসহিত সন্তান ও পরিবারের যত্নের দায়িত্বও বহন করিতে হয়। নিরাপদ আবাসন, পৃথক ও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন, শিশুযত্ন, মাতৃত্বকালীন সুবিধা, নিরাপদ যাতায়াত এবং কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকিলে নারীর জন্য এই পেশা দীর্ঘ মেয়াদে কঠিন হইতে কঠিনতর হয়, তাহা বলিবার প্রয়োজন নাই। সেইখানে রাষ্ট্র কতখানি সচেতন, তাহাও বিবেচ্য। নারী পুলিশের সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাইয়াছে, কিন্তু তাহাদের নেতৃত্ব কি বৃদ্ধি পাইতেছে? উপরন্তু এইরূপ হতাশাজনক চিত্রের মধ্যেও উচ্চপদস্থ নারী কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে প্রেরণের ঘটনাও ঘটিতেছে। 

নারী পুলিশ কেন প্রয়োজন, তাহা ব্যাখ্যার খুব বেশি আবশ্যকতা নাই। যে রাষ্ট্রে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা উল্লেখযোগ্য সামাজিক বাস্তবতা, সেই রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থায় নারীর উপস্থিতি অপরিহার্য। অর্থাৎ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণেও নিরাপত্তা কাঠামোর অভ্যন্তরেও নারীর যথেষ্ট উপস্থিতি নিশ্চিতকরণ জরুরি। ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, মানব পাচার, শিশু নির্যাতন কিংবা অন্যান্য স্পর্শকাতর ঘটনায় ভুক্তভোগীরা নিজ জীবনে ঘটিত অভিজ্ঞতা পুরুষ কর্মকর্তা অপেক্ষা নারী পুলিশের নিকট অধিকতর অসংকোচে প্রকাশ করিতে পারে। অর্থাৎ শুধু ক্ষমতায়নের জন্যই নহে; রাষ্ট্রের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও স্বচ্ছ ও শক্তিশালী করিতে হইলেও নারী পুলিশের সংখ্যা অধিক হইতে হইবে। ইহাতে পুলিশের প্রতি জনগণের আস্থা বৃদ্ধি পাইবে। বাংলাদেশের নারী পুলিশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করিতেছেন, যাহারা দেশের ভাবমূর্তি বিশ্বপরিসরে উজ্জ্বল করিতেছেন। তাই নারী পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি করিলে আন্তর্জাতিকভাবেও বাংলাদেশের সুনাম বৃদ্ধি পাইবে। তবে নারী পুলিশকে সিদ্ধান্তের স্থানে উপনীত হইতে না দিলে পরবর্তী ধাপের নারী পুলিশগণ আগ্রহ হারাইবেন। নিয়োগ, পদোন্নতি, প্রশিক্ষণ, নেতৃত্বের সুযোগ, কর্মপরিবেশ– সর্বক্ষেত্রে সমান সুযোগ নিশ্চিত করিতে হইবে। 
 

আরও পড়ুন

×