খুলনার বেসরকারি কলেজ
অধিক শিক্ষকে শিক্ষা নষ্ট!
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৬
খুলনার বেসরকারি কলেজসমূহের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা এবং তজ্জনিত দুরবস্থার যেই চিত্র শনিবার প্রকাশিত সমকালের এক প্রতিবেদনে উঠিয়া আসিয়াছে, তাহা শুধু হতাশাজনক নহে, উদ্বেগজনকও বটে। সমকাল প্রতিবেদক দুই মাস ধরিয়া জেলার ২৮টি বেসরকারি কলেজ ঘুরিয়া দেখিয়াছেন, কলেজগুলির শিক্ষার্থী-শিক্ষকের অনুপাত গড়ে ১:৫, যদিও জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ অনুযায়ী, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আদর্শ অনুপাত ১:৩০। অর্থাৎ শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষকের সংখ্যা শুধু অধিক নহে, অস্বাভাবিকভাবে অধিক। কিন্তু কলেজগুলিতে পাসের হার একেবারে তলানিতে, যাহা যেই কোনো শিক্ষানুরাগীকে হতাশ না করিয়া পারে না।
এমনকি বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য গৃহীত সরকারি মান্থলি পে অর্ডার-এমপিও কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হইবার অন্যতম শর্তরূপে ন্যূনতম যেই পাসের হার দেওয়া হইয়াছে, উক্ত কলেজগুলির পারফরম্যান্স তাহারও নিম্নে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালায় রহিয়াছে– কোনো এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের পাসের হার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার উপরে থাকিতে হয়। কিন্তু কলেজগুলির অধিকাংশই সেই মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হইয়াছে। কোনো কোনো কলেজে যতজন শিক্ষক রহিয়াছেন ততজন শিক্ষার্থীও পাস করেন নাই। এমনকি শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক দিয়াও কলেজগুলি এমপিওভুক্তির শর্ত পূরণ করে নাই। এই যে কলেজগুলির জনবল ও অবকাঠামোর পশ্চাতে বৎসরের পর বৎসর সরকারের বিপুল অর্থ বৃথা ব্যয় হইতেছে, তাহাতে সচেতন মানুষ মাত্রই উদ্বেগ প্রকাশ না করিয়া পারেন না।
যাহা বিস্ময়কর, এমপিওর শর্ত লঙ্ঘন বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়ে সন্তোষজনক জবাব দিতে ব্যর্থ হইলে বা পরপর তিন বৎসর এই ধারা লঙ্ঘিত হইলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানপ্রধান বা দায়ী শিক্ষকদের এমপিও আংশিক বা সম্পূর্ণ স্থগিত বা বাতিল করিবার বিধান থাকিলেও উল্লিখিত কলেজগুলির প্রধানের সহিত কথা বলিয়া প্রতিবেদক এই ধরনের কোনো পদক্ষেপের তথ্য জানিতে পারেন নাই। উপরন্তু উক্ত বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, যশোর শিক্ষা বোর্ড– কোনো কর্তৃপক্ষই সদুত্তর দিতে পারে নাই।
খুলনার সচেতন নাগরিক কমিটির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির সমকালকে বলিয়াছেন, এলাকায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাবে এবং নিয়োগ বাণিজ্যের লক্ষ্যে প্রয়োজনের তুলনায় অধিক কলেজ স্থাপন করা হইয়াছে। তদুপরি সেইখানে ইচ্ছামতো শিক্ষক নিয়োগ এবং এমপিওভুক্ত হইয়াছে। অন্যদিকে কলেজগুলির কমিটিতে রাজনৈতিক নেতাকর্মীর প্রাধান্য থাকায় এই সকল বিষয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করে নাই শিক্ষা বোর্ড। এই সুযোগে এমপিভুক্ত শিক্ষক অনেকে রাজনীতি, ভিন্ন পেশা ও ব্যবসায় সংশ্লিষ্ট হইয়াছেন। এই সকল কিছুরই নেতিবাচক প্রভাব পড়িয়াছে পরীক্ষার ফলে। তবে এই সকল কলেজের অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের পশ্চাতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটি ও শিক্ষকদের রাজনৈতিক পরিচয়ই দায়ী নহে; উহাদের সহিত শিক্ষা বিভাগ ও বোর্ডের অসাধু কর্মকর্তাদিগের অনৈতিক সম্পর্কও এই ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখিয়াছে বলিয়া আমরা মনে করি।
যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান সমকালকে বলিয়াছেন, খুব দ্রুত তাহারা বেসরকারি কলেজগুলির প্রধানদের লইয়া বসিবেন এবং কীভাবে শিক্ষার মান উন্নত করা যায়, সেই চেষ্টা করিবেন। প্রকৃতপক্ষে এহেন বৈঠকের সময় বহু পূর্বেই অতিক্রান্ত। এহেন পরিস্থিতিতে বরং একটি স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত প্রয়োজন, যাহার মাধ্যমে কলেজগুলির দুরবস্থার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন করা যাইবে বলিয়া আমরা মনে করি। তদন্তটা এই জন্যও প্রয়োজন, প্রতিবেদনে শুধু খুলনার বেসরকারি কলেজের দুর্দশার চিত্র তুলিয়া ধরা হইলেও, উহা অল্প-বিস্তর সমগ্র দেশেরই চিত্র। অর্থাৎ বেসরকারি কলেজগুলির পরিচালন ব্যবস্থাকে দ্রুত জবাবদিহির মধ্যে আনয়ন অপরিহার্য। তজ্জন্য প্রয়োজনে প্রচলিত আইন ও এমপিও কাঠামোকে পুনর্বিন্যাস করিতে হইবে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে বেসরকারি কলেজের ভূমিকা অস্বীকারের যদ্রূপ সুযোগ নাই; তদ্রূপ উহাদের পশ্চাতে ব্যয়িত প্রতিটি টাকার সুফল নিশ্চিত করাও জরুরি।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়