ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সমকালীন প্রসঙ্গ

শাসকশ্রেণি কখনও জনগণের মিত্রপক্ষ নয়

শাসকশ্রেণি কখনও জনগণের মিত্রপক্ষ নয়
×

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২৫

বাংলাদেশে এখন এক ধরনের বন্ধ্যত্ব বিরাজ করছে, যেটি মূলত অর্থনৈতিক এবং যার প্রভাব জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও বিলক্ষণ পড়েছে। বন্ধ্যত্ব আগেও ছিল। কিন্তু এত সংগ্রাম এবং অভ্যুত্থানের পরও আমরা বন্ধ্যত্বের প্রকোপ থেকে মুক্তি পাব না। বরঞ্চ তার বিস্তার দেখে হতাশাগ্রস্ত হবো– এটা মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। কিন্তু ঠিক সেটাই ঘটেছে। এই বন্ধ্যত্বের কারণ কী? কারণ নিশ্চয় একাধিক। কিন্তু প্রধান কারণ একটিই, সেটি হলো দেশপ্রেমের অভাব। 

এটা কোনো তত্ত্বকথা নয়; বাস্তবিক সত্য। দেশপ্রেম অর্থ হলো দেশের মানুষের প্রতি ভালোবাসা। যে ভালোবাসা মানুষকে মানুষ রাখে, তার মনুষ্যত্বকে বিকশিত করে তোলে এবং সেই সঙ্গে সম্মিলিত উদ্যোগে ব্রতী করে। একা কেউই কিছু সৃষ্টি করতে পারে না; অন্যের সহযোগিতা ও সমর্থন প্রয়োজন হয়। এই সহযোগিতা ও সমর্থন লাভের সবচেয়ে সুন্দর সহজ ও কার্যকর উপায় হচ্ছে দেশপ্রেম। মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকলে আমরা ঐক্যবদ্ধ হতে পারি; সম্ভব হয় পরস্পরকে উৎসাহিত ও উদ্দীপ্ত করে তোলা; সর্বোপরি একটি সমষ্টিগত স্বপ্নের লালন ও পালনের মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আশাবাদী হওয়া যায়। সমস্যাটা হলো, এই দেশপ্রেম আগে যতটা ছিল এখন ততটা নেই। 

বিদ্যমান বৈরী ব্যবস্থার পরিবর্তনে প্রয়োজন সংঘবদ্ধ আন্দোলন করা। প্রয়োজন জনগণের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে বেগবান, গভীর ও ব্যাপক করা। সরকার বদলে অবস্থার পরিবর্তন হয়নি, হবেও না। সমাজে মৌলিক পরিবর্তন আনা দরকার হবে, যে পরিবর্তনটা আসেনি। আমাদের সমাজ পুরাতন ও জীর্ণ। কিন্তু সে আগের মতোই নিপীড়নকারী ও বৈষম্যমূলক। রাষ্ট্র এই সমাজকে পাহারা দেয় এবং সাধারণ মানুষকে নিপীড়ন করে।

রাষ্ট্র বদলেছে, আবার বদলায়ওনি। কেননা, রাষ্ট্র সেই আগের মতোই নির্যাতন করে। মানুষের অভ্যুত্থান ঘটেছে; যুদ্ধ হয়েছে মুক্তির লক্ষ্যে। কিন্তু সমাজ রয়ে গেছে ঔপনিবেশিক আমলে যে রূপ নিয়ে গড়ে উঠেছিল, সেই রকমই। সাম্রাজ্যবাদ আগেও ছিল, এখনও আছে এবং আমাদের রাষ্ট্র ও শাসকশ্রেণি সাম্রাজ্যবাদের হুকুমবরদার ও তল্পিবাহক বটে। নয়তো দেশের ভূমি, বন্দর, অসম বাণিজ্য চুক্তির প্রশ্নে সরকারি ও বিরোধী দলের নীরব ভূমিকা কেন!

আন্দোলনটি হতে হবে সমগ্র জনগণের। তার অগ্রবাহিনী হিসেবে কাজ করবেন সচেতন মানুষ, যারা দেশপ্রেমিক ও গণতান্ত্রিক, যারা বিশ্বাস করেন– আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক করতে হবে; যে গণতান্ত্রিকতার প্রধান শর্ত নাগরিকদের ভেতর অধিকার ও সুযোগের বৈষম্য দূর করা। এদের একাংশ নিজেরা বিত্তবান শ্রেণির মানুষ হতে পারেন; ক্ষতি নেই। কিন্তু এদের অবশ্যই যেতে হবে শ্রেণিস্বার্থের সংকীর্ণ ও নোংরা সীমানা পার হয়ে সমষ্টিগত স্বার্থের এলাকাতে। স্থির থাকবে লক্ষ্য; প্রচার করতে হবে বক্তব্য; সচেতন করতে হবে মানুষকে এবং সংগঠিত হতে হবে অঙ্গীকার নিয়ে। কাজ চলবে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে; প্রতিটি পেশা, প্রতিষ্ঠান, এমনকি পরিবারের ভেতরেও। কাজটি হবে একই সঙ্গে অন্যায় প্রতিরোধ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার। আর এসব যে আমরা করব, তা কোনো আধ্যাত্মিক সুখ বা নান্দনিক তৃপ্তি লাভের আশায় নয়। নিছক বাঁচার প্রয়োজনে।

শিক্ষা যে খুবই জরুরি একটা বিষয়– এই দেশের মানুষেরা সব সময়েই বলে এসেছি। বিদ্যুৎও যে কম জরুরি নয়– এটা সুদূর অতীতে এমনভাবে আমরা টের পাইনি। না পাবার কারণ ছিল। আমরা অভ্যস্ত ছিলাম না। অভাব ছিল কিন্তু অভাববোধটা ছিল না। কারণ আমরা হারিকেন, কুপি, মোমবাতি ইত্যাদিতে অভ্যস্ত ছিলাম। তার বাইরে যে আলো পাওয়া যাবে, সে নিয়ে জানতাম ঠিকই কিন্তু তাকে প্রাপ্য বলে জ্ঞান করতাম না। এখন করি। এখন বিদ্যুতের খুবই দরকার। কলকারখানার জন্য তো অবশ্যই, প্রতিদিনের জীবনযাপনকে সম্ভব করে তোলার জন্যও বটে।

সেই কত আগে, ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের পর নতুন সমাজ গড়ে তোলার দায়িত্ব যখন সমাজবিপ্লবীরা নিয়েছিলেন তখন তারা বিদ্যুৎকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েছিলেন। বিদ্যুতায়ন ছাড়া যে সামাজিক বিপ্লব সম্ভব করা যাবে– এটা লেনিন বুঝেছিলেন এবং বুঝেছিলেন বলেই নিজের সমাজে তো বটেই, বিশ্বের সর্বত্র সম্মানিত হয়েছিলেন। 

আমাদের দেশে আমরা নানা ধরনের ‘বিপ্লব’ ইতোমধ্যে সম্ভব করে তুলেছি ঠিকই, কিন্তু বিদ্যুৎকে সর্বজনীন করতে পারিনি। পরিহাস করে লোকে বলে– বিদ্যুৎ কখন যায়, সেটা জানা অনেক সহজ; কখন আসে এবং কতক্ষণ থাকে সেটা জানার তুলনায়। বর্তমান সরকার বিরাট এক ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে। তারা গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে, এটাই ছিল প্রত্যাশিত। বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, বিদ্যুতের অভাবে দিন ও রাত্রি সমান হয়ে যাচ্ছে; সমভাবে অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে। 

বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধান যে সহজ নয়, সেটা সবাই বোঝে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আন্তরিকভাবে কতটা কাজ করা হচ্ছে, সেটা টের পায় না। ঘড়ির কাঁটার ছেলেমানুষি আগানো পেছানো, এয়ারকন্ডিশনার বন্ধ রাখার ঘোষণা এবং যথারীতি তা কার্যকর করতে অপারগতা; দোকান, মার্কেট বন্ধ রাখা; এসব টুকিটাকি ব্যবস্থায় লোকে সন্তুষ্ট নয়। তারা বিদ্যুৎ চায়, গ্যাস চায়। কিন্তু চায় যে, সেটা সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারছে না। যে জন্য সরকার মনে হয় বেশ নিশ্চিন্ত আছে। 

ওদিকে কৃষক ফলন ফলিয়েছে, কিন্তু দাম পাচ্ছে না। অথচ দেশে খাদ্যাভাব বিরাজ করছে। যে সবজি-তরকারি উত্তরবঙ্গের কৃষক দেখছে এক কেজির দাম ১০-২০ টাকার বেশি উঠছে না, সেই সবজি-তরকারি ঢাকাতে বিক্রি হচ্ছে ৫০-৬০ টাকা কেজিতে। মাঝখানে দস্যুরা তৎপর। 

আমরা বিদ্যুৎ চাই; নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, সুস্থ ও স্বাভাবিক শিক্ষা চাই; উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য চাই। এসবের ব্যাপারে জনমত গড়ে তোলার কাজে অগ্রগামী হওয়া দেশপ্রেমিক নাগরিক মাত্রেরই অনিবার্য কর্তব্য বটে। কিন্তু সেটা তো একাকী করার উপায় নেই। করতে হবে সুসংগঠিতভাবে, আন্দোলনের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে সময়ক্ষেপণ দুর্দশা বৃদ্ধির প্রতিশ্রুতি ভিন্ন অন্য কিছু নয়। সরকার তো নয়ই, বিরোধী দলের ওপরেও ভরসা রাখার কোনো উপায় নেই। কেননা, তারা একই পক্ষ, জনগণের মিত্রপক্ষ নয় এবং তাদের সব কলহই সম্পত্তির ভাগাভাগি নিয়ে ভ্রাতৃকলহ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আরও পড়ুন

×