ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

সাম্প্রতিক

পাঁচ মাসের মৃত ভ্রূণের প্রশ্ন

পাঁচ মাসের মৃত ভ্রূণের প্রশ্ন
×

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২২

সাভারে এক দম্পতির মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। তাদের পাশে পাওয়া গেছে পাঁচ মাসের মৃত ভ্রূণ। অন্তঃসত্ত্বা নাজমার সঙ্গে ঠিক কী ঘটেছিল– তদন্তসাপেক্ষ। তদন্তের গতি নিয়ে প্রশ্ন নেই। নিহতের বোন শাপলা বেগমের অভিযোগ– নাজমাকে এমনভাবে মারধর ও আঘাত করা হয়েছে যে তাঁর গর্ভের সন্তান প্রসব হয়ে গেছে।

পুলিশের প্রাথমিক বক্তব্যেও ঘটনার কোনো এক পর্যায়ে ভ্রূণটি প্রসব হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মৃত নারীর পাশে তাঁর অনাগত সন্তানের মৃত ভ্রূণ পড়ে থাকার দৃশ্য কি প্রশ্ন তোলে না– সমাজ কতটা সহিংস হলে এমন দৃশ্যও আর বিস্ময়কর হয় না? 

নিহত দম্পতি স্বল্প আয়ের ছিল। একজন পোশাক শ্রমিক, আরেকজন হকার। দুজন মিলে পৃথিবীতে নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন নতুন প্রাণ। অনিরাপদ, অসহায়, অসচ্ছল এই মা-বাবা অনাগত সন্তানের জন্য কোনো নাম রেখেছিলেন কি? আমরা জানি না। নাজমার স্বামীকে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়েছে– প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে পুলিশ। নেপথ্যে কী ঘটনা, জানা যায়নি। সন্দেহাতীতভাবে জানা গেছে শুধু, মানুষ হতে হতে থেমে যাওয়া পাঁচ মাসের ভ্রূণ পড়ে ছিল ঘরে।

২০০২ সালে ভারতের গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময়ের দুটি ঘটনা এখনও আলোচিত হয়। পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলকিস বানুকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর মৃত ভেবে ফেলে গিয়েছিল হামলাকারীরা। পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়েছিল তাঁর চোখের সামনে। এমনকি ৩ বছরের মেয়েকেও। একই দাঙ্গায় নারোদা পাটিয়ায় ৯ মাসের অন্তঃসত্ত্বা কৌসার বানু হত্যার ঘটনা আরও ভয়াবহ। দাঙ্গাকারীরা তরবারি বা ধারালো অস্ত্র দিয়ে কৌসার বানুর পেট কেটে তাঁর গর্ভস্থ ভ্রূণ বের করে মা ও অনাগত সন্তানকে পুড়িয়ে হত্যা করে। 

২০০৭ সালে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম তেহেলকার গোপন ক্যামেরা বা স্টিং অপারেশনে সুরেশ দেদাওয়ালা (রিচার্ড) এবং বজরং দলের বাবু বজরঙ্গী নামের উগ্রপন্থিরা গর্বের সঙ্গে কৌসার বানুর পেট কেটে ভ্রূণ হত্যার কথা স্বীকার করেছিল। ভিডিও ফুটেজটি তখন পুরো বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সহিংসতা যখন উন্মত্ততার পর্যায়ে পৌঁছে যায় তখন নারী, শিশু, এমনকি মায়ের গর্ভের অনাগত সন্তানও রেহাই পায় না– সে প্রমাণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার এসব ঘটনা।

সাভারের ঘটনা কোনো দাঙ্গা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, সহিংসতার মাত্রা নির্ধারণে কি আমাদের দাঙ্গা হতে হবে? ভ্রূণ বেরিয়ে আসার মতো ভয়ংকর সহিংসতাকে কি ব্যক্তিগত বিরোধ বলে কিছুটা প্রশমনের সুযোগ থাকতে পারে কোন সভ্য দেশে? একজন মানুষকে হত্যা করতে দলবদ্ধ উন্মত্ত জনতার প্রয়োজন হয় না। ঘরের ভেতরেও সহিংসতা ঘটতে পারে। সম্পর্কের আড়ালেও ঘটতে পারে।

অর্থনৈতিক বিরোধ, দখল, প্রতিশোধ, রাজনৈতিক প্রভাব, মাদক, পারিবারিক সংঘাত কিংবা নিছক অপরাধপ্রবণতা থেকেও ঘটতে পারে। কারণ যা-ই হোক, যখন মানুষের জীবন নেওয়া ক্রমে সহজ হয়ে যায় এবং অপরাধের পরিণতি অনিশ্চিত থাকে, তখন সমস্যাটি আর বিচ্ছিন্ন অপরাধে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের সক্ষমতার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। দরিদ্র দম্পতির এমন নৃশংস মৃত্যুর ঘটনা সংবাদমাধ্যমেও কি যথেষ্ট গুরুত্ব পেল?

অপরাধবিজ্ঞানে ‘ব্রোকেন উইন্ডো’ নামে বিখ্যাত তত্ত্ব আছে। সেখানে বলা হয়, কোনো ভবনের বাইরে থেকে ছোড়া ঢিলে ভাঙা জানালার কাচ যদি দ্রুত মেরামত করা না হয়, তবে মানুষ অবচেতনে বিশ্বাস করতে শুরু করে– ভবনটির মালিক নেই; এজমালি সম্পদ। ফলে দ্রুতই কেউ ভবনের আরও কয়েকটি জানালা ভেঙে ফেলতে পারে। এরপর ভবনেরই দখল নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। অর্থাৎ জানালার সামান্য কাচ ভাঙাকে আমলে না নেওয়া থেকে শুরু হতে পারে ভবনটির দখলের মতো গুরুতর অঘটন। 

মানুষের ক্ষেত্রেও তাই ঘটে। ছোট ছোট ঘটনা মেনে নেওয়া হয় বলেই আরও বড় সহিংসতার জন্ম হয়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেলস্টেশনে বাক্‌প্রতিবন্ধী বৃদ্ধ ববি বেগম (বুবি) মারা গেলেন করুণভাবে। একাকী ও বৃদ্ধা পরিচ্ছন্নতাকর্মীর জমানো সামান্য কটা টাকাই কাল হয়েছিল। দ্রুতগতিতে তখন কয়েকজনকে ধরেছিল পুলিশ। সেই অভিযুক্তরা এখন কোথায়, আমরা জানি না। ভাসমান বুবির দাফনে ক্ষমতাবানদের উপস্থিতি নিয়েও সংবাদ হয়েছিল। অথচ হত্যার বিচার হলো কিনা, সে খবর আর গুরুত্ব পায়নি। এভাবে সমাজে সহিংসতার স্বাভাবিকীকরণ ঘটতে থাকে। 

জানালার কাচ ভাঙা থেকে পুরো ভবনের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার মতো আমাদের গোটা সমাজও এখন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে। নাড়ি ছেঁড়া আদরের সন্তান জন্মদাত্রী মাথা থেঁতলে দিচ্ছেন। ঘুমন্ত মা-বাবাকে বুকে ছুরি চালিয়ে হত্যা করছে সন্তান। সন্তান খুন হচ্ছে মায়ের পরকীয়ায়। কেমন ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য? বিস্মৃত হওয়া যাবে না– সহনশীল হয়ে গেলে তখন সহিংসতার প্রবণতা আরও বাড়তে থাকে। 

সাভারের মৃত দম্পতি এবং তাদের পাশে পড়ে থাকা মৃত ভ্রূণ সাক্ষ্য দিচ্ছে– দেশের আইন, নাগরিক নিরাপত্তা এবং সামাজিক বিবেক; তিনটিই চূড়ান্তভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে– এসব সহিংসতা কি দাঙ্গার চেয়ে কম?

সাদিয়া মাহ্জাবীন ইমাম: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

আরও পড়ুন

×