ঢাকা সোমবার, ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অর্থনীতি

অনিশ্চয়তার পরিবেশ, আস্থার অপেক্ষা

অনিশ্চয়তার পরিবেশ, আস্থার অপেক্ষা
×

সাহিদ রেজা

প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:২০

মানুষ যখন ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিত হতে পারে না, তখন হাতে টাকা থাকলেও খরচ করতে চায় না। ব্যবসা ভালো চললেও নতুন বিনিয়োগে যেতে চায় না; ব্যাংকে টাকা থাকলেও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন জাগে। চলমান ব্যবস্থার ওপর ভরসা থাকে না। অর্থনীতির ভাষায় এটিই আস্থার সংকট। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বোধহয় এখানেই– আস্থা ফিরছে না কেন?

অর্থনীতির সংখ্যাগুলোও এখন খুব স্বস্তির ছবি দিচ্ছে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। ব্যাংক ঋণের চাহিদা কমছে– এটা একক কোনো সমস্যা নয়। বরং অর্থনীতি দুর্বল হলে ঋণের চাহিদা কমাই স্বাভাবিক। কিন্তু যখন নতুন কারখানা করার পরিকল্পনা পিছিয়ে যায়; বিদ্যমান ব্যবসা সম্প্রসারণ থেমে যায়; মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি কমে এবং উদ্যোক্তা অপেক্ষা করতে থাকেন, তখন বুঝতে হবে– বিষয়টি শুধু ঋণের নয়। এর পেছনে ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এক ধরনের সংশয় কাজ করছে। এই জায়গাটিই গুরুত্বপূর্ণ।

একজন ব্যবসায়ী জানেন, বাজারে মন্দা আসতে পারে; পণ্যের দাম কমতে পারে কিংবা কোনো একটি প্রকল্প প্রত্যাশামতো লাভ নাও দিতে পারে। এসব ঝুঁকি তিনি হিসাব করতে পারেন। কিন্তু আগামীকাল কোন নিয়ম বদলাবে; কোন সিদ্ধান্তে ব্যবসার খরচ বাড়বে কিংবা বাজারের পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে– এসবের কোনো নির্ভরযোগ্য ধারণা না থাকলে সেটি আর শুধু ঝুঁকি থাকে না; হয়ে ওঠে অনিশ্চয়তা। এই অনিশ্চয়তাই বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় শত্রু। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন সেই অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতি যে কিছুটা কমেছে, সেটি অবশ্যই ইতিবাচক। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে নেমেছে। কিন্তু মানুষের বাজারের অভিজ্ঞতা শুধু একটি সংখ্যায় ধরা পড়ে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক পর্যালোচনায়ও দেখা যাচ্ছে, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি বাড়েনি। ফলে প্রকৃত মজুরির ওপর চাপ রয়েছে। 

এ অবস্থায় শুধু সুদের হার বাড়িয়ে বা কমিয়ে মূল্যস্ফীতি ঠেকানোর নীতি কতটা কার্যকর হবে, সেটিও ভাবতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেও বলেছে, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এ ধরনের সরবরাহনির্ভর মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। 

এই চ্যালেঞ্জের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যাংকিং খাত। ব্যাংক শুধু ব্যবসায়ীর ঋণের জায়গা নয়; মানুষের সঞ্চয়ের নিরাপদ আশ্রয়ও এবং আমানতকারীকে প্রকৃত হারে সুদ বা মুনাফা দেবে। ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব বহু দূর যায়। খেলাপি ঋণ বাড়ে; ব্যাংক নতুন ঋণ দিতে সতর্ক হয়; ভালো উদ্যোক্তাও ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন। শেষ পর্যন্ত উৎপাদনশীল ব্যবসা ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ পড়ে।

এখানে দীর্ঘদিনের একটি প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই– ঋণখেলাপির সংস্কৃতি কীভাবে তৈরি হলো এবং কেন তা এত সহজে ভাঙা গেল না? ব্যাংকিং খাতে সংস্কার মানে শুধু দুর্বল ব্যাংককে মূলধন জোগানো নয়। তা হলো ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি বদলানো; ইচ্ছাকৃত খেলাপির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং ব্যাংক পরিচালনায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তি কম নয়। রপ্তানি খাত, প্রবাসী আয়ের শক্ত ভিত্তি, বড় ভোক্তা বাজার, তরুণ জনগোষ্ঠী ও উদ্যোক্তা আছে। সমস্যা হলো, এই শক্তিগুলোকে এখন কতটা স্বস্তিদায়ক পরিবেশ দেওয়া যাচ্ছে না।

ভুলে গেলে চলবে না– আস্থা নিজেই একটি অর্থনৈতিক সম্পদ। আস্থা থাকলে মানুষ ঝুঁকি নেয়। ঝুঁকি নিলে বিনিয়োগ হয়। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং মানুষের আয় বাড়ে। আয় বাড়লে বাজারে চাহিদা তৈরি হয়। অর্থনীতির চাকা ঘোরে এভাবেই।

অন্যদিকে অনিশ্চয়তার চক্র একইভাবে কাজ করে। অনিশ্চয়তায় বিনিয়োগ থামে। বিনিয়োগ থামলে কর্মসংস্থান কমে। আয় কমলে বাজার দুর্বল হয়। বাজার দুর্বল হলে ব্যবসায়ী আরও সতর্ক হন। তখন ব্যাংকও ঋণ দিতে চায় না। অর্থনীতি হয় আরও ধীর।

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সামনে তাই সবচেয়ে জরুরি কাজ এই দ্বিতীয় চক্রের ধাঁধা থেকে বের হওয়া এবং প্রথম চক্র আবার চালু করা। এ জন্য বড় কোনো জাদুর কাঠি দরকার নেই। দরকার বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্ত, ধারাবাহিক নীতি এবং এমন কিছু সংস্কার, যার ফল মানুষ নিজ চোখে দেখতে পায়। বাংলাদেশের চলতি অর্থনীতির সবচেয়ে বড় প্রশ্ন– তাই প্রবৃদ্ধি কত হবে, সেটি একা নয়। প্রশ্ন হলো– মানুষ কি আবার আগামীকালকে বিশ্বাস করতে শুরু করবে? এই বিশ্বাস ফিরিয়ে আনাই এখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার আসল কাজ।

ড. এ কে এম সাহিদ রেজা: সাবেক পরিচালক, এফবিসিসিআই

আরও পড়ুন

×