ঢাকা রোববার, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পরিবহন ভাড়ায় নৈরাজ্য

যাত্রীস্বার্থের সুরক্ষা কাম্য

যাত্রীস্বার্থের সুরক্ষা কাম্য
×

সম্পাদকীয়

প্রকাশ: ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০

| প্রিন্ট সংস্করণ

জ্বালানি তৈলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে সকল প্রকার পরিবহনের ভাড়ায় যেই নৈরাজ্য পরিলক্ষিত হইতেছে, উহা উদ্বেগজনক। শুক্রবার সমকালে প্রকাশিত সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকার নির্ধারিত বর্ধিত ভাড়ার হিসাব আমলে না লইয়া বাসযাত্রীদের নিকট হইতে ইচ্ছানুযায়ী ভাড়া আদায় করা হইতেছে। এমনকি লঞ্চসহ নৌযানগুলিও নির্দেশনা মানিতেছে না। ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও পিকআপের ন্যায় পণ্যবাহী গাড়িতেও লাগামহীন ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠিয়াছে। স্বাভাবিকভাবেই এহেন পরিস্থিতিতে যাত্রীদের দুর্ভোগ অবর্ণনীয় পর্যায়ে পৌঁছিয়াছে। আমরা দেখিয়াছি, সোমবার হইতে সকল প্রকার জ্বালানি তৈলের মূল্য লিটারে ২০ টাকা বৃদ্ধির পরই বাস ও লঞ্চের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করিয়া দিয়াছে। মঙ্গলবার বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১৭ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়। বুধবার প্রতি কিলোমিটারে লঞ্চের ভাড়া ২৩ পয়সা বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উপরন্তু ১০০ কিলোমিটারের অধিক দূরত্বে প্রতি কিলোমিটারের ভাড়া ২০ পয়সা হারে বৃদ্ধি করা হয়। ইহার সহিত নৌপথে যাতায়াতে সর্বনিম্ন ভাড়া ৩২ হইতে ৩ টাকা বৃদ্ধি করিয়া ৩৫ টাকা ধার্য করা হয়। কিন্তু প্রতিটি বাসই আপন আপন ইচ্ছায় ভাড়া আদায় করিতেছে এবং এহেন স্বেচ্ছাচারিতায় যাত্রীদের সহিত বাসচালক এবং উহার সহকারীদের বচসা এক পর্যায়ে হাতাহাতিতে রূপ লইয়াছে। অনুরূপ, লঞ্চের যাত্রীরাও মালিক-কর্মীদের স্বেচ্ছাচারিতার শিকার হইতেছে। 

প্রসঙ্গত, পাঁচ মাস পূর্বে গত এপ্রিলে জ্বালানি তৈলের মূল্য বৃদ্ধি করা হইয়াছিল ১৫ টাকা। তখন বাস ভাড়া কিলোমিটারে ১১ পয়সা বৃদ্ধি করা হয়। তখন বৃদ্ধি পাইয়াছিল ট্রাক ভাড়াও। তখনও চালক-সহকারীরা ইচ্ছানুযায়ী ভাড়া আদায় করিয়াছেন। আমরা দেখিতেছি, সরকার শুধু ভাড়া বৃদ্ধি করিয়াই দায়িত্ব শেষ করিয়াছে। মাঠের তদারকিতে প্রশাসনের উদাসীনতার খেসারত দিতেছেন যাত্রীরা। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের পূর্বে শীঘ্রই জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করিবে না বলিয়া অঙ্গীকার করিয়াছিল। সরকার সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করিতে পারে নাই। পরিবহন ভাড়ার ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যর্থতা জনসাধারণের মধ্যে হতাশার জন্ম দিতেছে। সমকালের প্রতিবেদনে দেখা যাইতেছে, ঢাকাসহ সমগ্র দেশেই ভাড়া লইয়া দুর্ভোগে পড়িয়াছে সর্বস্তরের শিক্ষার্থীরা। মনে রাখিতে হইবে, দেশের সিংহভাগ মানুষ যাতায়াতের ক্ষেত্রে সড়ক পরিবহনের উপর নির্ভরশীল। বিশেষত দক্ষিণাঞ্চলসহ দূরবর্তী বহু অঞ্চলে এখনও চলাচল ও পণ্য পরিবহনের জন্য লঞ্চ ও অন্যান্য নৌযানই ভরসা। যানবাহনের ভাড়ার সহিত কৃষিসহ সকল প্রকার নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যও সংযুক্ত। অর্থাৎ প্রথমে জ্বালানি তৈলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, তাহার পর পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি সামগ্রিক অর্থনীতির বিকাশকেই কেবল হুমকির মুখে ফেলিতেছে না; নাগরিকদের উপর বহুবিধ চাপও সৃষ্টি করিয়াছে। 

সরকার চাহিলে জ্বালানি তৈল আমদানিতে অতিরিক্ত ব্যয় অন্যভাবেও সমন্বয় করিতে পারিত। এতৎসংক্রান্ত সুপারিশমালা ইতোমধ্যে অনেকেই দিয়াছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত সরকার সেই সকল কথায় কর্ণপাত করে নাই। এই পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত পরিবহন ভাড়ায় প্রশাসনের কঠোর নজরদারি থাকিলে ভোক্তাদের মনে কিছুটা হইলেও স্বস্তি মিলিবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ বিআরটিএ, নৌপথ বিআইডব্লিউটিএ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বয়ে সড়ক ও নৌপথে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করিয়া নির্ধারিত ভাড়া অপেক্ষা অধিক অর্থ আদায়কারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা লইতে হইবে। তাহারা নিশ্চিত করিবেন, যাহাতে প্রতিটি বাস, লঞ্চ ও কাউন্টারে সরকার নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা স্পষ্ট করিয়া ঝুলাইয়া রাখা হয়। এই ক্ষেত্রে যাত্রীরাও যেন তালিকার অধিক ভাড়া প্রদান না করে। আমরা মনে করি, সরকারের নির্দেশনা উপেক্ষা করিয়া যাত্রীদের ভোগান্তিতে ফেলা পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলারই প্রমাণ। এই ক্ষেত্রে পরিবহন মালিকদেরও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখিতে হইবে। যাত্রীদের ভোগান্তি নিরসনে বিআরটিএ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পরিবহন মালিক-শ্রমিক সমিতির সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী সংকট হইতে উত্তরণ সম্ভব। 
 

আরও পড়ুন

×