‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বিক্রয়ে বাধা
নিছক মব সন্ত্রাস নহে
সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৭:৩০
| প্রিন্ট সংস্করণ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থ বিক্রয়কে কেন্দ্র করিয়া প্রকাশনা সংস্থা দ্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) বাংলাবাজার বিক্রয়কেন্দ্রে সোমবার কতিপয় যুবক যেই মব সন্ত্রাস চালাইয়াছে, উহা যথেষ্ট উদ্বেগজনক। সমকালসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উক্ত যুবকগণ ইউপিএলের বাংলাবাজারের বিক্রয়কেন্দ্রে গিয়া ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থকে ‘নিষিদ্ধ’ দাবি করিয়া তাহা বিক্রয় করিতে বাধা দেয়। এমনকি এক পর্যায়ে সেইখানে হট্টগোলের মাধ্যমে লোকজন জড়ো করিয়া বিক্রয়কেন্দ্রে তালা লাগাইয়া দেয় এবং প্রতিষ্ঠানটির দুই কর্মীকে জোরপূর্বক নিকটস্থ পুলিশ ফাঁড়িতে সোপর্দ করে। যদিও ফাঁড়ি হইতে তাহারা শেষ পর্যন্ত ছাড়া পাইয়াছেন।
ঘটনাটিকে বিচ্ছিন্ন ভাবিবার সুযোগ নাই। ইহা নিছক বইয়ের প্রকাশনা ও বিপণনে বেআইনিভাবে বাধাদান নহে; জ্ঞানচর্চা ও সংস্কৃতির সার্বিক বিকাশের জন্যও ক্ষতিকর।
‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ একদিকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতার জীবনের উল্লেখযোগ্য অংশ তুলিয়া ধরিয়াছে; অন্যদিকে এই জাতির ইতিহাসের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অংশকেও চিত্রিত করিয়াছে। বিশেষত বাংলাদেশের জন্ম যেই মুক্তিযুদ্ধে, সেই মহান ঘটনার প্রেক্ষাপট পাওয়া যায় এই গ্রন্থে। ফলে গ্রন্থটির ঐতিহাসিক মূল্য অপরিসীম। বঙ্গবন্ধুর বহু সমালোচকও ইহার গুরুত্ব স্বীকার করেন। যেই কারণে এক দশকেরও অধিক সময় পূর্বে প্রকাশিত হওয়ার পরপরই গ্রন্থটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়; ইতোমধ্যে বহুল পঠিতও বটে। এমন একটি গ্রন্থ বিক্রয়ে বাধাদান তাই নিছক মব সন্ত্রাস নহে।
ইহা সত্য, অতীতে বিভিন্ন সরকারের সময় বহু গ্রন্থ প্রকাশ ও বিক্রয়ে নানা ওজর-আপত্তি তুলিয়া নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হইয়াছে। উহার প্রভাব আলোচ্য ঘটনায় থাকিতে পারে। তবে ইহাও স্বীকার করিতে হইবে, সেই সকল নিষেধাজ্ঞা ছিল রাষ্ট্রের তরফ হইতে। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্বেচ্ছাচারিতা নহে। উপরন্তু বিশেষত আদালতের হস্তক্ষেপে অনেক ক্ষেত্রেই সেই নিষেধাজ্ঞাসমূহ শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকে নাই। বস্তুত ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হইতে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেই মব সন্ত্রাস প্রায় মহামারির রূপ পরিগ্রহ করিয়াছে, আলোচ্য ঘটনা উহা হইতে বিচ্ছিন্ন নহে।
আমরা দেখিয়াছি, একটি বিশেষ মহল এহেন সহিংসতার মাধ্যমে তাহাদের অপছন্দের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনধারাকে দমন ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করিয়া চলিয়াছে। ইহার শিকার শুধু গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীই হন নাই, বহু সংস্কৃতিকর্মী এবং নারীও ধারাবাহিকভাবে অনুরূপ আক্রমণের শিকার হইয়াছেন। বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বটেই; ইসলাম ধর্মভুক্ত সুফিবাদী ও মাজারপন্থিগণও এই সহিংসতা হইতে রেহাই পান নাই। ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাসভবন, সমগ্র দেশে তাঁহার ভাস্কর্য-ম্যুরালের সহিত মুক্তিযুদ্ধের স্মারক স্থাপনা ধ্বংস ও গুঁড়াইয়া দিবার ঘটনাবলি একই ন্যক্কারজনক প্রক্রিয়ার অংশ। অন্যদিকে অনির্বাচিত অন্তর্বর্তী সরকার যদ্রূপ মব সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে শূন্য-সহিষ্ণুতার ঘোষণা দিয়াও কার্যত নীরব থাকিয়াছে কিংবা ক্ষেত্রবিশেষ উস্কানি ও উৎসাহ দিয়াছে, তদ্রূপ বর্তমান নির্বাচিত সরকারও এহেন আইনবিরোধী তৎপরতা বন্ধে প্রতিশ্রুতি অদ্যাবধি কার্যকর করিতে পারে নাই। এই অবস্থায় ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ নিষিদ্ধ দাবি করিয়া বিক্রয় বন্ধের আলোচ্য তৎপরতা বিস্ময়কর নহে।
বর্তমান সরকারকে বুঝিতে হইবে, মব সন্ত্রাস রাষ্ট্র ও সমাজকে চূড়ান্ত আইনের শাসনহীনতার মধ্যে নিমজ্জিত করিতেছে না শুধু; দেশকে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিকভাবেও সর্বগ্রাসী সংকটের দিকে ধাবিত করিতেছে। তাই তাহাকে অবিলম্বে আইন স্বীয় হস্তে তুলিয়া লইবার যেই কোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে কঠোর হওয়ার পাশাপাশি মুক্তচিন্তা ও বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতার পরিসরে অনুরূপ হস্তক্ষেপ প্রতিহত করিতে হইবে। সর্বস্তরের গণতান্ত্রিক ও শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকেও বুঝিতে হইবে, উক্ত বিষয়ে সোচ্চার না থাকিলে শুধু সংবিধানস্বীকৃত চিন্তা ও মতপ্রকাশের অধিকার ক্ষুণ্ন হইবে না; সমাজে সাংস্কৃতিক বন্ধ্যত্বও নামিয়া আসিবে। উপরন্তু মব সন্ত্রাস কেবল আওয়ামী লীগসংশ্লিষ্ট বিষয়াদিতেই সীমিত থাকিবে না।
- বিষয় :
- সম্পাদকীয়