ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

দিবস

ইয়াসমিনদের নিয়তি!

ইয়াসমিনদের নিয়তি!
×

সুদীপ্ত সাইফুল

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০২১ | ১২:০০

দিনাজপুরের কিশোরী ইয়াসমিন। ১৯৯৫ সালের ২৪ আগস্ট তাকে ধর্ষণের পর হত্যা করেছিল কয়েক পুলিশ সদস্য। এর প্রতিবাদে শুরু হয় গণবিক্ষোভ। ধর্ষক ও খুনিদের বিচার দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেয় দিনাজপুরের সর্বস্তরের মানুষ। সেই বিক্ষোভ থামাতেও গুলি চালানো হয়। আর তাতে প্রাণ হারান কয়েকজন নিরীহ মানুষ। এতে বিক্ষোভের বিস্ম্ফোরণ দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ইয়াসমিন হত্যারহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে সোচ্চার হয় বিবেকসম্পন্ন জনতা। তীব্র আন্দোলনের মুখে ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে মামলা হয়। ১৯৯৭ সালের ৩১ আগস্ট ওই মামলার রায় হয় এবং ২০০৪ সালে তা কার্যকর করা হয়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যকর হওয়া ছিল একটি বিরল ঘটনা। কারণ, এর আগে এ ধরনের মামলায় তেমন বিচার লক্ষ্য করা যায়নি। কিশোরী ইয়াসমিন হত্যাকাণ্ডের এ দিনকে আমরা তখন থেকে 'জাতীয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ' দিবস হিসেবে পালন করে আসছি। দিবসটির মূল লক্ষ্য ঐক্যবদ্ধভাবে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ করা। কিন্তু নারী নির্যাতন প্রতিরোধে সেই ঐক্যবদ্ধতার জায়গা থেকে আমরা অনেক দূর সরে এসেছি বলে নানা উপায়ে নারী নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। শিশু, কিশোরী, যুবতী যে বয়সের হোক না কেন, নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন ঘরে-বাইরে নিত্যই।
কলেজছাত্রী তনু, মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত ও স্বামীর সঙ্গে সিলেট এমসি কলেজে ঘুরতে গিয়ে পাশবিক নির্যাতনের শিকার সেই নারীর কথা আমাদের জানা। এই লেখা যখন লিখছি তখন দৃষ্টি পড়ল সমকালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে। প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করায় চলতি বছর ৯ জানুয়ারি রাজধানীর কামরাঙ্গীরচরে ১৪ বছরের এক কিশোরীর ওপর সংঘবদ্ধ পাশবিকতা চালায় পাঁচ বখাটে। তারা ওই কিশোরীকে 'খারাপ মেয়ে' বলে প্রচার করে। লোকলজ্জার ভয়ে ভুক্তভোগী কিশোরী একাধিকবার আত্মহননের চেষ্টা চালায়। অন্য এলাকায় বাসা নিতে বাধ্য হয় তার পরিবার। অন্যদিকে, আসামিরা জামিনে ছাড়া পেয়ে সদর্পে ঘুরছে এলাকায়। মামলা তুলে নিতে হুমকি দিচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারকে। এসব ঘটনা নারীর নিরাপত্তা বিষয়ে আমাদের যথেষ্ট উদ্বিগ্ন করে তোলে।
সাম্প্রতিককালের নারী নির্যাতনের ঘটনাগুলোতে একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ধর্ষণ, নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের শিকার নারীর চরিত্র হননের চেষ্টা করা হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয় নির্যাতনের ছবি কিংবা ভিডিও। এতে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারকে বইতে হয় সামাজিক গ্লানি। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী বিচার পান না; থানা মামলা নিতে চায় না। কোনোক্রমে মামলা হলে নানা ধরনের হুমকি ও প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয় ভুক্তভোগীকে। এ ছাড়া বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতার কারণে অনেকের পক্ষে রায় প্রত্যক্ষ করা সম্ভব হয় না। বিচার না পেয়ে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেন।
আমাদের দেশে নারীরা যেমন বাইরে নির্যাতনের শিকার হন, তেমনি ঘরেও নির্যাতনের বলি হন অনেকে। করোনাকালে পারিবারিক নির্যাতন অনেকাংশে বেড়ে গেছে বলে বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। মূলত নারী নির্যাতন প্রতিরোধ, তার সুরক্ষা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিতকরণের বিষয় আমাদের মননে এখনও অনুপস্থিত। এখনও সমাজে অনেকে নারী নির্যাতনকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে। ফলে নারী নির্যাতনের এই কালো অধ্যায় আরও দীর্ঘ হচ্ছে। আমাদের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। তাদের অনেকেই আবার দেশের নেতৃস্থানীয় পর্যায়ে অবস্থান করছেন। আর অধিকাংশ নারী নিজেদের অরক্ষিত ও অনিরাপদ মনে করছেন। এভাবে কিছু মানুষকে অরক্ষিত রেখে দেশের টেকসই অগ্রগতি আসতে পারে না। দেশের অগ্রগতির জন্য সব মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অপরিহার্য দায়িত্ব।
বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন করছে। এই সময়ে বৈশ্বিক নানা সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল। তবে, এই ৫০ বছরে রাষ্ট্র নারীকে কতটুকু সুরক্ষা দিতে পেরেছে- তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে আমরা নারীর অগ্রগতিও দেখতে চাই। এই অগ্রগতি হোক সম্মান, আস্থা ও নিরাপত্তার দিক থেকে।
সাংবাদিক
[email protected]

আরও পড়ুন

×