ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

সামনে ফ্রান্স, স্পেনের হুংকার

সামনে ফ্রান্স, স্পেনের হুংকার
×

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২৪

বেলজিয়ামের সোনালি প্রজন্মের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়ে বিশ্বকাপের শেষ চারে যখন পা রাখল স্পেন, তখনই ডালাসের ফ্লাইটের টিকিট মূল্য বেড়ে তিন গুণ। এলএ থেকে যে ভাড়া আমেরিকানরা তিনশ থেকে সাড়ে তিনশ ডলারের মধ্যে দেখে অভ্যস্ত, এখন ডালাসে আসতে সেই টিকিট ইউরোপিয়ানদের কিনতে হচ্ছে আটশ থেকে হাজার ডলারে! তাতেও আগ্রহ কমছে না অনেকের। কারণ, মঙ্গলবারের ম্যাচটি যে বিশ্বকাপের হাতে পাওয়া চাঁদ! ইউরোপের দুই পরাশক্তির সাম্রাজ্য ও সম্মান রক্ষার লড়াই। লস অ্যাঞ্জেলেসের রাত ফুরানোর আগেই তা রূপ নিয়েছে এক মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধক্ষেত্রে।

এরই মধ্যে বেলজিয়ামকে হারানোর পর মিডিয়ার সামনে এসে লামিনে ইয়ামাল বলেই দিয়েছেন, ‘ফ্রান্স যদি কাউকে ভয় পেয়ে থাকে, তবে সেটি আমাদেরই পাওয়া উচিত।’ আসলে গত তিন বছরে তিনবার কিলিয়ান এমবাপ্পেদের মুখোমুখি হয়েছিল স্পেন, যার দুটিতেই জয় পেয়েছে তারা। তাই এই দম্ভ কেবল মুখের কথা নয়, এ হলো স্প্যানিশ আর্মাডার তারুণ্যের এক স্পর্ধিত ইশতেহার। একপাশে কিলিয়ান এমবাপ্পের ফরাসি নীল শিবিরের আক্রমণাত্মক ফুটবল, অন্যপাশে ইয়ামাল- পেদ্রিদের মায়াবী পাসিং ফুটবলের শৈল্পিক থ্রিলার। বিশ্বকাপের শেষ চারে ইউরোপের এ দুই ফুটবলীয় সাম্রাজ্যের মহাদ্বৈরথ ঘিরে বিশ্বজুড়ে চড়ছে পারদ।

ম্যাচটি ঘিরে শুধু সমর্থক নয়, স্পেন কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তেও বেশ উত্তেজিত। বেলজিয়াম ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে তিনি প্রতিপক্ষের শক্তিমত্তা স্বীকার করে বলেন, ফ্রান্সের মতো দলের বিরুদ্ধে সেমিফাইনাল ম্যাচটি অত্যন্ত কঠিন ও শারীরিক শক্তির পরীক্ষা হবে। ‘আমরা খুব ভালো করেই জানি, প্রতিপক্ষ কতটা শক্তিশালী; কিন্তু আমাদের এই স্পষ্ট বিশ্বাসও রয়েছে যে আমরা ফ্রান্সকে হারাতে সক্ষম।’ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে যেদিন স্পেন কেপ ভার্দের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করেছিল, সেদিনও অভয় দিয়েছিলেন তিনি, ‘এই (স্পেন) দল যে কোনো পরিস্থিতিতেই নির্ভরযোগ্য। আমরা অসাধারণ নির্ভরযোগ্য এক দল, যারা টানা ৩২ ম্যাচ অপরাজিত আছি।’ অপরাজেয় সেই সংখ্যাটিই বেলজিয়ামকে হারিয়ে রেকর্ড স্পর্শ করেছে ৩৬-এ ।

২০০৭ থেকে ২০০৯ সালের সেই জাভি-ইনিয়েস্তাদের সোনালি প্রজন্মের ৩৫ ম্যাচের মহিমান্বিত কীর্তিকে পেছনে ফেলে দিয়েছে এই দল। শুধু তাই নয়; মেসিদের রেকর্ডও স্পর্শ করেছে তারা। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার টানা ৩৬ ম্যাচ অপরাজিত থাকার রেকর্ড ছিল। এই ছত্রিশ ম্যাচের মধ্যে ২৭টি জয় আর ৯টি ড্রয়ের এক অটল সাম্রাজ্য। আর মাত্র একটা ম্যাচ হার না মেনে পার করতে পারলেই রবার্তো মানচিনির ইতালির গড়া ৩৭ ম্যাচের সেই এভারেস্টসম বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করবে স্পেন। ডালাসে সেই অপেক্ষাতেই আছে তারা। কেপ ভার্দের সঙ্গে ওই ড্র করার পর গ্রুপ পর্বে সৌদি আরব, উরুগুয়েকে হারিয়েছেন রুইজ-মেরিনোরা। নকআউটে এসে তিন ইউরোপিয়ান দলের সঙ্গে নিজেদের শক্তির পরীক্ষা দিয়েছে স্পেন। অস্ট্রিয়া, পর্তুগালের পর বেলজিয়ামকে বিদায় করেছে। অন্যদিকে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের ফ্রান্স কিন্তু শুরু থেকেই জেট গতিতে। সেনেগাল, ইরাক আর নরওয়ে– গ্রুপ পর্বে সব দলের বিপক্ষেই তিনের বেশি গোল দিয়ে হারিয়েছে তারা। নকআউটে এসে সুইডেন, প্যারাগুয়ে আর মরক্কোকে বাড়ি পাঠিয়েছে। এর মধ্যে কেবল প্যারাগুয়ের বিপক্ষেই ১-০ গোলে কিছুটা বিরক্ত ও অস্বস্তিতে ছিল তারা।

ফ্রান্স চলতি টুর্নামেন্টে এখন পর্যন্ত ১৬টি গোল করে সবচেয়ে বেশি গোলদাতা দল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে, যার মধ্যে অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পেই করেছেন ৮টি গোল। বিপরীতে স্পেনের রক্ষণভাগ এবারের আসরে ইস্পাতকঠিন দৃঢ়তা দেখিয়েছে। গত ৬টি ম্যাচে তারা মাত্র ১টি গোল হজম করেছে। ফলে এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের ফরাসি আক্রমণভাগকে রুখতে স্পেনের রক্ষণভাগকে তাদের সেরা পরীক্ষাটিই দিতে হবে। 

দুই দলের সাম্প্রতিক লড়াইয়ের ইতিহাস স্পেনের পক্ষে কথা বলছে। দুই বছর আগে উয়েফা ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনালে ফ্রান্সকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়েছে স্পেন, যেখানে তরুণ তুর্কি লামিনে ইয়ামাল ঐতিহাসিক এক গোল করেছিলেন। এমনকি গত বছরের উয়েফা নেশনস লিগের সেমিফাইনালে জার্মানির স্টুটগার্টে ফ্রান্সকে ৫-৪ গোলের এক রোমাঞ্চকর ম্যাচে পরাজিত করে স্প্যানিশরা। টানা দুটি বড় টুর্নামেন্টের সেমিফাইনাল থেকে বিদায় নেওয়ার তিক্ত স্মৃতি এখনও তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে ফরাসিদের। ফলে এই ম্যাচটি দিদিয়ের দেশমের ফ্রান্স দলের জন্য কেবল ফাইনালে যাওয়ার লড়াই নয়, বরং স্পেনের ওপর প্রতিশোধ নেওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ। সব মিলিয়ে ডালাসের সেমিফাইনালটি বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা ম্যাচ হওয়ার সব উপাদান নিয়ে অপেক্ষা করছে। ইতিহাসের পাতায় স্পেনের আধিপত্য থাকলেও বিশ্বকাপের মঞ্চে ফ্রান্সের অভিজ্ঞতা যে কোনো সময় ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।

আরও পড়ুন

×