ঢাকা রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬

বুলফাইটের চতুর ম্যাটাডোর ইয়ামাল

বুলফাইটের চতুর ম্যাটাডোর ইয়ামাল
×

ছবি- এএফপি

সঞ্জয় সাহা পিয়াল, কানসাস সিটি থেকে

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬ | ০৯:২২

স্পেনের মাদ্রিদ বা সেভিয়ার ধুলো ওড়ানো উঠোনে আজও ‘বুলফাইট’ চলে, যেখানে লাল কাপড় হাতে ক্ষিপ্ত ষাঁড়ের মুখোমুখি দাঁড়ান দুঃসাহসীরা। নিয়ম বলে, আঠারো হলেই স্পেনে পেশাদার খুনে ম্যাটাডোর হওয়া যায়। সেখানে ইয়ামাল কাল পা রাখবেন উনিশে। অথচ এখনই তাঁর মধ্যে রক্ত গরম করা স্পর্ধা, স্পেনের সেই রক্তলাল জার্সিটা যখন জড়ায়, মুহূর্তের মধ্যে তাঁর চোখের মণি বদলে যায়। বেলজিয়ামের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে ইয়ামালের এই আশ্চর্য রূপান্তরটাই চমকে দিয়েছে ফুটবল বিশ্বকে। বেলজিয়ামের একেকটা দীর্ঘকায়, ক্ষ্যাপাটে ডিফেন্ডার যখনই পাহাড়ের মতো তেড়ে এসেছে, উনিশ ছুঁইছুঁই ম্যাটাডোর তখন শান্ত, অবিচল। তিনি কেবল তাঁর বাঁ পায়ের জাদুতে ড্রিবলিংয়ের এক মায়াবী ‘লাল কাপড়’ মেলে ধরল চোখের সামনে। শরীরী দোলা আর ক্ষিপ্রতা আর চতুরতায় বেলজিয়াম ডিফেন্সকে বারবার বোকা বানিয়ে, গোললাইন চিরে বের করে এনেছেন একের পর এক সুযোগ। ঠিক সেই বুলফাইটের ম্যাটাডোরের মতোই।

অনেকে হয়তো গোলদাতার নামের পাশে ইয়ামালকে খুঁজবেন। ফুটবল রোমান্টিকরা জানেন, গোল না করেও কীভাবে একটা আস্ত ম্যাচ পকেটে পুরে নেওয়া যায়। গোল করেননি, কিন্তু প্রতিপক্ষের রক্ষণকে যেভাবে নাচিয়ে ছারখার করলেন, তাতে ম্যাচসেরার ট্রফিটা অন্য কারও হাতে ওঠা বোধহয় অবিচারই হতো। বেলজিয়ামের বক্সে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ১২ বার বল নিয়ে আক্রমণে গিয়েছেন, গোলমুখে সবচেয়ে বেশি ছয়টি শট নিয়েছেন, সবচেয়ে বেশি চারবার ড্রিবল করেছেন, ১৬টি গ্রাউন্ড ডুয়েলে প্রতিপক্ষের সঙ্গে সফল হয়েছেন ৯টিতে। পরিসংখ্যানের এই হিসাবই বলে দিচ্ছে ম্যাচে কতটা দাপুটে ছিলেন তিনি। ম্যাচের তিরিশ মিনিটে প্রথম গোলটার জন্মলগ্নে ডানপ্রান্ত দিয়ে পেড্রো পোরোর সঙ্গে ওয়ান-টু-ওয়ানের যে রাজকীয় বিল্ড-আপ আক্রমণ বুনেছিলেন ইয়ামাল তাতেই তো কুপোকাত বেলজিয়াম। সেখান থেকে বল পেয়ে দানি ওলমোর নেওয়া শটটা থিবো কোর্তোয়া ফিরিয়ে দিলেও শেষ রক্ষা হয়নি, রিবাউন্ড থেকে ফাবিয়ান রুইস যখন বল জালে জড়াচ্ছেন, বেলজিয়াম ডিফেন্স তখন কেবল হাঁপাচ্ছে।

গল্পের শেষ অঙ্কটাতেও ছিলেন ইয়ামাল। ঘড়ির কাঁটায় যখন আটাশি মিনিট, ম্যাচ যখন টাইব্রেকারের দিকে এগোচ্ছে, আবারও সেই ডানপ্রান্তে শুরু হলো ইয়ামালের পায়ের জাদু। তাঁর একক আক্রমণ আর চিলতে ড্রিবলিংয়ের তীব্রতা বেলজিয়ামের রক্ষণভাগকে তাসের ঘরের মতো এলোমেলো করে দেয়। ডি-বক্সের ভেতর তৈরি হওয়া সেই চরম জটলা আর বিভ্রান্তির সুযোগ লুফে নিয়ে মিকেল মেরিনো যখন জয়সূচক গোলটি নিশ্চিত করছেন তখন পুরো লস অ্যাঞ্জেলেস ১৮ বছরের এক বিস্ময় বালকের পায়ের জাদুতে নতজানু! পুরো নব্বই মিনিট ধরে ডানপ্রান্তটাকে যিনি নিজের ব্যক্তিগত সাম্রাজ্য বানিয়ে বেলজিয়াম ডিফেন্ডারদের ঘোরের মধ্যে রাখলেন, স্পেনকে সেমিফাইনালে তোলার পর তাঁর হাতে ম্যাচসেরার ট্রফিটা ওঠা তো প্রকৃতির পরম বিচার। ডি বক্সের সামনে বারবার তাঁর নড়াচড়াই বেলজিয়ামকে উত্তেজিত করেছে ঠিক সেই ক্ষ্যাপাটে ষাঁড়ের মতোই! 

অথচ এই ইয়ামালই ম্যাচের পর কত শান্ত। মিক্সড জোনে সংবাদমাধ্যমের মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালে এই ছেলেটিকেই দেখে মনে হয় পাড়ার কোনো উচ্ছল কিশোর। দু লাইন কথা বলতে গেলেই লজ্জা পেয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে। তবে যখনই সেমিতে ফ্রান্সের কথা সামনে আসে তখনই আবার এক পোড়খাওয়া লড়াকু তিনি! সোজা চিবুক তুলে ক্যামেরার সামনে ছুড়ে দিলেন এক রক্ত গরম করা স্পর্ধা–‘ফ্রান্স যদি কাউকে ভয় পেয়ে থাকে, তবে সেটা আমাদেরই পাওয়া উচিত। ওদের আমরা আগেও টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে দিয়েছি, দুই দুবার হারিয়েছি। সত্যি বলতে, আমার মনে হয় আমরাই এই বিশ্বকাপের সেরা দুটি দল। মাঠে কী ঘটে তা দেখাই যাবে, তবে আমাদের মনে কোনো ভয় নেই।’

এই হুঙ্কার শুধু কথার কথা নয়, এর পেছনে রয়েছে এক অদম্য জেদ। বেলজিয়াম ম্যাচে গোল না পেয়েও ম্যাচসেরার ট্রফিটা পকেটে পোরা ম্যাটাডোর খুব ভালো করেই জানেন, ফরাসি ডিফেন্সও তাঁর বাঁ পায়ের ড্রিবলিংয়ের ওই মায়াবী ‘লাল কাপড়’ দেখে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে ছুটে আসবে। কোয়ার্টার ফাইনালে ছকটা কাটা শেষ, এবার বিশ্বকাপের শেষ অঙ্কে যাওয়ার পালা। স্প্যানিশ ম্যাটাডোর ইয়ামালের শেষ বাক্যটাই যেন পুরো ফরাসি শিবিরকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট –‘আমরা এখানে অনেক দিন ধরে আছি, আর খালি হাতে ফিরতে আসিনি। ফাইনাল পর্যন্ত এখানেই টিকে থাকতে চাই।’ এমবাপ্পেরা শুনছেন তো? স্পেনের এই নতুন ম্যাটাডোর কিন্তু এবার খাঁচায় বন্দি করতে চলেছেন ফরাসি নীল ষাঁড়কে!

আরও পড়ুন

×