ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ

মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর তোড়জোড় কমছে

মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর তোড়জোড় কমছে
×

বুধবার রাত ৮টায় বেরোবির মূল ফটক থেকে বিক্ষোভ মিছিল শুরু হয়। মিছিলে ‘ভাইভার নামে প্রহসন চলবে না, চলবে না’, ‘দিকে দিকে খবর দে, ভাইভা কোটার খবর দে’সহ বিভিন্ন স্লোগান দেন। ছবি: সমকাল

সমকাল প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০২:৪৩ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০২:৪৬

সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে মৌখিক পরীক্ষার (ভাইভা) নম্বর বাড়ানো এবং লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমানোর প্রস্তাবিত বিধিমালা এখনও যাচাই-বাছাই (ভেটিং) করতে পাঠায়নি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। প্রশাসনিক উন্নয়ন-সংক্রান্ত সচিব কমিটি অনুমোদিত বিধিমালাটি বুধবার আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিংয়ে পাঠানোর কথা ছিল। চাকরিপ্রত্যাশীদের বিক্ষোভ এবং বিরোধী দলগুলোর সমালোচনার কারণে সরকার এ বিষয়ে ধীরে চলার নীতি নিয়েছে বলে জানা গেছে। 

প্রস্তাবিত বিধিমালার প্রতিবাদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গতকালও বিক্ষোভ হয়েছে। ছাত্র সংগঠনের নেতারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। ছাত্রদলের নেতারাও সামাজিক মাধ্যমে এই বিধিমালার সমালোচনা করছেন। 
গত রোববার সচিব কমিটি ১১ থেকে ২০ গ্রেডের চাকরিতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ৪০০ শতাংশ বৃদ্ধি এবং লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমাতে পরীক্ষার মানবণ্টন (বিশেষ বিধান) বিধিমালা, ২০২৬-এর খসড়া অনুমোদন করে, যা সামনে আসার পর থেকে সমালোচিত হচ্ছে। 

অভিযোগ করা হচ্ছে, পছন্দের প্রার্থী কম নম্বর পেয়ে লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে ভাইভায় বেশি নম্বর দিয়ে চাকরি দেওয়া হবে। এতে দলীয়করণ এবং দুর্নীতির পথ তৈরি হবে। বিরোধী দল একই অভিযোগ সংসদে তুলেছে। 

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করেছে সরকার। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী বুধবার সাংবাদিকদের বলেন, এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। কাউকে সুবিধা দিতে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না। সব ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসি) পরিবর্তে আগের মতো ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়ে গত মাসে সমালোচনার মুখে পড়েছিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তীব্র বিতর্কের পর সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে সরকার। ভাইভার নম্বর বৃদ্ধি এবং লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর বিধিমালা চূড়ান্ত অনুমোদনের গতি ধীর হলেও শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নিশ্চিত নয়। 

বিভিন্ন ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানিয়েছেন, ভাইভার নম্বর বাড়ানো এবং লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানোর বিধিমালার প্রতিবাদে বুধবার মানববন্ধন করেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় শিক্ষার্থী সংসদ (জকসু)। এ সময় ভিপি রিয়াজুল ইসলাম বলেন, দলীয়করণের ঘৃণ্য পাঁয়তারা শুরু করেছে সরকার। ভাইভায় নম্বর বাড়ানো মূলত দুর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার কৌশল। অবিলম্বে এমন অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত বাতিল করতে হবে।

এজিএস মাসুদ রানা বলেন, সরকারি চাকরিতে লিখিত পরীক্ষায় পাস নম্বর কমানো এবং ভাইভায় নম্বর বাড়ানো কোটার নব্যরূপ। 

জাতীয় ছাত্রশক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহীন মিয়া বলেন, সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতারণা। তা বন্ধ না করলে আগের ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো পরিণতি ভোগ করতে হবে।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীরা গতকাল বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন। এ সময় বিভিন্ন স্লোগান দেন তারা। 

লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী সাইফুল ইসলাম বলেন, চব্বিশের শহীদ ও আহতদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে সরকার আবারও বৈষম্যের পথ বেছে নিয়েছে। ফার্মাসি বিভাগের শিক্ষার্থী নাইম ভূঁইয়া বলেন, ভাইভায় ১০ শতাংশের বেশি নম্বর রাখা যাবে না। 

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি জানান, ‎নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে দলীয়করণ, ঘুষ বাণিজ্য ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরির অভিযোগে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। গতকাল রাত ৮টায় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ‎মিছিল শেষে সমাবেশে বক্তব্য দেন বিভিন্ন বিভাগের সাধারণ শিক্ষার্থী ও সংগঠনের নেতারা। 

ছাত্রনেতাদের প্রতিবাদ

ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্রশক্তি, ছাত্র ফেডারেশন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের নেতারা মৌখিক পরীক্ষার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের প্রতিবাদ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, মৌখিক পরীক্ষায় বেশি নম্বর থাকলে তদবিরের মাধ্যমে দলীয় প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়ার সুযোগ থাকবে। 

জাতীয় ছাত্রশক্তির আহ্বায়ক আবু বাকের মজুমদার বলেন, নির্বাচনের সময় বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাদের বলতে শুনেছি– ‘লিখিত পরীক্ষায় পাস করলে ভাইভায় সাহায্য করা হবে।’ 

ছাত্র ফেডারেশন ঢাবি সংসদের আহ্বায়ক সৈকত আরিফ বলেন, অভিজ্ঞতায় দেখেছি, ভাইভায় নানাভাবে নিজের পছন্দের প্রার্থীদের বেশি নম্বর দেওয়ার সুযোগ থাকে। সরকার কী কী পদক্ষেপ নিচ্ছে, তা পরিষ্কার করা দরকার। 

সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের একাংশের আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক বলেন, অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ ও পছন্দের প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। 

ছাত্রদল নেতারা প্রকাশ্যে বক্তব্য না দিলেও কবি জসীম উদ্‌দীন হলের আহ্বায়ক তানভীর বারী হামিম ফেসবুকে লিখেছেন, দেশের পুরোনো অপসংস্কৃতির কারণে জনমনে প্রশ্ন ওঠা অনেকটাই স্বাভাবিক। মৌখিক পরীক্ষায় নম্বর বৃদ্ধির যথাযথতা নিয়ে ও বাস্তবতা জাতির সামনে তুলে ধরা অথবা বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য অনুরোধ করব।

আরও পড়ুন

×