ঢাকা বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ে সাড়ে ১৩ হাজার মামলা

শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়ে সাড়ে ১৩ হাজার মামলা
×

 সাব্বির নেওয়াজ

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ০৮:৫৮ | আপডেট: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১০:৫১

| প্রিন্ট সংস্করণ

বরগুনার আমতলী উপজেলার কলাগাছিয়া হরিন্দ্রাবাড়িয়া একতা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. আজিজ নেছারী আগামী ৩১ ডিসেম্বর চাকরি থেকে অবসরে যাবেন। কিন্তু গত ১৩ মে থেকে তিনি বিদ্যালয়ে ঢুকতে পারছেন না ‘মবের’ ভয়ে। তাঁর বেতন-ভাতাও বন্ধ। বিদ্যালয়ে কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে পরিচালনা কমিটিতে বিরোধের এক পর্যায়ে তাঁকে অপসারণ করে কনিষ্ঠ একজনকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক করা হয়েছে। আজিজ নেছারী প্রতিকার চেয়ে বরগুনার আদালতে মামলা করেছেন।

শুধু বরগুনায়ই নয়, সারাদেশে শিক্ষা প্রশাসনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মামলাজট। বিভিন্ন আদালতে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট মামলা আছে সাড়ে ১৩ হাজার। এ দুই মন্ত্রণালয় এবং তাদের অধীন দপ্তর, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মামলা ঝুলে থাকায় শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি গঠন, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে ব্যাহত হচ্ছে। 

মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, চলমান মামলার প্রায় ৩০ শতাংশ হয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর। মামলার কারণে বেসরকারি শত শত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশাসনিক অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। কোথাও একাধিক কমিটি, কোথাও আবার নিয়মিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান না থাকায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ কার্যত স্থবির হয়ে আছে। অধিকাংশ মামলাই স্কুল-কলেজের অ্যাডহক কমিটি বাতিল বা নতুন কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে। 

মন্ত্রণালয়গুলোর অধীন তিনটি বিভাগ, ১৬টি দপ্তর, ১১টি শিক্ষা বোর্ড এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় মিলিয়ে বর্তমানে ১৩ হাজার ৭৮টি মামলা বিচারাধীন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট মামলা ১০ হাজার ১৫২টি। এর মধ্যে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের বিরুদ্ধে আট হাজার ৮৯৩টি এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের বিরুদ্ধে এক হাজার ১৫৯টি মামলা রয়েছে।

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট মামলা রয়েছে তিন হাজার ৪২৬টি। এর মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের (ডিপিই) বিরুদ্ধে মামলা তিন হাজার ২৮২টি। কর্মকর্তারা বলছেন, এসব মামলার কারণে বহু প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, কমিটি অনুমোদন, এমনকি নিয়মিত বেতন-ভাতা প্রদানের কাজও বিলম্বিত হচ্ছে।

শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সমকালকে বলেন, শিক্ষার দুই মন্ত্রণালয়-সংশ্লিষ্ট প্রায় সাড়ে ১৩ হাজার মামলা দেশের বিভিন্ন আদালতে বিচারাধীন। এসব মামলার কারণে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রশাসনিক কাজও ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য তাদের পক্ষ থেকে প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আইন শাখা থেকে জানা গেছে, কমিটি গঠন নিয়ে দ্বন্দ্ব, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রভাব ও মামলার কারণে বরিশাল বিভাগে পাঁচ শতাধিক বিদ্যালয়ে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এ ব্যাপারে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক মো. রফিকুল ইসলাম খান সমকালকে বলেন, ‘স্কুল কমিটিতে কে আসবে, কে আসতে পারবে না, তা নিয়েই বিরোধ শুরু হয়। এমনও দৃষ্টান্ত রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবে যারা স্কুলের প্রকৃত প্রতিষ্ঠাতা ও দাতা, তাদেরও বাদ দেওয়া হচ্ছে। প্রায়ই স্বার্থান্বেষী মহল প্রধান শিক্ষকের সহযোগিতায় গোপনে কমিটি গঠন করে। এতে ক্ষতি হচ্ছে শিক্ষাব্যবস্থার। প্রধান শিক্ষক মামলা চালাতে গিয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা করতে পারছেন না।’

১০৮ ধরনের বিষয়ে মামলা
শিক্ষা প্রশাসনের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সারাদেশে মোট ১০৮টি বিষয়ে মামলা হচ্ছে। এর মধ্যে ২৫ থেকে ৩০ ধরনের বিষয়ে মামলার কারণে নিয়মিত আদালতে যেতে হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি মামলা হচ্ছে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, জ্যেষ্ঠতা, গ্রেডেশন, এমপিও, বেতন-ভাতা, বিভাগীয় শাস্তি, চাকরিচ্যুতি, জাতীয়করণ, কোটা, ভর্তি, পেনশন, অডিট আপত্তি, শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত এবং পাবলিক পরীক্ষা-সংক্রান্ত বিষয়ে। শুধু নিয়োগ প্রক্রিয়াতেই ১২ ধরনের ত্রুটি নিয়ে মামলা হচ্ছে। স্কুল-কলেজের পরিচালনা কমিটি নিয়ে রয়েছে ১৮ ধরনের মামলা।

মামলার কারণে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাড়ে ৩২ হাজার শিক্ষকের পদোন্নতি আটকে ছিল প্রায় ছয় বছর। সম্প্রতি এর নিষ্পত্তি হলেও অন্য নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট মামলার কারণে শিক্ষক সংকট বাড়ছে এবং প্রশাসনিক কাঠামো অচল হয়ে পড়ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, মাধ্যমিক স্তরে বিজ্ঞান ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণে পরিচালিত সেসিপ প্রকল্পের কয়েকশ শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে আদালতে মামলার কারণে কাজ চালাতে পারছেন না। ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া এই শিক্ষকদের চাকরি স্থায়ীকরণ ও নিয়োগ বৈধতা নিয়ে মামলা চলায় তাদের অনেককে বিদ্যালয়ে পাঠানো যাচ্ছে না। এতে দেশের শত শত বিদ্যালয়ে কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞানাগারের যন্ত্রপাতি ব্যবহার হচ্ছে না। সেগুলো তালাবদ্ধ অবস্থায় পড়ে রয়েছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীন সবচেয়ে বেশি মামলা রয়েছে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরে (মাউশি)। পাঁচ হাজার ৮৩১টি মামলা আছে মাউশি-সংশ্লিষ্ট, যা বিভাগটির মোট মামলার প্রায় ৬৮ শতাংশ। এসব মামলার বেশির ভাগ শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, এমপিও, ইনসিটু, ওএসডি, গভর্নিং বডি গঠন, বেতন বিল, জাল কাগজে এমপিও এবং শিক্ষার্থী ভর্তি-সংক্রান্ত।

শিক্ষা বোর্ডেও মামলার চাপ
দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্ট বিচারাধীন মামলা এক হাজার ৬৬৩টি। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে এক হাজার ৫৫২টি, আর কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে রয়েছে ১১১টি মামলা।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড-সংশ্লিষ্ট মামলা ২৭৩টি। মামলার সংখ্যার দিক থেকে এর পর রয়েছে কুমিল্লা ২৬৩, রাজশাহী ২০৯, দিনাজপুর ১৮৩, ময়মনসিংহ ১৬৩ ও সিলেট শিক্ষা বোর্ডে ৬৯টি।

আইন কর্মকর্তারা জানান, শিক্ষা বোর্ডগুলোর প্রায় ৭১ শতাংশ মামলা ব্যবস্থাপনা কমিটি, পরীক্ষার ফল পুনর্নিরীক্ষণ, গভর্নিং বডি ও বিভিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে।

দুর্বল আইনি ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে জট
দুই মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরগুলো মামলার জন্য প্যানেল আইনজীবী নিয়োগ দিলেও অভিজ্ঞ আইনজীবীর অভাব রয়েছে। সরকারের নির্ধারিত ফি কম হওয়ায় দক্ষ আইনজীবীদের আগ্রহ কম।

বর্তমানে ফি কাঠামো অনুযায়ী, আরজি বা জবাব প্রস্তুতের জন্য ২০ হাজার টাকা, চূড়ান্ত শুনানির জন্য ২০ হাজার টাকা এবং আইনি মতামতের জন্য তিন হাজার টাকা দেওয়া হয়। প্যানেল আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ নাফিউল ইসলাম বলেন, সরকারি মামলায় যে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তা অত্যন্ত কম। দায়িত্ববোধ থেকেই অনেক আইনজীবী মামলা পরিচালনা করছেন।

সমন্বয়ের অভাবেও ধীরগতি হয় বলে জানা গেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক সমকালকে বলেন, শিক্ষা-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রায় প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও মামলা হচ্ছে। প্রায় সব ক্ষেত্রে শিক্ষা সচিবকে বিবাদী করা হয়। ফলে আমাদের মামলায় লড়তে হচ্ছে। অথচ নিষ্পত্তির গতি কম। 

সিদ্ধান্ত পরিবর্তন হয় বারবার
নিম্ন মাধ্যমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডি ও ম্যানেজিং কমিটি প্রবিধানমালা-২০২৪ -এ গত বছরের ২৮ ও ৩১ আগস্ট সংশোধনী আনে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড। কমিটির সভাপতি মনোনয়ন-সংক্রান্ত ১৩(১) বিধি এবং যোগ্যতা-সংক্রান্ত বিধিতে সংশোধনী আনা হয়। 

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্কুল-কলেজের ম্যানেজিং কমিটিকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন সুপারিশ করেছিল। সেই সুপারিশে ম্যানেজিং কমিটিতে সরকারি চাকরিজীবীদের রাখার কথা বলা হয়। তখন সরকার বিধিমালায় সংশোধন এনে সিদ্ধান্ত দেয়, সরকারি, আধাসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান কর্মরত নবম গ্রেডের নিচে নন এমন কর্মকর্তা এবং অবসরপ্রাপ্ত হলে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তা সভাপতি হতে পারবেন। অর্থাৎ, বেসরকারি এসব প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি সরকারি কর্মচারী ছাড়া কেউ হতে পারবেন না। এই সংশোধিত বিধি চ্যালেঞ্জ করে এমরান হোসেন নামে একজনসহ চারটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অ্যাডহক কমিটির সভাপতি উচ্চ আদালতে রিট মামলা করেন। 

আরও পড়ুন

×