সমকাল এক্সপ্লেইনার
দেবদাস: যেভাবে পর্দার আড়ালে হৃদয়স্পর্শী হয় বাস্তবের প্রেমকাহিনি
দেবদাস সিনেমার একাধিক দৃশ্যে ঐশ্বরিয়া রায় ও শাহরুখ খান। ছবি: সংগৃহীত
সাদিকুর রহমান
প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০২৫ | ১৫:৩০ | আপডেট: ২৫ জুলাই ২০২৫ | ১৮:৪১
এই জুলাইয়ে ২৩ বছর পূর্ণ করল সঞ্জয় লীলা বানসালির সিনেমা দেবদাস (২০০২)। হৃদয়স্পর্শী ও দৃষ্টিনন্দন এই চলচ্চিত্র হিন্দি সিনেমার জগতে যোগ করেছিল ভিন্ন মাত্রা। শরৎ চন্দ্রের বইয়ের গল্প ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে সিনেমার শুটিংয়ের সময় জন্ম নিয়েছিল আরেক বিরহ কাহিনি। যেখানে বাস্তবের পার্বতী আর দেবদাস হয়ে ধরা দিয়েছিলেন ঐশ্বরিয়া ও সালমান খান।
দেবদাসের গল্প বহুবার রূপালী পর্দায় উঠে এসেছে। কিন্তু বানসালির দেবদাস কেবল আরেকটি রিমেক ছিল না, তাঁকে লড়তে হয়েছিল বিমল রায়ের ১৯৫৫ সালের কালজয়ী ক্লাসিক ও দিলীপ কুমারের ঐতিহাসিক দেবদাসের সঙ্গে। ২০০২ সালের দেবদাসে শাহরুখ খান যেন নিজের সমস্ত আবেগ ঢেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু আপনি কি জানেন—সেই সিনেমার সঙ্গে সালমান খানও যুক্ত ছিলেন? ঠিক যেন বাস্তবের এক 'দেবদাস' হয়ে সিনেমার সেটে ঘোরাঘুরি করতেন তিনি। সিনেমার সেটে সালমান-ঐশ্বরিয়ার গল্প; পর্দায় শাহরুখ-ঐশ্বরিয়ার রসায়নের মতোই মনোমুগ্ধকর।
যেভাবে শুরু
বানসালি তাঁর আগের সিনেমা ‘হাম দিল দে চুকে সনম (১৯৯৯)’ এর মাধ্যমে সমালোচক ও বাণিজ্যিক—দুই দিকেই সাফল্য পেয়েছিলেন। তবে তিনি অনেক দিন ধরেই ‘দেবদাস’ নতুন করে নির্মাণের ভাবনায় মগ্ন ছিলেন। তিনি এটিকে এমন এক অসাধারণ রূপ দিতে চেয়েছিলেন, যা ভারতীয় সিনেমায় আগে কখনও দেখা যায়নি। দেবদাস চরিত্রের জন্য তাঁর মাথায় ছিল মাত্র একটি নাম—শাহরুখ খান। ছবির জন্য যে রাজকীয় ভব্যতার কল্পনা বানসালি করেছিলেন, তা বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল শুধু বলিউডের সবচেয়ে বড় তারকার মাধ্যমে।
‘দিলওয়ালে দুলহানিয়া লে জায়েঙ্গে’, ‘দিল তো পাগল হ্যায়’ এবং ‘কুছ কুছ হোতা হ্যায়’–এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমায় আধুনিক ও স্টাইলিশ প্রেমিক চরিত্রে অভিনয় করে শাহরুখ খান তখন সুপারস্টার। তাঁকে সঞ্জয় লীলা বানসালি যখন প্রথমবার দুর্ভাগ্যগ্রস্ত ও মদ্যপ দেবদাস চরিত্রটি অফার করেন, তখন শাহরুখ সরাসরি না বলে দেন। শাহরুখ বলেছিলেন, ‘না, সে (দেবদাস) তো এক হেরে যাওয়া মানুষ, একজন মদ্যপ। আমি দেবদাসের মতো নই, আমি অনেক বেশি কুল।’ জবাবে বানসালি বলেন, ‘তোমাকে কাস্ট করতে না পারলে আমি এই ছবি বানাবোই না। কারণ তোমার চোখে আমি দেবদাসকে দেখি।’ তখন শাহরুখ বলেন, ‘ঠিক আছে, তুমি যদি আমার মতো চোখ আর খুঁজে না পাও, তাহলে আমি ছবিটা করব।’

এই আলাপের পর বানসালি প্রায় এক বছর অপেক্ষা করেন। এ সময় তিনি অন্য কাউকে খুঁজেছেন বিষয়টা এমন নয়। এক বছর পর বানসালি-শাহরুখের বৈঠকটি শেষমেষ চুক্তিতে গড়ায়।
একের পর এক ‘টুইস্ট’
দেবদাস সিনেমার প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার পর বানসালি জানতে পারেন কে চোপড়া নামে এক প্রযোজক আগে থেকেই এই শিরোনামের সিনেমার স্বত্ব নিয়ে রেখেছেন। তিনি স্বত্ব ছাড়তেও রাজি না। পরে সিনেমার নাম ‘আজ কা দেবদাস’ রাখার কথা চিন্তা করেন বানসালি। তবে শেষ পর্যন্ত মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কে চোপড়া স্বত্ব ছাড়তে রাজি হন।
শুটিং শুরু হয় ২০০০ সালের নভেম্বরে। এরপর একের পর এক আরও সমস্যা দেখা দেয়। সেটে একটি দুর্ঘটনায় এক টেকনিশিয়ান প্রাণ হারান। যা নিয়ে পরে মিডিয়ায় ব্যাপক শোরগোল হয়। আরও বড় সমস্যা দেখা দেয় ২০০১ সালের জানুয়ারিতে। সিনেমাটির প্রযোজক ও অর্থায়নকারী ভারত শাহকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে মুম্বাইয়ের অপরাধ চক্রের প্রধান দাউদ ইব্রাহিমের মুখপাত্র ছোটা শাকিলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ আনা হয়। ফলাফল, ১৫ দিনের জন্য স্থগিত থাকে শুটিং।
লেখক ও সাংবাদিক অনুপমা চোপড়া তাঁর বই ‘কিং অব বলিউড: শাহরুখ খান অ্যান্ড দ্য সিডাক্টিভ ওয়ার্ল্ড অব ইন্ডিয়ান সিনেমা’তে লিখেছেন, ক্ষতি মেনে নিয়ে সিনেমাটির কাজ বন্ধ করে দেওয়াটাই তখন সহজ সমাধান ছিল। কিন্তু ভারত শাহ ও সঞ্জয় লীলা বানসালি উভয়ই কাজ শেষের ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। কারাগারে থেকেও ভারত শাহ তাঁর সন্তানদের সিনেমাটি নিয়ে কাজ করার নির্দেশ দেন।
টুইস্ট এখানেই শেষ নয়। সিনেমাটির প্রতিদিনের শুটিংয়ের জন্য দরকার ছিল ৭ লাখ টাকা। কিন্তু পর্যাপ্ত অর্থের ঘাটতির কারণে বানসালি ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে থেকে ধার নিতে বাধ্য হন। তখনকার গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারিশ্রমিক না পাওয়ায় মাধুরী দীক্ষিতসহ কিছু অভিনেতা ও কারিগরি দলের সদস্য শুটিং চালিয়ে যেতে অস্বীকৃতি জানান।
সালমান যেভাবে দেবদাস হলেন
সালমান খান ও ঐশ্বরিয়ার মধ্যে প্রেমের সূচনা হয়েছিল ‘হাম দিল দে চুকে সনম’ এর সেটে। তখন এটি ছিল বলিউডের সবচেয়ে আলোচিত প্রেমকাহিনিগুলোর একটি। কিন্তু দেবদাস সিনেমার শুটিং শুরুর পর তাদের প্রেমে ভাটা বা বিরহ দেখা দেয়। অনুপমা চোপড়া তাঁর বইয়ে লিখেছেন, ‘সালমান বাস্তব জীবনের দেবদাস হয়ে উঠেছিলেন। তিনি প্রেম বাঁচাতে গিয়ে নিজের ধ্বংস ডেকে আনছিলেন। দেবদাসের সেটে তাঁর ঘোরাঘুরি ছিল ক্রু দলের সদস্যদের মতো। প্রায়ই তিনি সেটের ফ্লোরে মদ্যপ অবস্থায় রাত কাটাতেন।’
সালমানের নিয়মিত উপস্থিতি সিনেমার সেটে একটি অপ্রত্যাশিত ক্যামিওর জন্ম দেয়। যেমন, সিনেমার একটি দৃশ্যে পার্বতীর (ঐশ্বরিয়া) পায়ে একটি কাঁটা বিঁধে। দেবদাসের (শাহরুখ) ভূমিকা ছিল কোন ব্যাথ্যা না দিয়ে কাঁটাটি বের করা। এ দৃশ্যের নির্দেশনা দিতে এগিয়ে আসেন এক বুক কষ্ট নিয়ে সিনেমার সেটে ঘোরাঘুরি করা সালমান।

অনুপমা চোপড়া লিখেছেন, ‘সালমান তখন সেটে ছিলেন। তিনি স্বেচ্ছায় দেখাতে চেয়েছিলেন যে দৃশ্যটি কীভাবে করা উচিত। তাতে শাহরুখও রাজি হন। সালমান যখন কাঁটা বের করা দেখাচ্ছিলেন পরিচালক তখন ক্যামেরা চালু করে দেন। এটি ছিল এক বেদনাবিধুর মুহূর্ত; যেখানে এক ক্লান্ত, বিষণ্ন প্রেমিক যেন তাঁর নিজের জীবনের কাহিনি পর্দায় ফুটিয়ে তুলছে। সালমানের এমন কাণ্ড দেখে ঐশ্বরিয়া কেঁদে ফেলেন। এটাই ছিল তাদের একসঙ্গে শেষবার ক্যামেরাবন্দী হওয়ার মুহূর্ত।’
সালমানের বাস্তব জীবনে দেবদাস হওয়ার চিহ্নও আছে সিনেমার একটি অংশে। ঐশ্বরিয়ার পা থেকে কাঁটা বের করার যে ক্লোজ শট, সেখানে হাতের অংশটি শাহরুখের ছিল না। মহড়ার সময় সালমান খানের দেখানো নির্দেশনার অংশটিই পরিচালক ওই ক্লোজ শটে ব্যবহার করেছেন। যা আজও দেবদাস সিনেমায় সালমান-ঐশ্বরিয়ার প্রেমের চিহ্ন হিসেবে থেকে গেছে।
(ভারতীয় সাংবাদিক ইয়াসির উসমানের মূল লেখা ‘দ্য মেকিং অব দেবদাস: হাউ সালমান খান স্পেন্ডিং নাইটস অন সেট অব ঐশ্বরিয়া রায়’স ফিল্ম লেড টু অ্যা ক্যামিও’ অবলম্বনে। প্রকাশ হয়েছে এনডিটিভি ডটকমে।)
