ফিরে দেখা ২৪
চুপ করে বসে থাকেননি থিয়েটারকর্মীরা
ছবি-সংগৃহীত
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন এক অনন্য সাহসিকতার দিন। রাজপথে যখন সাধারণ মানুষের কণ্ঠরোধের চেষ্টা চলে, তখন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের কর্মীরা চুপ করে বসে থাকেননি। তারা রাজপথে নেমে প্রমাণ করেছিলেন নাটক, গান, কবিতা শুধু বিনোদন নয়, প্রতিবাদের ভাষাও হতে পারে। বিশেষ করে থিয়েটার জগতের শিল্পীরা ছিলেন সরব ও অগ্রণী।
গত বছরের ১৯ জুলাই ‘বিক্ষুব্ধ থিয়েটারকর্মীগণ’-এর ব্যানারে শত শত মঞ্চকর্মী একত্র হয়ে সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান নেন। তারা শাসক বাহিনীর চোখ রাঙানি উপেক্ষা করে নামেন রাজপথে। পুলিশি হয়রানি, বাধা, এমনকি হেনস্তার মুখে পড়েও তারা রাজপথ ছাড়েননি। তারা সেদিন শুধু একক শিল্পী নন; বরং একেকজন প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। থিয়েটারকর্মী মোহাম্মদ আলী হায়দার, সামিনা লুৎফা নিত্রা, কাজী রোখসানা রুমা, তৌফিকুল ইমন, নাহিদ স্মৃতি, সাজ্জাদ, বাকার বকুলসহ অনেকেই সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
মোহাম্মদ আলী হায়দার বলেন, ‘‘আমরা ‘বিক্ষুব্ধ থিয়েটরকর্মীগণ’-এর ব্যানারে গত বছরের ১৯ জুলই জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে দাঁড়িয়েছিলাম। দৃশ্যমাধ্যম সমাজের সঙ্গে আন্দোলন করছি। তখন সরকারের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অনেকেই আন্দোলনে নামেননি। থিয়েটারের অনেক সিনিয়র কর্মী ফোন করে আমাদের কর্মসূচি করতে নিষেধ করেছিলেন। পুলিশের কাছ থেকেও অনেক হুমকি-ধমকি পেয়েছি। আমাদের ওপর হামলাও হয়েছে। অনেকেই আহত হয়েছেন। কেউই নিরাপদ ছিলাম না। অনেকে অত্যাচার-নির্যাতনের ছবি তুলেছিলেন। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আওয়ামী লীগের কিছু কর্মী মোবাইল থেকে তা মুছে দিয়েছে। তখন মনে হয়েছিল যেভাবে মানুষগুলোকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে, তা মেনে নেওয়া যায় না। এটি তো আমার ওপরেও হতে পারে। ভেবেছি, সময়ের ডাকে তো সাড়া দিতেই হবে। তখন আমাদের ভয়ডর কিছুই কাজ করেনি। আজ যদি আন্দোলন সফল না হতো আমাদের এখন জেলে থাকতে হতো।”
তিনি আরও বলেন, ‘ইনক্লুসিভ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যেই আন্দোলনটা ছিল। বৈষম্য নিয়ে একটি ব্যাপার ছিল। এখন যারা ক্ষমতায় বসেছেন, তাদের অনেকেই আন্দোলনে ছিলেন না। অনেকেই দেশের বাইরে ছিলেন। আন্দোলনের যে উদ্দেশ্য ছিল– সরকারের কোনো কিছুর সঙ্গে কানেকশন নাই। মব সন্ত্রাস, নারী নির্যাতন, মাজার ভাঙাসহ অনেক কিছু হয়েছে। সরকার এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিতে উদাসীন। জুলাইয়ের যে স্পিরিট ছিল, এই সরকার তা নষ্ট করেছে।’
সামিনা লুৎফা নিত্রা বলেন, ‘নাটক তো মানুষের কথা বলা, জনগণের মনের ভাষা। তাই যখন দেখি মানুষের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে, তখন আর মঞ্চে থেমে থাকা যায় না। সেদিন আমাদের সামনে গার্ড ছিল, ব্যারিকেড ছিল, কিন্তু আমরা জানতাম, আমরা ইতিহাসের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছি। জুলাই আন্দোলন নিয়ে অনেক নাটক হয়েছে। নাটকের সংলাপ, আবহ, আলো সবকিছুতেই ছিল বিদ্রোহী স্পন্দন। দর্শকের প্রতিক্রিয়া প্রমাণ করেছে এই নাটকগুলো সময়ের দাবিই পূরণ করেছে।’
তরুণ নির্দেশক তৌফিকুল ইমনের ভাষ্য, ‘আমরা যদি থিয়েটারকে শুধু বিনোদন হিসেবে দেখি, তাহলে আমাদের অস্তিত্বের দায় এড়িয়ে যাওয়া হয়। থিয়েটার কর্মীদের আন্দোলন ছিল সময়ের প্রতিবাদ। নাট্যকর্মীরা সবসময়ই প্রমাণ করেছে, তারা কেবল মঞ্চের শিল্পী নয়, রাজপথের সৈনিকও বটে। আজ এক বছর পর যখন আমরা ফিরে তাকাই, দেখি সেদিন রাজপথে যারা ছিল, তারা কেবল প্রতিবাদ করেনি, একটি সংস্কৃতি রচনা করেছিল।’
এদিকে মনসুন রেভল্যুশন স্পিরিটকে উপজীব্য করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে বিশেষ নাট্য আয়োজন করা হয় রাজধানীর বিভিন্ন মঞ্চে।
লায়লা আজাদ নূপুরের নির্দেশনায় ‘রি-রিভোল্ট’, দীপক সুমনের নির্দেশনায় ‘শুভঙ্কর হাত ধরতে চেয়েছিল’, শাকিল আহমেদ সনেটের নির্দেশনায় ‘দেয়াল জানে সব’, ইরা আহমেদের নির্দেশনায় ‘দ্রোহের রক্তকদম’, লাহুল মিয়ার নির্দেশনায় ‘৪০৪: নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি’, সাইদুর রহমান লিপনের নির্দেশনায় ‘অ্যানিম্যাল ফার্ম’, খন্দকার রাকিবুল হকের নির্দেশনায় ‘আর কত দিন’, ইলিয়াস নবী ফয়সালের নির্দেশনায় ‘অগ্নি শ্রাবণ’, ধীমান চন্দ্র বর্মণের নির্দেশনায় ‘মুখোমুখি’, আজাদ আবুল কালামের নির্দেশনায় ‘নিয়ম ও ব্যতিক্রম’, কাজী নওশাবার নির্দেশনায় ‘আগুনী’ নাটকে জুলাই আন্দোলনের নানা বিষয় উঠে এসেছে।
থিয়েটারকর্মী বাকার বকুল বলেন, ‘এই সময়টাতে থিয়েটার যেন নতুন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। জুলাই উপজীব্য করে যে নাটকগুলো হয়েছে, তাতে দর্শকের চোখে জল এনেছে। নাটকের মধ্যে প্রতিবাদের যে শিল্পরূপ আছে, তা আবার নতুন করে মানুষ উপলব্ধি করেছে।’
এই আয়োজন শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক মুহূর্তের শিল্পভাষ্যে অনুবাদ। আন্দোলন আর নাটক এক হয়ে গেছে এই জুলাই আন্দোলনের সময়কালে।
নতুন প্রজন্ম দেখেছে, কীভাবে থিয়েটার হয়ে উঠতে পারে চেতনার দ্রোহ। জুলাই ২৪ মনে করিয়ে দেয়, নাটক কখনও নিরপেক্ষ থাকে না। মঞ্চকর্মীরা কেবল চরিত্রে অভিনয় করেন না, সময়ের সঙ্গে লড়াইও করেন। নাটক থেমে যায়, কিন্তু প্রতিরোধের গল্প থেকে যায়। এমনটিই মনে করছেন থিয়েটার কর্মীরা।
- বিষয় :
- থিয়েটার
