একুশে পদক ২০২৬
নৃত্যশিল্পে মনোনয়ন নিয়ে বিতর্ক, পুনর্বিবেচনার দাবি শিল্পীদের
জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত ‘একুশে পদক (নৃত্যশিল্পে) মনোনয়ন বিষয়ে নীতিগত প্রতিবাদ, উদ্বেগ ও পুনর্বিবেচনার দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলন। ছবি: দ্রোহী তারা
সমকাল প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২০:৪৭ | আপডেট: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ১৪:১৪
সরকার ঘোষিত ২০২৬ সালের একুশে পদকের তালিকায় নৃত্যকলা বিভাগে অপেক্ষাকৃত তরুণ শিল্পী অর্থী আহমেদের মনোনয়ন ঘিরে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চরম অসন্তোষ ও বিতর্ক দানা বেঁধেছে। বহু প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ নৃত্যশিল্পীকে পাশ কাটিয়ে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে— এমন অভিযোগ তুলে সংবাদ সম্মেলন করেছেন দেশের বিশিষ্ট নৃত্যশিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা।
তাদের অভিযোগ, এই মনোনয়নে স্বচ্ছ ও সুস্পষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি, যা রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ এই বেসামরিক সম্মাননার মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করতে পারে।
সোমবার বিকেলে জাতীয় প্রেসক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে অনুষ্ঠিত ‘একুশে পদক (নৃত্যশিল্পে) মনোনয়ন বিষয়ে নীতিগত প্রতিবাদ, উদ্বেগ ও পুনর্বিবেচনার দাবি’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে নৃত্যশিল্পীদের পক্ষ থেকে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন নৃত্যশিল্পী ফারহানা চৌধুরী বেবী।
বক্তব্যে ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় একুশে পদক প্রদানের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও, নির্দিষ্ট মনোনয়ন নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
ফারহানা চৌধুরী বেবী বলেন, ‘একুশে পদক বাংলাদেশের সংস্কৃতি, ভাষা ও মুক্তচিন্তার চেতনার প্রতীক, যা আজীবন সাধনা এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনস্বীকার্য প্রভাবের স্বীকৃতি হিসেবে প্রদান করা হয়। কিন্তু এবারের ঘোষিত নামটি নিয়ে নৃত্যাঙ্গনে বড় অংশের মধ্যে প্রশ্ন ও সংশয় সৃষ্টি হয়েছে।’
লিখিত বক্তব্যে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘আমাদের সম্মানিত সাংস্কৃতিক উপদেষ্টা তার ভেরিফায়েড পেজে মনোনীত শিল্পীর যে অবদানের কথা উল্লেখ করেছেন, তা মূলত সমাজসেবা বা সামাজিক কল্যাণমূলক; এটি নৃত্যশিল্পে উল্লেখযোগ্য কোনো অবদান নয়। অথচ বাংলাদেশে অসংখ্য সিনিয়র নৃত্যশিল্পী রয়েছেন, যারা কয়েক দশক ধরে নৃত্যচর্চা, শিক্ষা, গবেষণা ও মঞ্চায়নের মাধ্যমে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করছেন। তাদের উপেক্ষা করা নৃত্যাঙ্গনের জন্য হতাশাজনক।’
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ২০১৬ সালে একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রবীণ নৃত্যশিল্পী আমানুল হক অতীতের পদকপ্রাপ্তদের স্মরণ করেন। ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, একুশে পদক কমিটিতে নৃত্যাঙ্গন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ না থাকায় সঠিক মূল্যায়নে ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। অবিলম্বে পদক কমিটিতে নৃত্যশিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের যুক্ত করার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলন থেকে নৃত্যশিল্পীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তিনটি সুনির্দিষ্ট দাবি পেশ করেন। দাবিগুলো হলো– একুশে পদক প্রদানের নীতিমালা অনুযায়ী ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় পদক প্রদান করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা, ২০২৬ সালে নৃত্যকলায় একুশে পদকের মনোনয়ন প্রক্রিয়া অবিলম্বে পুনর্বিবেচনা করা এবং নৃত্যাঙ্গনের অভিজ্ঞ ও প্রবীণ ব্যক্তিত্বদের মতামত গ্রহণ করে একটি স্বচ্ছ ও প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন পদ্ধতি অনুসরণ করা।
বক্তারা স্পষ্ট করে বলেন, এই প্রতিবাদ কোনো ব্যক্তি-বিশেষের বিরুদ্ধে নয়, বরং একুশে পদকের মর্যাদা ও গাম্ভীর্য অক্ষুণ্ণ রাখার স্বার্থে।
সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেন তামান্না রহমান, আনিসুল ইসলাম হিরু, মোস্তাফিজুর রহমান, এম আর ওয়াসেক, শারমিন হোসেন, মনিরা পারভিন ও সৈয়দ মিনা নজরুল।
এছাড়া সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন সোহেল রহমান, আবদুর রশীদ স্বপন, আমিনুল ইসলাম মনি, কচি রহমান, সাব্বির আহমেদ বিজু, আতিকুর রহমান উজ্জল, বেনজির সালাম, অমিত চৌধুরী, চাঁদনী, কস্তুরী মুখার্জীসহ অনেকেই।
আয়োজকরা জানান, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত না হলে এ জাতীয় রাষ্ট্রীয় সম্মাননার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে জনমনে স্থায়ী প্রশ্ন তৈরি হবে।
একুশে পদক বাংলাদেশের জাতীয় এবং দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদের স্মরণে ১৯৭৬ সালে তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকার থেকে এই পদক প্রদান শুরু হয়। শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, সাংবাদিকতা, দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনীতি, সমাজসেবা এবং ভাষা আন্দোলনে অনন্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এই পদক দেওয়া হয়। জীবিত বা মরণোত্তর–উভয় ক্ষেত্রেই এই সম্মাননা প্রদানের বিধান রয়েছে।
প্রতি বছর ২১শে ফেব্রুয়ারিতে (আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস) সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় এই পদক প্রদানের আয়োজন করে। পদকপ্রাপ্তদের একটি ১৮ ক্যারেট মানের ৩৫ গ্রাম ওজনের স্বর্ণপদক, একটি সম্মাননাপত্র এবং নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ প্রদান করা হয়।
- বিষয় :
- একুশে পদক
- সংবাদ সম্মেলন
