ছোট পর্দার ঈদ প্রস্তুতিতে গতি ফিরেছে
ছবি: কোলাজ
এমদাদুল হক মিল্টন
প্রকাশ: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ১৭:১০ | আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ | ১৭:৩৮
ঈদ মানেই টেলিভিশন পর্দায় গল্পের উৎসব। তবে গত দেড়-দুই বছর নাট্যাঙ্গনে এক ধরনের অনিশ্চয়তা কাজ করছিল। কাজ কমে যাওয়া, স্পন্সর সংকট, ঢাকার বাইরে শুটিং নিয়ে নিরাপত্তা শঙ্কা– সব মিলিয়ে নির্মাতারা ছিলেন কিছুটা চাপে। সেই অস্বস্তির আবহ কাটিয়ে এবার ঈদকে ঘিরে নাট্যাঙ্গনে বইছে স্বস্তির হাওয়া। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, গত বছরের তুলনায় শুটিং বেড়েছে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ। স্পন্সরও মিলছে সহজে। ফলে ঈদের আগমুহূর্তে নাট্যাঙ্গনে ফিরেছে ব্যস্ততা ও স্বস্তি।
ঈদের আর মাত্র দুই সপ্তাহ বাকি। এরই মধ্যে অধিকাংশ নির্মাতার ঈদ প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে। অভিনয়শিল্পীরাও শিডিউল গুছিয়ে এনেছেন। রোজার প্রায় ছয় মাস আগেই অনেকেই ঈদ নাটক ও টেলিছবির পরিকল্পনা শুরু করেছিলেন। কেউ কেউ ইতোমধ্যে বিভিন্ন চ্যানেলে কাজ জমা দিচ্ছেন। বছর পাঁচেক আগেও ঈদ নাটকের শুটিংয়ের প্রধান কেন্দ্র ছিল রাজধানীর উত্তরা। এখন সেই চিত্র পাল্টেছে। গাজীপুরের পুবাইলসহ উত্তরার বাইরের নানা লোকেশনে নিয়মিত শুটিং হচ্ছে। চলবে চাঁদ রাত পর্যন্ত। লোকেশন বৈচিত্র্য নাটকে নতুন মাত্রা যোগ করছে বলে মনে করছেন নির্মাতারা।
অভিনেতা ও নির্মাতা আবুল হায়াত এ বছরের ঈদের জন্য একটি নাটক নির্মাণ করেছেন। নাটকের নাম ‘সখিনা’, যা রাবেয়া খাতুনের গল্প অবলম্বনে নির্মিত। চিত্রনাট্যও লিখেছেন তিনি নিজেই। গাজীপুরের নক্ষত্রবাড়িতে শুটিং শেষ হয়েছে। নাটকটি ঈদে চ্যানেল আই-এ প্রচার হবে। তিনি জানান, সময়মতো কাজ শেষ করতে পারায় স্বস্তি পাচ্ছেন।

প্রতি ঈদেই নিজের পরিচালনায় ‘ছোটকাকু’ সিরিজ নিয়ে হাজির হন নন্দিত নির্মাতা ও অভিনেতা আফজাল হোসেন। এবারের সিরিজের নাম ‘কঙ্গো থেকে বঙ্গ’। গাজীপুরে গতকাল বুধবার এর দৃশ্যধারণ শুরু হয়েছে। অন্যদিকে নির্মাতা মুহম্মদ মোস্তফা কামাল একাধিক নাটক নিয়ে আসছেন। তিনি বলেন, গল্পে নতুনত্ব থাকলেই কেবল কাজ করছেন। নির্বাচনের পর কাজের পরিবেশে যে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে, সেটিও তাঁর কাজে উৎসাহ জুগিয়েছে। সালাহউদ্দিন লাভলু পরিচালিত ‘সত্য সংকট’ নাটকটি ইতোমধ্যে শুটিং শেষ করেছে। কাহিনি লিখেছেন আসাদ সরকার। পরিচালনার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ একটি চরিত্রে অভিনয়ও করেছেন লাভলু। এতে আরও রয়েছেন জাকিয়া বারী মম। নাটকটি ঈদে চ্যানেল আইতে প্রচার হবে। নির্মাতা সাগর জাহান এনটিভির জন্য নির্মাণ করেছেন ‘ছিটকিনি’। রাজধানীর উত্তরায় এর শুটিং শেষ হয়েছে।দেবল দেব শর্মার গল্প অবলম্বনে নাট্যরূপ দিয়েছেন আশরাফুল চঞ্চল। এ ছাড়া মোশাররফ করিমকে নিয়ে আরও দুটি কাজ করেছেন তিনি।
নির্মাতা বর্ণনাথের ‘সোনার চেইন’-এ অভিনয় করেছেন মোশাররফ করিম ও জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি। ঈদ মানেই হাসির নাটকের চাহিদা বেশি। তবে রোমান্টিক ও পারিবারিক আবহের নাটকও থাকছে। অভিনেতা ও নির্মাতা শামীম জামান জানান, এবারের আয়োজনে দর্শক পাবেন ভিন্ন ভিন্ন আমেজের গল্প। হাস্যরসের পাশাপাশি বক্তব্যধর্মী নাটকও রয়েছে তাঁর তালিকায়। এ ছাড়াও সকাল আহমেদ, মাবরুর রশিদ বান্না, চয়নিকা চৌধুরী, ভিকি জাহেদ, জাকারিয়া সৌখিন, প্রবীর রায় চৌধুরী, ওসমান মিরাজ, শরাফ আহমেদ জীবন, রাফাত মজুমদার রিকু, জুবায়ের ইবনে বকর, এস আর মজুমদার, শহীদ উন নবী, আবু মইদুল রাকিবসহ তিন শতাধিক নির্মাতা ঈদ আয়োজনে নতুন কাজ নিয়ে হাজির হচ্ছেন। ‘গোলাপী’ নামে নারীকেন্দ্রিক অ্যাকশন থ্রিলার নাটক নির্মাণ করেছেন রুবেল হাসান। এর চিত্রনাট্য করেছেন মেজবাহ উদ্দিন সুমন।

টিউন তেহরিন রচনা ও তপু খানের পরিচালনায় নির্মিত হয়েছে ঈদের নাটক ‘হ্যাপি ডিভোর্স’। সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত ঈদের নাটক ‘বেসড অন ট্রু স্টোরি’ নির্মাণ করেছেন মাহিন খান। এটি প্রচার হবে মাছরাঙা টেলিভিশনে।
খণ্ড নাটকের পাশাপাশি ঈদ ধারাবাহিকের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে। জনপ্রিয় নাটকের সিকুয়েল নির্মাণের প্রবণতাও লক্ষণীয়। নির্মাতা রাকেশ বসু নির্মাণ করেছেন ‘জাদুকর মোতালেব ২’। এ ছাড়া ‘জামাই কার?’ ও ‘সিন্ডিকেট বাদল’ নামেও দুটি নাটক করেছেন তিনি। নাটকগুলো যথাক্রমে আরটিভি, দীপ্ত টিভি ও এনটিভিতে প্রচার হবে।
ওটিটিসহ নানা মাধ্যমে ব্যস্ততা বাড়ায় কিছু তারকাশিল্পীকে নতুন নাটকে কম দেখা গেলেও তাদের পুরোনো কাজ প্রচার হবে। মোশাররফ করিম, চঞ্চল চৌধুরী, জিয়াউল ফারুক অপূর্ব, জাকিয়া বারী মম, তানজিকা আমিন, তৌসিফ মাহবুব, খায়রুল বাসার, ফারহান আহমেদ জোভান, নিলয় আলমগীর, জান্নাতুল সুমাইয়া হিমি, ইরফান সাজ্জাদ, জিয়াউল হক পলাশ, পাভেল, মারজুক রাসেল, শাশ্বত দত্ত, আরশ খান, পার্থ শেখ, তানজিন তিশা, তটিনী, নিহা, আইশা খান, সাফা কবির, পারসা ইভানা, নাদিয়া আহমেদ, সালহা খানম নাদিয়া, অহনা, মৌসুমী হামিদ, কেয়া পায়েল, রুকাইয়া জাহান চমক, সামিরা খান মাহি, সাদিয়া আয়মানের মতো অভিনয়শিল্পীদের থাকবে সরব উপস্থিতি। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ডজনখানেক নাটকেও অভিনয় করেছেন।
তরুণ অভিনেত্রী তটিনী বলেন, ‘দর্শক ঈদে বৈচিত্র্যময় গল্প দেখতে চান। সেই ভাবনা থেকেই ভিন্নধর্মী চরিত্রে কাজ করেছি। চরিত্রে নতুনত্ব থাকায় দর্শকের ভালো লাগবে বলে আশা করছি। সব মিলিয়ে বলা যায়, অনিশ্চয়তার মেঘ সরিয়ে এবারের ঈদে ছোট পর্দা ফিরছে প্রাণচাঞ্চল্যে। কাজের পরিমাণ যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে আত্মবিশ্বাস। দর্শক বৈচিত্র্যময় গল্প ও মানসম্মত নির্মাণে পাবেন পূর্ণাঙ্গ ঈদ আনন্দ। এমনটিই প্রত্যাশা অভিনেতা ও নির্মাতাদের।
যা বললেন প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ
এসকে শাহেদ আলী পাপ্পু
কর্ণধার, সিএমভি
এ বছর আমাদের প্রযোজনায় ঈদে মোট ১৫টি নাটক প্রচার হবে। এর মধ্যে বড় তারকা ও বড় বাজেটের পাঁচটি নাটক গত বছরের নির্মাণ, যেগুলো আমরা নতুন পরিকল্পনায় এবার প্রচারে আনছি। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ নাটকের স্পনসর নিশ্চিত করেছি। বাকি ৩০ শতাংশের স্পনসরও খুব শিগগিরই চূড়ান্ত হবে বলে আশা করছি। তবে বাস্তবতা হলো, বড় বড় কিছু লগ্নিকারী এখনো পুরোপুরি মার্কেটে সক্রিয় হননি। সবাই যখন সম্পৃক্ত হবেন, তখন কাজের পরিবেশ আরও বেশি স্বস্তিদায়ক হবে। আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে নাটকের দৈর্ঘ্য এখন ৪০ মিনিট থেকে বেড়ে ৮০-৯০ মিনিট হয়েছে। প্রযোজনার ব্যয়, শিল্পী পারিশ্রমিক, লোকেশন ও টেকনিক্যাল খরচ সবই বেড়েছে। কিন্তু স্পনসররা এখনো ৪০ মিনিটের নাটকের রেট হিসেবেই বাজেট বরাদ্দ করছেন। এটি আমাদের জন্য বড় সংকট। তারপরও আমরা মানের সঙ্গে আপস করতে চাই না। গল্প, নির্মাণ ও উপস্থাপনায় বৈচিত্র্য রেখে দর্শকের আস্থা ধরে রাখাই আমাদের লক্ষ্য।
মুশফিকুর রহমান
চিফ অপারেটিং অফিসার, বঙ্গ
বঙ্গ সবসময়ই চেষ্টা করে মানসম্পন্ন কনটেন্ট দেওয়ার। এবার ঈদে অমিতাভ রেজা চৌধুরী ও মুশফিকার মাসুদের ‘লাভ সিটার’সহ বেশ কয়েকটি কাজ আসবে। সময় নিয়ে পরিকল্পনা করেছি, বাজার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং নতুনভাবে কনটেন্ট উন্নয়নে মনোযোগ দিয়েছি। ঈদে আমরা বৈচিত্র্যময় আয়োজন নিয়ে ফিরছি। রোমান্টিক ও সমসাময়িক গল্প-সব মিলিয়ে একটি সমৃদ্ধ লাইনআপ সাজানো হয়েছে। আমরা বিশ্বাস করি, দর্শক এখন শুধু বিনোদন নয়, গল্পে গভীরতা ও নির্মাণে মান খোঁজেন। সেই চাহিদা পূরণ করতেই আমাদের এই প্রচেষ্টা। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে দর্শকের সাড়া বাড়ছে, তাই ডিজিটাল দর্শককেও মাথায় রেখে পরিকল্পনা করেছি। ঈদে দর্শকের প্রত্যাশার চাপ থাকে বেশি। আমরা আশাবাদী, এবারের আয়োজন দর্শকদের ভালো লাগবে।’
আনোয়ারুল ইসলাম সজল
সিইও, ক্যাপিটাল মাল্টিমিডিয়া
প্রতিবছর ঈদকে ঘিরে নতুন আয়োজনে সাজে ক্যাপিটাল ড্রামা। এবারও তার ব্যত্যয় হয়নি। এ বছর ‘ক্যাপিটাল ড্রামা’ ব্যানারে তিনটি নাটক প্রচার হবে। ইতোমধ্যে এর দৃশ্যধারণের কাজ শেষ হয়েছে। এর মধ্যে একটি নব্বই দশকের পটভূমিতে নির্মিত, যেখানে সেই সময়ের আবহ, সম্পর্ক ও আবেগকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। বাকি দুটি রোমান্টিক গল্পনির্ভর, তবে উপস্থাপনায় রয়েছে আধুনিকতা। আমরা স্বনামধন্য নির্মাতাদের দিয়ে কাজগুলো করিয়েছি, যাতে গল্পের গভীরতা ও নির্মাণমান দুটোই নিশ্চিত হয়। দর্শক যেন একঘেয়েমি অনুভব না করেন, সে বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি। আমাদের বিশ্বাস, ভিন্ন স্বাদের এই তিনটি নাটক ঈদের বিনোদনে আলাদা মাত্রা যোগ করবে এবং দর্শকের মনে জায়গা করে নেবে।
তানভীর মাহমুদ
কর্ণধার, সুলতান এন্টারটেইনমেন্ট
ঈদকে সামনে রেখে আমরা বেশ কিছু নতুন নাটক নির্মাণ করেছি, যা আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে পর্যায়ক্রমে উন্মুক্ত করা হবে। এসব নাটকগুলো গুণী নির্মাতারা নির্মাণ করেছেন। অভিনয়শিল্পীরা পরীক্ষিত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এখন বড় একটি দর্শক ভিত্তি তৈরি করেছে। তাই আমরা কনটেন্ট পরিকল্পনায় গল্পের মান, চিত্রনাট্যের শক্তি এবং নির্মাণের পরিশীলিত দিকগুলোর ওপর জোর দিয়েছি। দর্শকের কথা ভেবেই আমরা নির্মাণ করি। আমাদের লক্ষ্য শুধু ভিউ বাড়ানো নয়, বরং দর্শকের আস্থা অর্জন করা। সে লক্ষ্যেই পথ চলছি। ইউটিউব চ্যানেলটি শুরু থেকে দর্শক আমাদের কাজকে সাপোর্ট করেছেন। আমরা চাই, দর্শক আমাদের ব্যানারের নাম দেখেই মানসম্মত কনটেন্টের নিশ্চয়তা পান। এবারের ঈদ আয়োজন সেই লক্ষ্য পূরণের দিকেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
- বিষয় :
- ঈদের নাটক
