লাইলী-মজনু
ঐতিহ্যবাহী শিল্পবোধের নান্দনিক উপস্থাপনা
লাইলী-মজনু নাটকের একটি দৃশ্য। ছবি: নির্দেশনের সৌজন্যে
আবু সাঈদ তুলু
প্রকাশ: ২৪ জুন ২০২৬ | ২০:৪৪
বাংলাদেশের প্রচলিত ‘লাইলী-মজনু’ পরিবেশনাগুলোতে এত বেশি আরবীয় পরিবেশে প্রেমের সস্তা আবেগ দেখানো হয় যে, তাতে শিল্পরসভোগও অস্বস্তিকর ও কঠিন হয়ে পড়ে। তবে সম্প্রতি কলাভবনের নাটমণ্ডলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও পরিবেশনাবিদ্যা বিভাগ ‘লাইলী-মজনু’ প্রেমাখ্যানকে বাংলার ঐতিহ্যবাহী শিল্পবোধে নৈর্ব্যক্তিক প্রেমের প্রতীকে এমন অনবদ্যভাবে উপস্থাপন করেছে যে, তা উপস্থিত দর্শককে নান্দনিকবোধে বিমোহিত করেছে।
সস্তা প্রেমের প্যানপ্যানানির বিপরীতে উঁচুতর শিল্পরুচিবোধসম্পন্ন মানবীয় প্রেমকাহিনি রূপে প্রতিভাত হয়। বাঙালির সংস্কৃতির শাশ্বত ধরনেই মুসলিম মানসের চিত্র ফুটে উঠেছে। নাটকটি নির্দেশনার পাশাপাশি মঞ্চ, আলো, প্রপস ও সংগীত পরিকল্পনায় ছিলেন বিভাগীয় শিক্ষক তানভীর নাহিদ খান। অভিনয় করেছেন তৃতীয় বর্ষ ষষ্ঠ সেমিস্টারের শিক্ষার্থীরা।
প্রযোজনাটিতে শৈল্পিক নানা উপকরণ, প্রতীকায়ন ও চিহ্ন নির্মাণের ধারায় দৃশ্যমুখর হয়ে উঠেছে। সুফিবাদী জায়গা থেকে নারী-পুরুষ সম্পর্কের সুগভীর বাস্তবতা শিল্পের রূপরেখায় দর্শক হৃদয়ের অতলকে স্পর্শ করতে সচেষ্ট ছিল।
অভিনেতা-অভিনেত্রীর সংখ্যা বেশি হলেও নাটকটির প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনার থ্রু লাইনের গতি একরৈখিক, ফোকাস্ড ও টানটান। ছোট ছোট ঘটনার পরম্পরায় কোরাসীয় ধারায় কেন্দ্রীয় চরিত্রদ্বয় পরিণতির দিকে ধাবমান। প্রগ্রেস বা ডিগ্রেসের মাত্রিকতার বৈচিত্র্যেও কাহিনি উপস্থাপনকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে।
নাটকের আখ্যানভাগ আরবের নজদ অঞ্চলের আমিরের পুত্র কয়েস ও আরেক গোত্রপতি সুমতির রূপসী কন্যা লাইলীর প্রেমকে কেন্দ্র করে। বাল্যকাল থেকে দুজনের গভীর অনুরাগ শুরু হলেও অতি দ্রুত তাদের প্রেমের কথা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে লাইলীকে হতে হয় গৃহবন্দি। লাইলীর বিরহে কয়েস উন্মাদপ্রায় হয়ে লোকালয় ত্যাগ করে বনে-জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতে থাকেন। পরিবারের চাপে অনিচ্ছা সত্ত্বেও ইবনে সালামের সঙ্গে বিয়ে হলেও লাইলীর মন মজনুতেই পড়ে থাকে। বিয়োগান্তক পরিণতির মধ্যদিয়ে মানব প্রেম থেকে অপার্থিব স্বর্গীয় প্রেমের প্রতীকী রূপে বিধৃত হয়ে ওঠে।
নাটকে প্রধান দুটি চরিত্র ‘কয়েস’ ও ‘লাইলী’র পূর্ণ বিকাশ ঘটে মঞ্চে। বাস্তবমুখী ভাবপ্রকাশ, সুকৌশলী ও আবেগিক যোগাযোগ দর্শকহৃদয় আলোড়িত না করে পারেনি। নির্দেশক বিশেষ কোনো স্টাইল বা নাট্য উপস্থাপন রীতি অনুসরণ করেননি। প্রবহমান প্রতিকূল সমাজ বাস্তবতায় নর-নারীর মানবিক রক্তক্ষরণের এক মর্মস্পর্শী আবহ তৈরিতেই নির্দেশক তৎপর ছিলেন। লাইলী-কয়েসের প্রেম এখানে জাগতিকতা পেরিয়ে এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক সাধনায় উন্নীত হয়েছে। দৌলত উজির বাহরাম খান তাঁর ‘লাইলী-মজনু’ কাব্যে যে প্রেম-বিরহ ও আত্মোৎসর্গের করুণ রস সৃষ্টি করেছিলেন, নির্দেশক যে অনুভবকেই দেহভঙ্গি, সুর এবং সংলাপের মেলবন্ধনে মঞ্চে গতিশীল দৃশ্যকাব্য বুনন করেছেন। দৌলত উজির বাহরাম খান ছিলেন ষোলো শতকের মুসলিম কবি।
চট্টগ্রাম জেলার ফতেয়াবাদ কিংবা জাফরাবাদ গ্রামে তাঁর জন্ম। তাই দৌলত উজির বাহরাম খান ফারসি কবি নিজামী গঞ্জভির উৎস থেকে কাব্যরসদ নিলেও তাঁর কাব্যে মিশে আছে বাংলার খাঁটি দেশজ পরিবেশ ও মনস্তাত্ত্বিক আবেগ। নির্দেশকও দেশজ আবহে নৃত্য-গীত-বর্ণনা-সুর ও অভিনয়কল্পের সহযোগে বাহরাম খান কাব্য ভাষা ও ছন্দের দোলা অক্ষুণ্ন রেখে মধ্যযুগীয় বাংলার নান্দনিকতাকে আধুনিক দর্শকের উপযোগী করে তোলার প্রয়াসী ছিলেন। দেশীয় আবহের মিথস্ক্রিয়ায়, নাট্যমহূর্ত, অভিনয় ও সুরের মূর্ছনায় দর্শককে অতীতের ধ্রুপদি সুফি ঘরানার আখ্যানে ফিরিয়ে নিয়ে গেছেন।
নাটকে লাইলী চরিত্রে একাধিক অভিনেত্রী অভিনয় করেছেন। আবার কয়েস চরিত্রেও একাধিক অভিনেতা অভিনয় করেছেন। কিন্তু তাদের ভাব-ভাষা-চলনবিন্যাস বিশ্বাসযোগ্য বাস্তবতাই নির্মাণ করেছে। সংলাপ-চরিত্র নির্মাণ ও উপস্থাপন ভঙিমায় বহুমাত্রিক। নাটকটির সংগীত পরিকল্পনায় সহযোগী ছিলেন সোহানুর রহমান।
পরিবেশনাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একধরনের মেলোডিয়াস। নাটকে আবেগিক মুহূর্তগুলো, সুর-ছন্দ ও পরিমিতির কোটরে আবদ্ধ সংলাপ প্রক্ষেপণগুলো যেন হৃদয়তন্ত্রীতে উচ্চাঙ্গের মতো সুরেলা মোহচ্ছতাই তৈরি করেছে। সামগ্রিক নাট্য পরিবেশে মানবতাবাদী প্রেমের গভীরতায় দর্শককে নিয়ে গেছে।
লেখক: শিক্ষক ও নাট্য গবেষক
