ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬

ডিজনির সমুদ্রকন্যা এবার বাস্তব রূপে

ডিজনির সমুদ্রকন্যা এবার বাস্তব রূপে
×

ছবি: সংগৃহীত

মীর সামী

প্রকাশ: ০৯ জুলাই ২০২৬ | ১৪:০০

বাঁধনসমুদ্রের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক বহু পুরোনো। কখনও সমুদ্র মানুষের জীবিকার উৎস, কখনও রহস্যের আধার, আবার কখনও সাহসী অভিযাত্রার প্রতীক। সেই সমুদ্রকেই কেন্দ্র করে ২০১৬ সালে ডিজনি নির্মাণ করেছিল অ্যানিমেশন সিনেমা ‘মোয়ানা’। মুক্তির পরই সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। শুধু বাণিজ্যিক সফলতাই নয়, গল্প, সংগীত, সংস্কৃতির উপস্থাপন এবং এক কিশোরীর সাহসী অভিযাত্রা–সব মিলিয়ে এটি আধুনিক ডিজনি ক্ল্যাসিকের মর্যাদা লাভ করে।

প্রায় এক দশক পর সেই গল্পই নতুনভাবে ফিরে এসেছে লাইভ-অ্যাকশন রূপে। নতুন প্রযুক্তি, বাস্তব লোকেশন, আধুনিক ভিএফএক্স এবং নতুন ও পুরোনো অভিনয়শিল্পীদের সমন্বয়ে ডিজনি আবারও দর্শককে নিয়ে যাচ্ছে প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে; যেখানে অপেক্ষা করছে এক বিস্ময়কর সমুদ্রযাত্রা। 


গত কয়েক বছরে ডিজনি তাদের জনপ্রিয় অ্যানিমেশনগুলোকে একে একে লাইভ-অ্যাকশন রূপে ফিরিয়ে আনছে। ‘দ্য লায়ন কিং’, ‘আলাদিন’, ‘বিউটি অ্যান্ড দ্য বিস্ট’, ‘দ্য লিটল মারমেইড’–সবক’টির পর এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলো ‘মোয়ানা’। এই সংস্করণ শুধুই পুরোনো সিনেমার পুনর্নির্মাণ নয়। এটি এমন এক প্রয়াস, যেখানে অ্যানিমেশনের কল্পনাকে বাস্তবের আলো-ছায়ায় রূপ দেওয়া হয়েছে মূল গল্পের আবেগ, সংস্কৃতি ও দর্শনকে অক্ষুণ্ন রেখে।

মোয়ানা সিনেমায় সমুদ্রের ডাকে এক কিশোরীর অদম্য যাত্রার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পলিনেশিয়ার কাল্পনিক দ্বীপ মোটুনুই। দ্বীপটির প্রধানের মেয়ে মোয়ানা ছোটবেলা থেকেই সমুদ্রের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ অনুভব করে। কিন্তু তাদের সমাজে বহু প্রজন্ম ধরে একটি অলিখিত নিয়ম চলে আসছে। প্রবাল প্রাচীরের বাইরে যাওয়া নিষিদ্ধ। কারণ সেই অজানা সমুদ্র বিপদে ভরা। সময়ের সঙ্গে দ্বীপে নেমে আসে ভয়াবহ সংকট। মাছ কমে যায়, ফলের গাছ শুকিয়ে যেতে থাকে, প্রকৃতি যেন ধীরে ধীরে প্রাণ হারায়। তখনই প্রকাশ পায় বহু পুরোনো এক রহস্য। সমুদ্রের দেবী টে ফিটির হৃদয় চুরি হওয়ার পর থেকেই প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। এই সংকটের মুহূর্তে সমুদ্র নিজেই মোয়ানাকে বেছে নেয়। নিজের পরিবার, ভয় এবং অনিশ্চয়তাকে পেছনে ফেলে সে জীবনের সবচেয়ে বড় অভিযানে বেরিয়ে পড়ে। মোয়ানার অভিযানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো অর্ধ-দেবতা মাউইকে খুঁজে বের করা।

একসময় দেবতাদের কাছ থেকে মানুষের জন্য আগুন, বাতাসসহ নানা আশীর্বাদ এনে দেওয়া এই বীরই টে ফিটির হৃদয় চুরি করেছিল। বাস্তবে মাউই আত্মবিশ্বাসী, দুষ্টুমিপ্রিয়, কিছুটা অহংকারী এবং নিজের কীর্তি নিয়েই বেশি ব্যস্ত। শুরুতে সে মোয়ানাকে সাহায্য করতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও ধীরে ধীরে তাদের মধ্যে গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সম্মান। দুই ভিন্ন স্বভাবের মোয়ানা ও মাউইয়ের যাত্রা কোনো রূপকথার সহজ পথ নয়। সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, ভয়ংকর জলদস্যু কাকামোরা, বিশাল কাঁকড়া তামাতোয়া, আগুনের ভয়াবহ শক্তি এবং অজানা সব দ্বীপ। প্রতিটি ধাপে নতুন চ্যালেঞ্জ অপেক্ষা করে। এই সব বিপদের মধ্য দিয়েই মোয়ানা নিজেকে চিনতে শেখে। সে বুঝতে পারে, একজন নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু সাহস নয়, নিজের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা। ‘মোয়ানা’কে শুধু অ্যাডভেঞ্চার চলচ্চিত্র বললে ভুল হবে। এটি আত্মপরিচয়, উত্তরাধিকার এবং নিজের ভেতরের শক্তিকে আবিষ্কার করার গল্প। মোয়ানার দাদি তালা তাঁকে শেখান–মানুষের পরিচয় তার ভয় নয়, বরং তার স্বপ্ন। পূর্বপুরুষদের ইতিহাস এবং সমুদ্রযাত্রার ঐতিহ্য ভুলে গেলে নিজের অস্তিত্বও হারিয়ে যায়। 

অ্যানিমেশন থেকে লাইভ-অ্যাকশনে রূপান্তর সব সময়ই চ্যালেঞ্জের। কারণ, দর্শকের মনে আগের ছবির সঙ্গে আবেগ জড়িয়ে থাকে। পরিচালক টমাস কাইল সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জোর দিয়েছেন বাস্তব লোকেশন, বিশাল সেট, উন্নত কম্পিউটার গ্রাফিক্স এবং আলোকসজ্জার ওপর। তাইতো সমুদ্রের প্রতিটি ঢেউ, দ্বীপের সবুজ বন, সূর্যাস্তের রং কিংবা ঝড়ের ভয়াবহতা। সবই বড়পর্দায় অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। নির্মাতা জানিয়েছেন, সমুদ্রকে এখানে জীবন্ত এক চরিত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। কখনও সে পথ দেখায়, কখনও সতর্ক করে, আবার কখনও মোয়ানার সাহসের পরীক্ষক হয়ে ওঠে।

লাইভ অ্যাকশন সিনেমায় মোয়ানা চরিত্রে অভিনয় করেছেন ক্যাথরিন লাগাইয়ার। এটি তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। তিনি মোয়ানার কোমলতা, দৃঢ়তা এবং নেতৃত্বের গুণগুলো স্বাভাবিকভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। অ্যানিমেশনের চরিত্রকে অনুকরণ না করে নিজের অভিনয়শৈলীতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন তিনি। বিশেষ করে আবেগঘন দৃশ্যগুলোতে তাঁর সংযত অভিনয় দর্শকের সঙ্গে সহজেই সংযোগ তৈরি করে। 
অ্যানিমেশন সিনেমায় মাউই চরিত্রে কণ্ঠ দিয়েছিলেন হলিউড অভিনেতা ডোয়াইন জনসন। এবার সরাসরি মাউই হয়ে পর্দায় ফিরেছেন ডোয়াইন জনসন। যদিও ট্রেলার প্রকাশের পর তাঁর লুক নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছিল। 

মোয়ানা অ্যানিমেশন সংস্করণের জনপ্রিয় গানগুলো লাইভ-অ্যাকশনেও ফিরে এসেছে নতুন সংগীতায়োজনে। সংগীতের আবেগ অক্ষুণ্ন রেখে আরও বাস্তবধর্মী পরিবেশে গানগুলো উপস্থাপন করা হয়েছে। এই সিনেমায় পলিনেশিয়ান সংস্কৃতিকে শুধু সাজসজ্জার উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়নি। তাদের নৌযাত্রার ইতিহাস, পারিবারিক মূল্যবোধ, লোকবিশ্বাস, প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান এবং পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য পুরো গল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। সমালোচকদের চোখে লাইভ-অ্যাকশন ‘মোয়ানা’র ট্রেলার মুক্তির পর সবচেয়ে বেশি প্রশংসা পেয়েছে এর চিত্রগ্রহণ, ভিজ্যুয়াল এফেক্ট এবং ডোয়াইন জনসনের অভিনয়। তবে সমালোচকদের একটি বড় অংশের মত, ছবিটি মূল অ্যানিমেশনের প্রতি এতটাই বিশ্বস্ত যে নতুন কোনো চমক খুব বেশি নেই। গল্পের গুরুত্বপূর্ণ মোড়, আবেগঘন মুহূর্ত, এমনকি অনেক সংলাপও আগের সংস্করণের অনুসরণ করেছে। 
লাইভ-অ্যাকশন ‘মোয়ানা’ মূল গল্পকে বদলে দেয়নি, তাকে নতুনভাবে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করেছে। দৃষ্টিনন্দন ভিজ্যুয়াল, সমুদ্রের মনোমুগ্ধকর উপস্থিতি, শক্তিশালী সংগীত, ক্যাথরিন লাগাইয়ার সম্ভাবনাময় অভিষেক এবং ডোয়াইন জনসনের প্রাণবন্ত অভিনয় মিলিয়ে ছবিটি হয়ে উঠেছে বিনোদনের এক পরিপূর্ণ আয়োজন।

যারা ২০১৬ সালের অ্যানিমেশনটি ভালোবেসেছিলেন, তাদের কাছে এটি হবে নস্টালজিয়ার নতুন অধ্যায়। নতুন দর্শকের জন্য এটি সাহস, নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস এবং নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার এক অনুপ্রেরণাদায়ক সমুদ্রযাত্রা। পরিচিত গল্প হলেও, বাস্তবের আলো-ছায়ায় সেই যাত্রা আবারও মনে করিয়ে দেবে। সত্যিকারের অভিযাত্রা শুরু হয় তখনই, যখন মানুষ নিজের পরিচিত জনদের ছেড়ে অজানার উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।
 

আরও পড়ুন

×